www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

বিশ্ব জুড়ে মাংসের ভজন ও গুণাগুণ


 ডাঃ মোঃ মুনিরুজ্জামান    ১৯ জুন ২০২০, শুক্রবার, ৫:০০   সম্পাদকীয় বিভাগ


পৃথিবীতে মানুষের বসবাস প্রায় ৩শ কোটি বছর ধরে। প্রথম দিকে গুহাবাসী মানুষের ফলমূল খেয়ে জীবন ধারণ করতো এর পর যখন শিকার করতে শেখে তখন থেকেই মাংসের প্রতি দূর্বলতা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। বলা হয়ে থাকে মাংস ভক্ষণ শুরু করার পর থেকে মানুষের বুদ্ধির বিকাশ ঘটে যত দ্রুত সভ্যতার বিকাশও হয়েছে তত দ্রুত। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের মানুষের অভ্যাসগত, প্রথাগত কিংবা ধর্মীয় ইত্যাদি কারণে মাংসের ধরণ, রান্নার পদ্ধতি এবং মাংসের ব্যবহারে ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। সংস্কৃতির রীতি-নীতি অনুসারে মাংসের ব্যবহার পরিবর্তন হয। যেমন, ভারতের অনেক বড় জনসংখ্যা আছে যা প্রায সব ধরনের মাংসের ভোগ থেকে এড়িয়ে চলে। বিভিন্ন সংস্কৃতি এবং ধর্ম অনুসারে মাংস ভোগের ব্যবহার বিভিন্ন হযে থাকে। কারোর কাছে যে মাংস অতি সুস্বাদু কারোর কাছে একই মাংস অরুচির কারণ।

মাংস কীঃ
মাংস হল পশু ও পাখির শরীরের অংশ যা খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয। মাংস বলতে প্রাযই ঐচ্ছিক পেশী, সহযোগী চর্বি এবং অন্যান্য টিস্যু বা কলাকে বুঝানো হযে থাকে। তাছাড়া প্রানির দেহের হৃদপিন্ড, কিডনি, কলিজা, ফুসফুস এমন কি পশুর খাদ্য তন্ত্রও প্রক্রিয়াজাত করে আমরা খেয়ে থাকি। বৈচিত্রময় এই পৃথিবীতে নানা রকম প্রাণির বাস। যে সব প্রাণী থেকে আমরা মাংস পেয়ে থাকি তাদের জাত অনুসারে মাংসের গঠন, আকৃতি ও গন্ধ পৃথক পৃথক হয়ে থাকে।

মাংসের প্রকারভেদঃ

  • সাধারাণত মাংসপেশীর তন্তু(ফাইবার) এবং মায়োগ্লবুলিন এর উপর ভিত্তি করে দু’ভাগে ভাগ করা হয়। যথা-
    • লাল মাংসঃ মায়োগ্লবুলিন অক্সিজেনের সংস্পর্শে অক্সিহিমোগুবিন তৈরি করে যা ঈশত লালা বর্ণ ধারণ করতে সাহায্য করে যার ফলে এদের লাল মাংস বলা হয়। লাল মাংসের তন্তু (ফাইবার) গুলো সংকীর্ণ হয় যা বিরামহীন ভাবে দীর্ঘ সময় কার্যসম্পন্ন করে। যেমন প্রাপ্ত বয়স্ক স্তন্যপায়ী গরু,ছাগল মহিষ, ভেড়ার মাংস এবং ঘোড়ার মাংস লাল মাংস হিসেবে পরিচিত।
    • সাদা মাংস: সাদা মাংসের ফাইবার বা তন্তু প্রশস্ত যা দ্রুত কার্য সম্পন্ন করে, অক্সিহিমোগুবিন কম থাকে তাই লাল না হয়ে সাদা দেখায় তাই সাদা মাংস হিসেবে পরিচিত। সাদা মাংস হল মুরগি, কবুতর, কয়েল, হাঁস, টার্কি ইত্যাদি পাখি ও মাছের মাংস।
  • আবার মাংসের চর্বির উপর ভিত্তি করে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
    • চর্বি যুক্ত মাংস ও
    • চর্বি মুক্ত বা লীন মাংস
  • আরও প্রাকারভেদ করা হয়ে থাকে প্রক্রিয়াজাত করণের উপর যেমন-
    • প্রক্রিয়াজাত বা প্রসেস মাংস
    • অপ্রক্রিয়াজাত বা আনপ্রসেস মাংস।
  • এছাড়ায় বিভিন্ন সুবিধার জন্য প্রয়োজন অনুসারে মাংসের প্রকারভেদ করা হয়ে থাকে।

মানুষ যেসব প্রাণির মাংস ভক্ষণ করেঃ
মাংস খাওয়ার ক্ষেতে সর্বভুক বা সর্বস্তরের খাদক মানুষ কথাটির যর্থাততা মিলে। বিশ্বব্যাপী মানুষ যে সকল প্রাণির মাংস খেয়ে থাকে তার একটি তালিকা নিচে দেয়া হল-
গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ, উট, লামা, দুম্বা, গাধা, ঘোড়া, চামরী গাই, খরগোশ, রাজহাঁস, কবুতর, মুরগি, উটপাখি, ক্যাঙ্গারু, টার্কি, কয়েল,ইমু, অস্টিচ, গিনিফাউল,আমেরিকান বাইসন, আলপাকা, কুকুর, বিড়াল, শুকুর ইত্যাদি গৃহপালিত প্রাণী এবং বন মহিষ, হরিণ, কুমির, শামুক ইত্যাদি বন্য প্রাণী। তাছাড়া চিংড়ি সহ অন্যান্য মাছ যেমন রুই, কাতলা, হাঙ্গর, তিমি সহ পানিতে বাস করে এমন মাছের শ্রেণী ভুক্ত প্রাণী গুলো।

প্রজাতি ভেদে প্রাণির মাংসের প্রচলিত কারিগরি নামঃ

যে পশুর মাংস  মাংসকে যে নামে ডাকা হয় যে পশুর মাংস মাংসকে যে নামে ডাকা হয়
গরু বিফ(Beef) বণ্য প্রাণী বুস মিট (bushmeat)
মহিষ বিফ (Beef)/ক্যারাবিফ (Carabeef) মুরগি চিকেন (Chicken)
ভেরা হগেট (Hogget)/মাটন (mutton) হাঁস ডাক (duck)
ছাগল ক্যাব্রিট (Cabrito)/চিভন (chevon) খরগোশ রেবিট (Rabbit)
হরিণ ভিনসন (Vension) বাছুর ভেল (Veal)
শুকুর পর্ক (Pork)/বিকন (Bacon) কবুতর স্কোয়াব (Squab)

মাংসের পুষ্টিগত তথ্যঃ
পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় মাংস উল্লেখ যোগ্য হারে প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান গুলোর ঘাটতি পুরন করছে। মাংসে আছে আমিষ বা প্রোটিন, চর্বি বা ফেট, খনিজ বা মিনারেল, ভিটামিন এবং পানি। যা একটি সুষম খাদ্যে থাকা প্রয়োজন তাই মাংস একটি সুষম খাবার সেচুরেটেড ফেটি এসিডের মত সামান্য কিছু উপাদান আছে যা স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে থাকে যা নিয়ম মেনে দূর করা সম্ভব।

পৃথিবীর আশ্চর্য্য সৃষ্টি মানুষ তারচেয়ে বেশি বিস্ময়কর আমাদের মস্তিষ্ক। সারা শরীরের ২ হচ্ছে আমাদের মস্তিষ্ক অথচ মোট শক্তির ২০ ভাগ ব্যবহার করে। দেহের মহামূল্যবান ব্রেইন এর যে ৫ টি উপাদান বেশি লাগে তা আসে মাংস থেকে। তাই মস্তিষ্কের উর্বরতার জন্য মাংস অপরিহার্য। নিচে ব্রেনের প্রোয়জনীয় ৫ উপাদান যা মাংস থেকে পেয়ে থাকি তা আলোচনা করা হলোঃ

  • ভিটামিন বি ১২:-
    সকলই প্রায় অবগত যে ভিটামিন বি১২ দেহে উৎপন্ন হয় না কেবল মাত্র প্রানিজ উৎস থেকে পাওয়া যায়। পানিতে দ্রবণীয় এই ভিটামিন টি দেহের প্রতিটি কোষ্ কাজ করতে সাহায্য করে। এমন কি রক্ত তৈরি ও ব্রেইন এর কার্যকারতায় শতভাগ সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করে। এর অভাব হলে এনিমিয়া, মেধাশক্তি ক্ষীণ , মানুষিক ভার্সম্যহীনতা দেখা দেয়। যারা ভেজিটারিয়ান বা সবজি ভোজী এক গবেষণা দেখা গেছে ৯২ ভেজিটারিয়ান এবং ৪২ লেক্টোওভোভেজিটারিয়ান (যারা দুধ ডিম খায় কিন্তু মাংস খায় না) তারা ভিটামিন বি১২ এর অভাবে ভুগে। এর অভাব রোগ আকারে প্রকাশ না পেলেও ব্রেইন এর র্ক্যাকারিতা কম হয় সুস্থ থাকলে যতটা হতো তার থেকে। তাই কেউ যদি মাংস না খেতে চান তাহলে ভিটামি বি ১২ এর জন্য আলাদা ব্যবস্থা করুন।
  • ভিটামিন ডি৩:
    ভিটামি ডি আমাদের শরীরে চামড়া সূর্যের আলোর সাহায্যে উৎপন্ন করে। কিন্তু আধুনিক ব্যস্থ যান্ত্রিক জীবনের অনেকটা সময় সূর্যের আলো ছাড়ায় কাটাতে হয়। তাই খাবারের মাধ্যমের এর সরবরাহ করা প্রয়োজন। ডি ভিটামিনের ডি২ আমরা উদ্ভিদ থেকে এবং ডি৩ প্রাণী থেকে পেয়ে থাকি। আর ডি৩ ডি২ এর থেকে বেশি কার্যকরি। মাছের মাংস থেকে এটি বেশি পাওয়া যায়।
  • ক্রিয়েটিন:
    বডিবিল্ডিং মাসলবিল্ডিং এ যারা আগ্রহী তাদের জন্য এই উপাদান টি খুবই জরুরি। কেননা ক্রিয়েটিন দেহের মাংসের গঠন দূঢ়তা বৃদ্ধি ও শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। ৯৫ ক্রিয়েটিনিন কঙ্কাল পেশীতে জমা থাকে যা শুধু মাংশ পেশীতেই খাজে লাগেনা ব্রেইন এর র্ক্যাকারিতায় সহায়তা করে। তাই দৈহিক বল বৃদ্ধির জন্য মাংস অন্যান্য খাবারের থেকে এগিয়ে।
  • কারনসিনঃ
    এটি অপরিচিত হতে পারে তবে মজার বিষয় এই যে এটি মাংসতে থাকে। যা উচ্চমাত্রায় পেশী টিস্যু ও ব্রেইন টিস্যুতে পাওয়া যায়। দেহের বিভিন্ন সমস্যা প্ররতিরোধে সহায়তা করে। এ কারণে ক্যারনসিন এইজিং নামে পরিচিত।
  • ডোকসা হেক্সানোয়িক এসিডঃ
    এটি ওমেগা৩ নামেও পরিচিত। সাধারণত দু ধরণের ওমেগা৩ আমাদের প্রয়োজন হয়। যথা ইপিএ (EPA) এবং ডিইচএ (DHA) যা আমাদের দেহ তৈরি করতে পারে না। যা আমাদের মস্তিষ্কের উন্নতির জন্য কাজ করে। বিশেষ করে গর্ভাবস্থা মায়েদের এটি বেশি প্রয়োজন নচেত শিশুর ব্রেইন এর বিকাষে ব্যঘাত ঘটবে।

বিভিন্ন প্রাণির মাংস থেকে প্রাপ্ত পুষ্টি উপাদানঃ
প্রাণির প্রজাতি ভেদে মাংসের বিভিন্ন উপাদান কম বেশি হয়। চলুন এক নজরে দেখে নেয়া যাক বিভিন্ন প্রাণির মাংসে খাদ্য উপাদান গুলি কি পরিমানে আছে।

প্রজাতি ভেদে মাংসের পুষ্টি গুণের তুলনাঃ

প্রজাতির নাম প্রোটিন  ফ্যাট  পানি মিনারেল ক্যালরি /১০০গ্রাম সমৃদ্ধ উপাদান
গরু ১৬-২০ ১১-২৫ ৫৫-৭০ ০.৮-১ ২২০ লৌহ,ভিটামি বি, ডি; ফসফেট; কপার, সেলিনিয়াম, জিং
মহিষ ১৬-২০ ১২-২০ ৫৫-৭৫ ০.৯-১ ২৪০
ছাগল ১৫-২০ ২০-৩৫ ৫৫-৬৫ ০.৮-১ ৩৬০ ভিটামিন-বি,সেলিনিয়াম,পটাসিয়াম ম্যাগনেসিয়াম
ভেড়া ১২-১৮ ১৭-৩৭ ৫২-৬৫ ০.৮-০.৯ ৩৫০
মুরগি ১৫-২১ ৩২-৪ ৬৫-৭৪ ০.৭-০.৮ ১০৫ নিয়াসিন, সেলেনিয়াম, ভিটামিন বি৬
শুকুর ১৪-১৬ ২৫-৩৫ ৪৮-৬০ ০.৮-০.৯ ৩৮০ জিং, নিয়াসিন ফসফরাস
খরগোশ ২২ ২২ ৭৫ ০.৭-০.৯ ২৮০ ভিটামিন-বি, ডি;সেলিনিয়াম, নিয়াসিন

মাংস কার্ডিয়াক তথা হার্ট রোগ এবং ডায়েবেটিস বাড়ানোর জন্য দায়ী নয়ঃ
অনেকে দাবি করে মাংস হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুকি বাড়ায়। কারণ এতে উচ্চ হারে সেচুরেটেড ফেট আছে। ধারণাটি হর্বাট এক গবেষণা ভুল প্রমানিত হয়েছে। এক সুদীর্ঘ গবেষণায় তারা দেখিয়েছে ২০টি অনুসন্ধানে মোট ১২১৮৩৮০ জন মানুষের কারোরই হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিস এর জন্য লাল মাংসের কোন সম্পর্ক পাওয়া যায় নি। অন্যদিকে ইউরোপের ই পি আই সি (EPIC) ৪৫০ হাজার জনের উপর গবেষণা চালিয়ে তেমন উল্লেখ যোগ্য সম্পর্ক খুজে পাননি মাংস খাবার সাথে এ ধরণের রোগের। তবে হ্যা দুই গবেষণায় তারা দেখিয়েছেন মাংসের বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবার খেলে হার্টরোগ, ডায়াবেটিস সহ অন্যান্য রোগ বারে। তাই দীর্ঘ স্থায়ী রোগ থেকে বাঁচতে চান তবে আপনাকে অবশ্যই প্রক্রিয়া জাত খাবার পরিহার করতে হবে। তবে অপ্রক্রিয়া জাত বা সাধারণ মাংস নিঃশ্চিন্তে খেতে পারেন।

উন্নত মানের প্রোটিন উৎসঃ
আমাদের শরীরের ২২ টির মত প্রয়োজনীয় এমাইনো এসিডের দরকার হয় যার গুরুত্ব পূর্ণ ৯ টি আমাদের খাবারের মাধ্যমে সংগ্রহ করতে হয়। যা আমরা প্রাণিজ খাদ্য থেকে সহজে পেতে পারি। কিছু কিছু এমাইনো এসিড উদ্ভজ খাবার থেকে পেলেও তা প্রানিজ আমিষের মত অত উন্নত নয়। আর প্রোটিন বা আমিষ এমন একটি উপাদান যা আমাদের দৈহিক বৃদ্ধি, হাড় মাংসের গঠনে মুখ্য ভুমিকা পালন করে। তাই শরীরের হাড় মাংস গঠনে কিংবা বৃদ্ধ বয়সে হাড়ের ক্ষয় হওয়া ভঙ্গুরতা রোগ থেকে রক্ষাপেতে চান তাহলে মাংস খাওয়ার বিকল্প নেই।

খাবার হিসেবে মাংস কোন ভাবেই আপনার জন্য ঝুকি পুর্ণ নয়ঃ
পরিমাণ মত নিয়ম মেনে মাংস খেলে কোন ক্ষতি হয় না। যা আমরা উপরের আলোচনা থেকে বলেতে পারি। শুধু মাংস নয় প্রয়োজনের অতিরিক্ত যে কোন খাবার শরীর মুটিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন রোগের কারণ হতে পারে। যারা ভেজিটারিয়ান তারা স্বাস্থ্য নিয়ে অনেক সচেতন থাকে তাদের বেশির ভাগ আবার ডিম দুধ খেয়ে থাকে তাই স্বাস্থ্যগত তেমন কোন সমস্যা হয় না। ভেজিটারিয়ানদের সুস্থ থাকাটা তাদের স্বাস্থ্য সচেতনতার জন্যই মাংস না খাওয়ার জন্য নয়। বরং তারা প্রাণী থেকে প্রাপ্ত গুরুত্ব পূর্ণ খাদ্য উপাদান গুলো থেকে বঞ্চিত হয়। আর মাংস খাওয়াতেও তেমন কোন ক্ষতি নেই।

বিশ্বজুড়ে মাংসের বাণিজ্যিক হালচালঃ
অস্ট্রেলিযা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, আযারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাজ্য প্রভৃতি দেশে সাধারনভাবে মাংস শিল্প-কারখানা দ্বারা মোডকে বাঁধাই করে বাজারজাত করা হয। এই মাংসগুলো স্তন্যপাযী প্রজাতির (শূকর, গবাদি পশু, ভেডা, ইত্যাদি) হযে থাকে যা মানুষের খাওযার জন্য লালন-পালন এবং তৈরি করা হযে থাকে। এই দেশ গুলোই বিশ্ববাজারে মাংস শিল্পে নেত্রিত্ব দিচ্ছে।

বিগত কয়েক বছরে পৃথিবীর মানুষ যত মাংস খেয়েছেঃ
ওর্গানাইজেসন অব ফুড এন্ড এগ্রিকালচার বা এফএও (FAO) এর ১৯৯১ সালের পরিসংখ্যান মতে ১৯৭০, ১৯৮০, ১৯৯০ এর পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন প্রজাতির যে পরিমাণ মাংস খাওয়া হয়েছে তার একটি তালিকা দেয়া হল-

বিশ্বে মাংস উৎপাদন (মিলিয়ন টনে):

  ১৯৭০ ১৯৮০ ১৯৯০
গোটা বিশ্বে মোট মাংস ১০০ ১৩৬  ১৭৬
গরু ও মহিষের মাংস ৩৯৫  ৪৬  ৫৩
ছাগল ও ভেড়ার মাংস ৬৯  ৭৫  ৯৬
পোল্ট্রির মাংস ১৫  ২৬  ৪০
শুকুরের মাংস ৩৫  ৫৩  ৬৯
অন্যান্য  ৩১  ৩৫ ৩৭

উপর্যুক্ত পরিসংখ্যান হতে দেখা যাচ্ছে প্রতিনিয়ত মাংসের চাহিদা বাড়ছে। দিন কে দিন নতুন নতুন প্রাজাতি মানুষের খাদ্য তালিকায় প্রবেশ করছে। পশ্চিমা বিশ্বে শুকুরের মাংসের ভক্ষণের পরিমাণ বেশি। গরু মহিষের মাংসও তাদের খাছে সমান জন প্রিয়। অন্যদিকে উন্নত দেশগুলোতে গরু মহিষ এর পাশাপাশি ছাগল ভেড়া অনেক জন প্রিয়। আগে মানুষ নিজে পশু-পাখি শিকার করে অথবা পালন করে মাংস খেতো। কালের পরির্বতনে যুগের চাহিদায় তা আজ শিল্পে রূপান্তরিত হয়ছে। যা আজ একটি লাভ জনক সম্ভবাবনাময় ব্যবসা মাধ্যম।

বাংলাদেশে মাংসশিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনাঃ
জনসংখ্যা বিষ্ফোরনের প্রেক্ষাপটে এসেছে খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন। আমাদের ভাবতে ভবে কি নেই আমাদের। আমরা যদি আমাদের আমদানি সামগ্রী কমাতে পারি। দেশেই উৎপন্ন করি খাদ্য তাহলে আমাদের দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নিত করতে খুব বেশি সময় লাগবে না। আমাদের দেশের এক কোটির বেশি মানুষ ভূমিহীন। এর সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছে। কর্মসংস্থানের অভাবে বেকারের সংখ্যাও বাড়ছে। এই জন শক্তি কে কৃষিকাজে ফল ফসল ও পশুপাখি পালনে উৎসাহিত করা যেতে পারে। তবে এ জন্য কৃষি পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে আমরা পুষ্টি ঘাটতি কমাতে ও আর্থিক ভাবে লাভবান হতে পারে।

আমাদের পাশের দেশ ভারত থেকে বৈধ অবৈধ সকল প্রকারে গুরু আসা বন্ধ হয়েছে। এতে করে মাংসের দাম বাড়লেও কিছু সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। বোর্ডার দ্বারা সংক্রামিত রোগ বালাই হ্রাস পাবে। যার ফলে দেশে বেশি বেশি গরুর খামার গড়ে তুলা যাবে। কয়েক মাস আগে এফ এম ডি বা ক্ষুরারোগ নামক রোগটি হাজার হাজার গরু মেরে ফেলল যা আমাদের প্রতিবেশি দেশ থেকে গরু আনার অভিশাপ। কেননা ভারত ক্ষুরারোগ এখন নিয়ন্ত্রনে আনতে সক্ষম হয়নি। আমরা যদি আমদানি বন্ধ রেখে আমাদের দেশে গবাদি পশুতে নিয়মিত ক্ষুরারোগের টিকা প্রাদান করি তাহলে এরোগ আমাদের দেশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

পশ্চিমা দেশ গুলো আজ মাংস রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন করছে। আমাদের পার্শবর্তিদেশ ভারত পাকিস্তান ও বিশ্ব বাজারে মাংস রপ্তানিতে সফলতা আছে। মাংসের ব্যবসা লাভজনক হওয়ায় পাকিস্তানের তারকা খেলোয়াড় ইঞ্জামামুল একজন সফল মাংস ব্যবসায়ী। আমরা কেন পারবনা। আমরাও পারি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন করতে।

শুধু মাত্র ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের দিনগুলিতে যে পরিমাণ মাংসের প্রয়োজন তাও আমাদের ঘাটতি আছে। আর সারা বছর জুড়েতো মাংসের চাহিদা থাকছই। তাই এখনি সময় কাজ শুরু করার। কেননা এই সম্ভাবনাময় ক্ষাতে সরকারি বেসরকারি বিনিয়গের ব্যপক সুযোগ রয়েছে। আর্থসামাজিক উন্নয়ন দেশে বেকারত্ব ঘুচানো এবং পুষ্টি চাহিদা পুরন করতে কৃষিখাতের উন্নতির বিকল্প কৃষিখাতই। তাই সরকারি, বেসরকারি, সামাজিক পারিবারিক, ব্যক্তিগত ভাবে এজন্য আমাদের এক যোগে কাজ করতে হবে।


লেখকঃ
ডাঃ মোঃ মুনিরুজ্জামান
ডিভিএম, এমএস ইন পাবলিক হেলথ এন্ড ফুড হাইজিন
জেনারেল প্রাক্টিসনার
ভেটস এন্ড পেটস কেয়ার, দিনাজপুর
ইমেইল- drmunirbd19@gmail.com
মোবাইল নং- 01774624240




  এ বিভাগের অন্যান্য