www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

বিশ্ব দুগ্ধ দিবস আজ


 এগ্রিবার্তা ডেস্কঃ    ১ জুন ২০২০, সোমবার, ১০:৫০   ডেইরী বিভাগ


দুধ ও দুগ্ধ শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের প্রতি সকলের সচেতনতা তৈরি, মনোযোগ বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক খাদ্য হিসেবে দুধের গুরুত্ব তুলে ধরার লক্ষ্যকে সামনে রেখে জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (Food & agriculture Organization/FAO) ২০০১ সাল থেকে প্রতিবছরের পহেলা জুন কে 'বিশ্ব দুগ্ধ দিবস' হিসেবে ঘোষণা করে। এই দিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতীয় অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে দুগ্ধ শিল্পের ভূমিকা তুলে ধরার জন্য নানা ধরনের আয়োজনের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে।

  • দুধের উপকারী দিক সম্পর্কে জানে না এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। দুধ কে বলা হয় 'সুপার ফুড'। এর রয়েছে নানাবিধ উপকারী দিকঃ-
  • প্রতি ১০০ গ্রাম দুধে প্রায় ৩.৪ গ্রাম প্রোটিন পাওয়া যায়। যা শরীরের মাংসপেশি গঠনে ও সুদৃঢ় করতে সহায়তা করে।
  • দুধে বিদ্যমান পটাশিয়াম হৃদযন্ত্রের পেশীর সুস্থতা বজায় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
  • ক্যালসিয়ামের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয় দুধ এবং দুগ্ধজাত পণ্যে কে। যা দাত ও হাড়ের মজবুত গঠনে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করে। (যাদের কিডনিতে পাথর রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে দুধ পান করা উচিত নয়। পাথরের প্রধান উপাদান হলো ক্যালসিয়াম আর দুধে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বেশি থাকে।)
  • গরম দুধ পান করলে শরীরে মেলাটোনিন এবং ট্রাইপটোফ্যান নামক হরমোন নিঃসৃত হয় যা ঘুমাতে সাহায্য করে।
  • দুধে বিদ্যমান ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থগুলো ত্বক মসৃণ, কোমল ও উজ্জ্বল করে।
  • মানসিক চাপ দূর করে শরীরে প্রশান্তি আনে।
  • দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে দুধের ভূমিকা অতুলনীয়।
  • কম চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার খেলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি হ্রাস পায়।
  • মলাশয় ও ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস পায়।
  • দৃষ্টিশক্তি বাড়ে।
  • চুলের পুষ্টি যোগায়।
  • পাকস্থলী পরিষ্কার রাখে এবং রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে।
  • কোষ্ঠকাঠিন্য এড়াতে রাতে গরম দুধ পান করতে পারেন।

গ্যাস্ট্রিক-আলসার, ডিউডেনাল আলসার, কোলেসিসটাইসিস বা গলব্লাডারের সমস্যা, এলার্জি এবং প্যাংক্রিয়াটিক রোগে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে দুধ পান করা উচিত না। পেটের অপারেশন থেকে সেরে উঠা না পর্যন্ত দুধ পান না করাই ভালো। লোহার অভাব পূরনের জন্য যারা আয়রন ট্যাবলেট গ্রহণ করছেন তাদের ক্ষেত্রেও দুধ পান করা উচিত নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে প্রতিদিন অন্তত ২৮০ মিলিলিটার দুধ পান করা উচিত। কিন্তু, আমরা প্রতিদিন মাথাপিছু দুধ গ্রহণ করছি মাত্র ১২৫ মিলিলিটারের মতো। শরীরের পুষ্টির এই ঘাটতি পূরণের জন্য দেশে অতিদ্রুত দুগ্ধজাত পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। প্রানীসম্পদ অধিদপ্তরের ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী আমাদের দেশে বছরে দুধের চাহিদা প্রায় ১৪৬.৫১ লাখ টন। অথচ আমাদের উৎপাদন ক্ষমতা মাত্র ৭২.৭৫ লাখ টন। (একুশে টিভি.কম ২০১৯)

এই বিপুল ঘাটতি পূরণের জন্য কিছু দিক নির্দেশনা প্রনয়ণ করা যেতে পারে বলে আমি মনে করিঃ-

  • দুধের চাহিদা পূরনের জন্য উন্নতমানের গাভী পালন করা অত্যাবশ্যক। ইউরোপ আমেরিকার প্রতিটি গাভী গড়ে যেখানে ৪০লিটারের ওপর দুধ দেয় সেখানের আমাদের দেশীয় গাভী থেকে দৈনিক ৩-৪ লিটারের অধিক দুধ পাওয়া যায় না। তাই কৃষক ও খামারি পর্যায়ে উন্নত জাতের সংকর গাভী পৌছে দিতে হবে।
  • গোখাদ্যের দাম কমাতে না পারলে নতুন খামার গড়ে তোলা যেমন কষ্টসাধ্য তেমনি খামার বড় করারা প্রতি মানুষের উৎসাহে ভাটা পড়বে। তাই সরকারের উচিৎ এই বিষয়ে মনোযোগ বৃদ্ধি করা।
  • মাঠ পর্যায়ে খামারিদের প্রণোদনা সহায়তা প্রদান করা গেলে খামারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং বেকার যুবকরা উৎসাহিত হবে। একদিকে যেমন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে পাশাপাশি কমবে বেকারত্ব সমস্যা।
  • খামারের আধুনিকায়ন এবং খাদ্য ব্যবস্থা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। আমাদের দেশের সিংহভাগ খামার দেশীয় পদ্ধতিতে তৈরি এবং খাদ্য ব্যবস্থাও পুরনো আমলের, যা গাভীর দুধ উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়।
  • দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার ব্যবস্থায় সমতা তৈরি করতে পারলে ভোক্তাদের কাছে গ্রহনযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে। ক্রমবর্ধমান দামের দরুন অনেকের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য।
  • যুব উন্নয়ন সংস্থা এবং প্রানীসম্পদ সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান গুলোতে বিজ্ঞান সম্মত প্রশিক্ষণ প্রদান করা গেলে সচেতনতা যেমন বৃদ্ধি পাবে তেমনি বৃদ্ধি পাবে উৎপাদন।
  • দুগ্ধজাত পণ্যের মধ্যে রয়েছে দই,মিষ্টি,মাখন,ঘি,ছানা,পনির,আইসক্রিম ইত্যাদি। সারা বছর জুড়েই এই পণ্য গুলোর রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত চাহিদা। দুধের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো গেলে দুগ্ধজাত পণ্যের উৎপাদনও বাড়বে। তাই দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার বৃদ্ধির যে অপার সম্ভাবনা রয়েছে তা তুলে ধরতে পারলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।

দেশের ক্রমবর্ধমান জিডিপি'তে প্রানীসম্পদের অবদান ৩.২১ শতাংশ(প্রায়)। প্রত্যক্ষভাবে দেশের মোট কর্মসংস্থানের ২১ শতাংশ এবং মোট আমিষের ৮ শতাংশ আসে দুগ্ধ সেক্টর থেকে। একজন ভেটেরিনারি শিক্ষার্থী হিসেবে দুধের উপকারীতা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া...দুধের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌছানোর মাধ্যমে পুষ্টি চাহিদা পূরণ কীভাবে করা যায় তার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের সদয় দৃষ্টি কামনা করছি।

বর্তমানে বিশ্ব জুড়ে চলমান করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে নিজের শরীরকে প্রস্তুত রাখার জন্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো উপায় নেই। 'সুপার ফুড' দুধ পান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। তাই পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের পাশাপাশি সামর্থ্য অনুযায়ী দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে খাবারের তালিকায় রাখার চেষ্টা করুন। বাসায় থাকুন...নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন...সরকার কে সহযোগিতা করুন। উপরওয়ালা আমাদের সকলকে হেফাজত করুন।

লেখকঃ
তোফায়েল আহমেদ
প্রানীসম্পদ বিজ্ঞান বিভাগ
তৃতীয় বর্ষ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়




  এ বিভাগের অন্যান্য