www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

সালমোনেলা ভাইরাস ও সাংবাদিকতার দায়বদ্ধতা


 ডাঃ মোঃ আনিসুর রহমান    ২৭ জুন ২০২০, শনিবার, ১০:০০   সম্পাদকীয় বিভাগ


গত কয়েকদিন থেকেই বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের অনলাইন ভার্সনসহ নামে বেনামের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে “নতুন রোগ সালমোনেলা মুরগি থেকে ছড়াচ্ছে” ও “মুরগি থেকে ছড়াচ্ছে নতুন রোগ সালমোনেলা” সহ নানা শিরোনামে বিভিন্ন খবর আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। কোন পত্রিকা বলছে এটি একটি ভাইরাস আবার কোন পত্রিকা বলছে ব্যাকটেরিয়া। প্রথমত যারা ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের তফাত বুঝে না বা জানেনা, আমার মনে হয় এমন অনভিজ্ঞ সাংবাদিকদের পোল্ট্রি ইন্ডাষ্ট্রির মত এত বড় বিষয় নিয়ে এই ধরনের সংবাদ না প্রকাশ করাই উত্তম।

আমেরিকায় সালমোনেলোসিস রোগ নাকি মানুষের দেহে সংক্রমিত হয়েছে, একজন মারাও গেছে। এই ধরনের খবর ছাপানোর পুর্বে দেশে যারা পোল্ট্রি বিশেষজ্ঞ আছেন তাঁদের সাথে কথা বলার দরকার ছিল। এই রকম ভিত্তিহীন খবর ছাপানোর ফলে জনগণ পোল্ট্রি, পোল্ট্রি জাত পণ্য,ও ডিম খাওয়া ছেড়ে দিলে কিংবা পোল্ট্রি শিল্পের উপর বিরুপ প্রভাব পড়লে কি হবে এর দায়ভার কে নিবে?

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রনালয়ের উদ্যোগে এই সব বিষয়ের খোঁজ খবর রাখতে হবে। আমরা ফিল্ড অফিসার, ফিল্ডে কাজ করি। আমাদের কথার মুল্যায়নই বা কতদুর। কোথায় এখন বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাষ্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি)? সকল সমস্যার সমাধানের বেলায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ঘাড়ে চাপিয়ে সবাই চুপচাপ তামাশা দেখছে। বিপিআইসিসির কি কোনই দায়িত্ব নেই? আমি সরকারের উর্ধতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষন করছি, বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের তীব্র প্রতিবাদ করার জন্য। প্রয়োজনে জনস্বার্থে প্ত্রিকার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা। জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করা। করোনা ভাইরাসের প্রচারের মত করে জনগনকে বুঝাতে হবে যে, সালমোনেলোসিস রোগে মানুষের কোন ক্ষতিই হয়না। মাংস ও ডিম সেদ্ধ করে খেলে রোগের জীবানু তাপে ধ্বংস হয়ে যায়।

ফাউল টাইফয়েড বা সালমোনেলোসিস একটি ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট রোগ। এ রোগ যুগের পর যুগ বাংলাদেশ সহ পোল্ট্রি সেক্টরে অবস্থান করছে। মানুষ এবং সালমোনেলোসিস রোগ একত্রে বসবাস। এতদিন তো সামোনেলোসিস দ্বারা কোন মানুষ আক্রান্ত হয়নি? আর যেহেতু ব্যাকটেরিয়াল ডিজিজ তাই এই রোগ নিয়ে কোন মাতামাতি নাই। সামান্য পাতলা পায়খানা হলে ঔষধ খেলেই সেরে যায়। এটা নতুন কোন খবর নয়, আসলে ভয় পাবার কোন কারনই নাই।

এটি সালমোনলা গ্যালিনেরাম নামক ব্যাকটেরিয়া (এরোবিক) দ্বারা সৃষ্ট মুরগির একটি রোগ। পি এইচ ৪-৯ এর মধ্যে এরা ভাল বংশ বিস্তার করতে পারে। আদ্র পরিবেশে ২০-৪৪ ডিগ্রী সেঃ তাপমাত্রায় এই জীবানুর বংশ বিস্তারের জন্য উপযোগী। এই রোগ আর্দ্র খাবারের মাধ্যমেই বেশী ছড়ায়। তবে খাদ্যকে ৮০ ডিগ্রী সেঃ তাপমাত্রায় পিলেটিং করলে এই রোগ ছড়াতে পারেনা। মুরগির সব বয়সেই এই রোগ হয় তবে ডিম পাড়ার শুরুর সময়েই এই রোগ বেশী হতে দেখা যায়। মর্টালিটি ১০-৯০% পর্যন্ত হতে পারে, ১০-২০% ডিমের হার কমে যেতে পারে। ইনকিউবেশান পিরিয়ড ৬-৭ দিন তবে অনুকুল পরিবেশে এক বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। নোংরা পরিবেশে গাদাগাদি করে পালন করা, অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল ও ঠান্ডা লাগা সমস্যা থকে এই রোগের সংক্রমন হতে পারে। সালমোনেলা ব্যাটেরিয়ার ২২০০ টি সিরোটাইপ আছে। সাধারনত: বাড়ীতে পালনকৃত দেশী মোরগ মুরগিই এই রোগের বাহক। সাধারনত: খাদ্য, দেশী মোরগ মুরগি, ইঁদুর, চিকা, ভিজিটর, ইকুবেটর,ডিম, তেলাপোকা, পোকামাকড়,পাখি ইত্যাদির মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়।

হটাৎ করে কিছু বাচ্চা, মোরগ মুরগি মারা যায়, বেশী পানি খায়, ঝিমানো, খাওয়া কমিয়ে দেয়, নিস্তেজতা, পাতলা পায়খানা, টোপ ঝুটি বিবর্ন ও ছোট হয়ে যায়, সবুজ সালফার বা হলুদ পাতলা পায়খানা করে, অনেক সময় আমাশয় বলে অনেকে ভুল করে, সাদা বা হলুদ মল মলদ্বারে লেগে থাকতে দেখা যায়, ওজন কমে যায়, ডিম কমে যায়, খাওয়া কমে যায়, ফাইব্রিনাস পেরিটোনাইটিস দেখা যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণ ভাল বোঝা যায়না। লিভার বড় হয়ে যায় কাঁসার মত/পিতলের মত রং বা মেহগনির মত রং ধারন করে। অনেক সময় লিভার উজ্জল সবুজ বর্নের হয় (প্যাথোগনোমোনিক লিশান), ফুসফুস ইডিমেটাস ও কনজেসটেড, ফুসফুস পানিতে রাখলে ডুবে যায়। প্লীহা বিবর্ন ও বড় হয়ে যায়, পেটের ভিতরে ভাঙ্গা ডিম পাওয়া যায়।

রোগ প্রতিরোধে ভাল হ্যাচারীর বাচ্চা নিতে হবে। বায়োসিকিউরিটি মেনে চলতে হবে। পানিতে প্রোবায়োটিকস, ক্লোরিন ও এসিডিফায়ার ব্যবহার করতে হবে। সেডে/ঘরে নিয়মিতভাবে জীবানু নাশক স্প্রে করতে হবে। সেডের পরিবেশ শুকনা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। যদি সম্ভব হয় উদ্ভিজ্জ আমিষ ব্যবহার করতে হবে। নিয়মিত টিকা প্রদান করতে হবে।

এ রোগের বিস্তারিত আলোচনা করার উদ্দেশ্য হল, সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করা, যাতে কোন বিভ্রান্তিতে না পড়ে। সচেতন থাকতে হবে, আর সাংবাদিকদের উচিত পোল্ট্রি সংশ্লিষ্ট খবর প্রকাশের আগে কোন বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া। সাংবাদিক হিসাবে জাতির কাছে তারা সঠিক খবর পৌঁছে দিতে দায়বদ্ধ, কপি-পেস্ট কিংবা বিদেশের বিখ্যাত কোন পত্রিকার খবর অনুবাদ করে প্রকাশের আগে জাতীয় স্বার্থের কথা ভাবতে হবে।


লেখকঃ
ডাঃ মোঃ আনিসুর রহমান
জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার
ফেনী।




  এ বিভাগের অন্যান্য