www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

বর্গাচাষীর দুঃস্বপ্ন


 ডাঃ মোঃ রোমেল ইসলাম    ২০ জুন ২০২০, শনিবার, ১০:২৬   সম্পাদকীয় বিভাগ


অনেকটা আধ ভেজা হয়েই মন্টুর দোকানে বসলাম। বর্ষার শুরুটা এইভাবে হবে আগে ভাবতে পারি নাই, সাথে তাই রেইনকোর্টও নেয়া হয় নাই। অফিসে ইমার্জেন্সি সার্ভিস চলমান, তাই করোনার এই মহামারির সময় অফিস কামাই দেয়ার সুযোগ নাই । সকাল সকাল মন্টুর দোকানটায় আজকে বেশ ভীড়।
- স্যার, চাবিটা দেন ! আফনের মোটরসাইকেল সোজা কইরা ছাউনির ভিতরে দেই, ভিইজা যাইতাছে তো !
- আরে রাখ, লাগবো না, ভিজতে দে ; আমি যে ভিইজা গেলাম গা, আমারে চোহে দেখলি না ! দে, তোর গামছা টামছা কি আছে দে, একটু হুকাইয়া লই !
- স্যার, মেলা দিন পর দোহান খুলছি, অহন থেইক্যা চা ১২ টেহা রাখুম ।
- দে, চা দে ! আর বকিছ না ।

গত ৫ বছর ধরে এভাবেই মন্টুর দোকানে হাজিরা দিয়ে শুরু হয় আমার অফিস । অসম্ভব সুন্দর চা বানায়, চা বানানোটা যে একধরণের শিল্প হতে পারে ; সেটা মন্টুর হাতের চা না খেলে কেউ বিশ্বাসই করবে না। গোটা এক সসপেন দুধ সারাদিন ধরে চুলায় পুড়তে থাকে ; দুধ যতই পুড়তে থাকে চায়ের স্বাদ ততই মধুর হয়।

আজ দোকানের ভীড়টা একটু অন্যরকম লাগছে। জন পাঁচেক কৃষাণের কৌতুহলী মুখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বরাবরের মতো ডান কোণাটায় শফিক চাচা প্রখর দৃষ্টিতে পত্রিকার পাতায় ডুবে আছেন। ১০৩ দিনে এক লাখ, মোটা দাগে পত্রিকার কলামটা দূর থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। অন্য দিনের মত আজ আর চাচাকে রাগাতে ইচ্ছে করছে না, তারপরও ডিজি হেলথের ভবিষ্যদ্বাণী ছাপিয়েছে কিনা জানতে চাইলাম,
- হ, ছাপছে ; এমনে কইরা আরও দুই তিন বছর করোনা থাকবো । এইসব আজাইরা কথা শোনানোর লাইগাই তো সরকার হেরে বেতন দিতাছে। হেয়, আর কি আশার বাণী শুনাইবো , হের থেইক্যা ঐ বেডির কথাই ভালা।

আমি আর এসব হতাশার মাঝে নেই, অমোঘ সত্যকে আমি মেনে নিয়েছি, করোনাকে জীবনসঙ্গী করেই আমাদের পথ চলতে হবে। কিছুক্ষন চুপ মেরে থেকে চায়ে চুমুক দিতে দিতে ঝুম বৃষ্টিতে হারিয়ে গেলাম। কি জোরে সোরেই না পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ছে। মেঘের থেকে পাওয়া সব দুঃখ কষ্ট আর বিদ্যুতের আচমকা ঝাটকার আঘাত সহ্য করে মাটির সব জরা জীর্ণ ধুয়ে মুছে পরিস্কার করে দিচ্ছে। আমাদের জীবনে এখন এইরকম একটা বৃষ্টি সত্যিই খুব প্রয়োজন।

টেবিলটায় একটা বড়সড় ফুলে ফেঁপে ওঠা কালো স্কুল ব্যগটাতে দৃষ্টি আটকাতেই আমার স্কুল জীবনের সবচেয়ে বিরক্তিকর বস্তুর কথা মনে পড়ল। এইরকম একটা ভারী ব্যাগ বহনে কতরাত যে কাধঁ আর পিঠ ব্যথায় কান্নাকাটি করেছি, সেই স্মৃতি এখনও ভুলি নাই। আমার ব্যাগ টার সাথে সাদৃশ্য হলো এটারও উপরের চেন ছেড়া, সাইড পকেটে যেখানে আমি পানির বোতল রাখতাম,এই ব্যাগে সেখানে দাত মাজা পাউডার, ব্রাস আর সাবান জায়গা দখল করে আছে। পাশেই বসা আমার বয়সী টগবগে শক্ত সামর্থ্য যুবক সিরাজুলের চোখে মুখে কি জানি একটা হতাশার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গত রাতে উত্তরবঙ্গ হতে সিরাজুল সহ তার সঙ্গীরা বোরো ধান কাটার কাজ জোগাড় হওয়ার আশায় এই বাজারে এসেছে । আমাদের দেশে মে মাসের মাঝামাঝি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত বোরো ধান কাটা মাড়াই চলে। উত্তরাঞ্চলে ধান আরও সপ্তাহ খানেক আগেই পেকে যায় এবং অগ্রিম কাটা মাড়াই হয়ে থাকে । অপেক্ষাকৃত নিচু জমি, হাওড়, বিলের বোরো ধান এইবছর একটু আগেই যেন কাটা মাড়া শুরু হয়েছে। সিরাজুল নিজে একজন বর্গাচাষী, নিজ খরচে অন্যের জমিতে ভাড়ায় ধান চাষ করেন। ১০ কাঠা জমির ধান কাটা মাড়াই শেষ করেই তবে মৌসুমী কৃষিশ্রমিক হতে এতদূর এসেছেন।

গতবছর ঠিক এই সময়ে বাজারের ভীড়টা ছিল জমজমাট। সাধারণত অন্য সময় যেখানে আমার সর্বোচ্চ দুই মিনিট সময় লাগে সেখানে আধ কিলোমিটার বাজার পাড় হয়ে অফিস যেতে আমার সময় লেগেছিল প্রায় ২০ মিনিট ।করোনার দুর্যোগে এবছর রাস্তার দুপাশে মহাজন বাজার তেমন জমে নাই। অনেকটা দাস বাণিজ্যের মত মহাজনের হাকানো বিভিন্ন দরকষাকষিতে কামলা কেনা হয়। মহাজনের বিপরীতে থাকা মৌসুমী ধান কাটা শ্রমিকেরা যৎসামান্য মূল্যের বিনিময়ে ঘাম বিক্রি করেন । সকাল ও রাত্রিতে দিনচুক্তিতে জমে উঠে মহাজন বাজার। দর কষাকষি দ্রুত মিটমাট করে পাঁচ সাত জনের এক একটি দল তিনবেলা খাবার খাওয়ার চুক্তিতে মহাজনের বাসায় তিন চার দিনের জন্য কামলা হয়ে ধান কাটতে শুরু করেন।

বছরের এই সময়টা এলেই আমার কেন জানি দাস প্রথার কথা খুব বেশী করে মনে পড়ে। প্রাচীনকালে মানুষ কেনা বেচার বাজার বসত। তখন দাস দাসী আমদানি ও রফতানিতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হত এবং এটা দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ত। সাধারণত দাসদাসিরা আফ্রিকান হত। আফ্রিকান দাস এর মধ্যে হাবসি ও কাফ্রির চাহিদা ছিল বেশী। বাংলায় এসব দাসদাসি ৫-৭ টাকায় কেনা যেত। তখন সমাজে গুটি কয়েক দাস রাখা একটি সামাজিক মর্যাদার ব্যপার ছিল। এছাড়া উচ্চবিত্তরা দাসদের দিয়ে বিভিন্ন কৃষিকাজ, গবাদি পশু পালন, ঘরবাড়ি পাহাড়া দেয়া,বাজার সদাই ইত্যাদি কাজ করাত। দাসিদের সাধারণত রাখা হত যৌন লোভ লালসা পূরণ করার জন্য। তাদের উপপত্নী করে রাখা হত এবং তাদের সন্তানদেরও দাস রুপে রাখা হত অথবা বিক্রি করা হত। পরবর্তীতে ব্রিটিশ সরকার এই দাস প্রথা নিরুৎসাহিত করে এবং ১৮৪৩ সালে আ্যক্ট ফাইভ আইন দ্বারা দাসদাসি আমদানি ও রফতানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে। ব্রিটিশ উপমহাদেশ থেকে বিতাড়িত হলেও প্রাচীন চিরাচরিত কিছু নিয়ম আমাদের রক্তে আজও মিশে আছে ।

করোনা মহামারি এবার এই মহাজন বাজারের চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে। অনেক রাত পর্যন্ত চলা কৃষি শ্রমিকদের ভীড় এবার একেবারেই কম। যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় উত্তরাঞ্চল সহ দেশের বিভিন্ন স্থান হতে শ্রমিকেরা আসতে পারে নাই। কোন কোন শ্রমিক ঢাকায় রিক্সা চলাতে গিয়ে আটকে গেছে আবার অনেকে এখনও নিজ এলাকায় বন্দী। এইসব মৌসুমী কৃষিশ্রমিকেরা মূলত রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগ থেকে ধান কাটার জন্য এই দিকটায় আসেন। প্রতিবছর বোরো ধান কাটার জন্য প্রায় ১৮ লক্ষ শ্রমিক বিভিন্ন অঞ্চলে যান। হাওড়ে শ্রমিক সংকট দেখা দেয়ায় সরকার কিছু বাস সার্ভিসের ব্যবস্থা করেছিল যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক অপ্রতুল ছিল। সেসময় মৌসুমী কৃষিশ্রমিকদের কথা চিন্তা করে বিশেষ ট্রেন চলাচলের ব্যবস্থা করা হলে হয়ত কৃত্রিম কৃষিশ্রমিক সংকট নিরসন হত এবং অনেক কৃষি শ্রমিক উপকৃত হত।

সিরাজুলেরও কপাল পোড়া ; এবার আসতে একটু দেরি হয়ে গেল। গত মার্চে ঢাকায় রিক্সা চালিয়ে হাজার তিনেক কামাই করেছিল। হঠাৎ করেই মা’টা তার প্যরালাইজড হয়ে পড়ল। গ্রামে ফিরে হাসপাতাল দৌড়াদৌড়ি করে কোনমতে মাকে সুস্থ করে বাসায় আনতে পেরেছে। মায়ের চিকিৎসায় জন্য জমানো আট হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে। সপ্তাহে এখন নিয়ম করে তিনশ টাকার ঔষধ মাকে খাওয়াতে হয় তার। অন্যান্য সবার মত বছরের এই সময়টাতে সিরাজুলও বাড়ি থেকে দূরে এই হাওড়ে ধান কাটতে আসার জন্য অপেক্ষায় থাকে। মৌসুমী কৃষিশ্রমিক হয়ে এই এক দেঢ় মাসে যা আয় হয় তা দিয়ে অনেক কৃষক স্বপ্ন দেখে সুখ কেনার, কেউবা আবার পুরাতন ঋণ পরিশোধ করে। আসার সময় মেয়েটা এবার বায়না করছিল একটা রঙীন টিভি চাই তার। সিরাজুলও মনে মনে ঠিক করে রেখেছে এবার একটু বাড়তি আয় করে হলেও বউয়ের জন্য একটা মোবাইল কিনে নিয়ে যাবে। গতবারও চেষ্টা করেছিল, কেনা হয়ে উঠে নাই। এইবার সে প্রাণপণ চেষ্টা করবেই। বউকে আর ফোন করার জন্য জুলমতের বউয়ের কাছে যেতে হবে না। একমাত্র মেয়ে সুমিকে নিয়েও ভাবনার শেষ নেই। মেয়েটা তার কেবল অষ্টম শ্রেণীতে পড়ছে। পাড়ার ভাবি চাচিদের বাকা কথা আর সহ্য হয় না, এখনই মেয়েকে বিয়ে দেয়ার ইচ্ছা নাই তার। মেয়েকে মেট্রিক পাস করিয়ে এনজিওর কিস্তি আপার মত চাকরি করাতে চায়, সেই আশায় বুক বাঁধে সিরাজুল, একদিন মেয়ে তার সব কষ্ট দূর করবে। সুমিরও বড় হয়ে ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা। পড়ালেখাতেও ভাল, প্রতিবছর ক্লাসে প্রথম হয়। আমাদের দেশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ভাগ বর্গাচাষী কৃষকের স্বপ্ন দেখার বিস্তার সকলেরই প্রায় সিরাজুলের মত। তাদের স্বপ্ন দেখতেও ভয় লাগে কারণ ঘাম দিয়ে কেনা স্বপ্ন বারবার ভাঙা গড়ার খেলা খেলে।

গত বছর ধানের বাজার দর ছিল হাস্যকর ও হতাশাজনক । ১ লিটার বোতলজাত পানি আমাদের ২০ থেকে ২৫ টাকায় কিনে খেতে হয় অথচ গতবছর ১ কেজি ধান ১২ থেকে ১৪ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। উৎপাদন খরচ না উঠায় হতাশা আর ক্ষোভে কিছু কৃষকের আত্মহত্যা আর পাকা ধানে আগুন লাগানোর খবর পত্রিকার পাতায় শিরোনামও হয়েছিল। তাই গতবার সিরাজুলের দিন মজুরীও অনেক কম ছিল। উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক, কৃষিযন্ত্রপাতি ও সেচ ব্যবস্থার মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন খরচের সাথে সম্পর্কিত হলেও কৃষকের শ্রমকে আমরা মূল্যায়ন করি না। আমরা ব্যবসার সম্প্রসারণে কিংবা শেয়ারবাজার চাঙা করতে কালো টাকাকে সাদা করতে পারি, ঋণখেলাপিদের বকেয়া সুদে ছাড় দিতে পারি অথচ শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধিতে আমাদের অনেক অনিহা, বিপন্ন কৃষকদের ঘামের সঠিক মূল্য নির্ধারণ করতে আমরা অপারগ ।

গত বোরো মৌসুমে সিরাজুল দেঢ় বিঘা জমি ধান আবাদ করেছিল। ফলনও খুব ভালো হয়েছিল। আমাদের দেশে বাম্পার ফলন মানে কৃষকের চোখে মুখে চিন্তার ছাপ আর রতের ঘুম উধাও। সে বার ১ কেজি গরুর গোস্ত কিনতে সিরাজুলকে ১ মণ ধান বিক্রি করতে হয়েছিল। বর্গাচাষী সিরাজুল বউয়ের জন্য স্বপ্ন কেনার আর সাহস পায়নি, তাই এবার বেশী করে ফসল ফলানোরও বাড়তি চিন্তা মাথায় নেই। আমাদের প্রচলিত একটা ভুল নীতি বছরের পর বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে যে , কৃষকের কাছ হতে বেশি ধান ক্রয় করা যাবে না। একদিকে ধান ক্রয়ে সরকার অনিহা দেখাতে থাকে আর অন্যদিকে কাচা ধানের দাম ফড়িয়ারা খুবই সীমিত ধার্য করে। ফলে কাচা ধান শুকিয়ে মজুদ করার জায়গা না থাকায় কৃষকেরা অনেকটা বাধ্য হয়ে ঋণের বোঝা কমানোর জন্য কমদামে ফড়িয়াদের নিকট বিক্রি করে দেয়। কাচা ধান বিক্রি করার সপ্তাহ খানেক পর ধানের দাম আকাশছোয়া হয়ে যায় আর সিরাজুলের মত বর্গাচাষীর স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। ফসলের আসল লাভের ভাগীদার হয়ে উঠে ফড়িয়া, চাতাল মিল মালিকেরা। সরকারের উন্নয়ন দর্শনে বর্গাচাষীদের স্বার্থ মূল্যায়ন করা হয় না, মূল্যায়িত হয় ডিলার, মিল মালিক, বড় বড় চাল ব্যবসায়ীরা। আর সেজন্যই ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফালোভী স্বার্থ রক্ষায় ভরা মৌসুমেও পাশ্ববর্তী দেশ থেকে চাল আমদানি করতে দেখা যায়। সরকারি ধান কেনার প্রক্রিয়ায় মধ্যস্বত্বভোগী বিশেষ করে ধানকল ও চাতাল মালিকদের সিন্ডিকেটের মাড়প্যঁচে পড়ে কৃষকদের মরতে হয়, দুর্ভোগ বাড়ে সাধারণের। আমাদের দেশে সম্ভবত কৃষিই একমাত্র খাত যেখানে কৃষকদের কোন সিন্ডিকেট নেই, নেই কোন সংঘবদ্ধ চক্র,নেই কোন সমিতি।

করোনার চলমান এই দুর্যোগে সরকার ঘোষিত ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ক’জন প্রান্তিক কৃষক কিংবা বর্গাচাষীর হাতে পৌঁছাবে। জমির মূল মালিক যারা, তারা অনেক আগে থেকেই কৃষিকাজে উদাসীন। বর্গাচাষীর থেকে পাওয়া ভাড়ার টাকা ফসলের মূল লাভের থেকেও বেশী মনে হয় তাদের। তারপরও আমরা এখনও তেল দেয়া মাথায় তৈল ঢেলেই যাচ্ছি। এখনও অনেক প্রান্তিক ও বর্গাচাষী গতবছরের ঋণ শোধ করেন উঠানের গাছ বিক্রি করে, কেউবা অবসরে ঢাকায় রিক্সা চালিয়ে, কেউ মৌসুমী কৃষিশ্রমিক হয়ে। করোনা দুর্যোগে ঋণসহায়তা নয়, প্রয়োজন অর্থনৈতিক স্বাধীনতা । কৃষকদের দিতে হবে ফসলের ন্যায্য দামের নিশ্চয়তা, দিতে হবে ফসল বিক্রির সঠিক ব্যবস্থাপনা ও ভ্যালু চেইনের নিশ্চয়তা। সরকারের উচিত হবে কৃষকের উৎপাদিত ফসল সরাসরি ক্রয় করে জণগণের মাঝে কৃষিপণ্য সুষ্ঠুভাবে বাজারজাত করা।

কৃষকের খরচ কমানোর নামে মাথায় গামছা বেধে হাতে কাস্তে নিয়ে কাঁচা ধানের শিকড় উপড়িয়ে আমরা কতটা কৃষকবান্ধব আর কতোটা ফটোসেশন নির্ভর রাজনীতি করি তা বার বার প্রমাণ করে চলেছি। ঢাকার সাবেক এক মেয়রের পুনরায় টিকিট না পাওয়ায় স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছিল,তাই মনোবেদনায় টিভি ক্যমেরার সামনে দেশবাসীকে চোখের জল দেখালেন। অথচ যে কৃষক ফসলের ন্যয্যমূল্য না পেয়ে বার বার ঋণের দায়ে বিপর্যস্ত হয়ে তার স্বপ্ন গুলো বিসর্জন দিচ্ছে তার দুঃখ প্রকাশ করার জায়গা কোথায় !

আমরা প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক কৃষি চাই দেশের স্বার্থে, কৃষকের স্বার্থে। কৃষির বিভিন্ন যান্ত্রিক ও ব্যয়বহুল উপকরণ কৃষকের কাছে নিয়ে গিয়ে বার বার কৃষকদের সাথে প্রতারণা করছি। মুষ্টিমেয় কিছু বহুজাতিক কোম্পানির লাভের স্বার্থে মৌসুমী কৃষিশ্রমিকেরা আজ কর্মহীন, বেকার। আজ কম্বাইন হার্ভেষ্টার কৃষিশ্রমিকদের বিকল্প হিসেবে যত্রতত্র ব্যবহার হচ্ছে এবং আগামী দিনগুলোতেও এর ব্যপক হারে ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে বলে মনে হচ্ছে। এসব বহুমুখী হার্ভেষ্টার একদিকে যেমন কিছু মানুষের পকেট ভারি করছে অন্যদিকে লক্ষ লক্ষ মৌসুমী কৃষিশ্রমিকেরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। যন্ত্র মানুষকে আরাম দেয়, সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় করে জীবনকে সহজ ও সরল করে তোলে। কিন্তু অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদী কিছু যন্ত্রের অতিরিক্ত ব্যবহার যখন মানুষের জীবন জীবীকার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায় তখন কেবলই তা ধ্বংস ডেকে আনে। সিরাজুলের মত অনেক মৌসুমী কৃষিশ্রমিক বর্গাচাষী আজ কাজ না পেয়ে অসহায়, বেকার, চিন্তিত তার পরিবার। বর্গাচাষীর ঘরে হারিকেনের আলোয় দেখা স্বপ্নগুলো আজ ভাঙতে বসেছে। আজ যেখানে জীবন জীবিকা বন্ধ প্রায় সেখানে ছোট ছোট স্বপ্নগুলোকে বাস্তবায়ন করার চিন্তা করা বিলাসিতা ছাড়া কিছু নয়।

দেশের প্রায় ৫১ শতাংশ মানুষের ঘরে কাজ নেই, সামনের দিনগুলো আরও ভয়ানক হতে পারে । কৃষিজমিকে অনাবাদি রেখে বিকল্প কর্মসংস্থান খোজায় সিরাজুলের মত বর্গাচাষীরা বাধ্য হচ্ছেন। তারা গ্রাম ছেড়ে আগামীতে শহরমুখি হলে অর্থনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হবে। অদূর ভবিষ্যতে গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় কম্বাইন হার্ভেষ্টার নামক যন্ত্রের বেহিসাবী ব্যবহার বাড়াতে থাকলে এবং কৃষিশ্রমিকের বিকল্প হিসেবে ধান কাটা মাড়াই করলে লাভের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশী। তাই এখনই আমাদের ভাববার সময় ; আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার লক্ষ্যে কৃষিপণ্য সংরক্ষণে ও বিপণনে সুষ্ঠু নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে এবং কৃষিশ্রমিকদের জন্য সঠিক শ্রমনীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। আমরা এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি না রাখার যে মহতী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি তা বাস্তবায়ন করতে হলে সিরাজুলের মত বর্গাচাষীদের কষ্টকে মূল্যায়ন করি, তাদের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখি, বাঁচিয়ে রাখি গ্রামীণ জীবন ও জীবিকা।

লেখকঃ
ডাঃ মোঃ রোমেল ইসলাম
ডক্টর অব ভেটেরিনারি মেডিসিন
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
Email- romeldvm@gmail.com




  এ বিভাগের অন্যান্য