www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ
শিরোনাম:

অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ ভেটেরিনারি সেবাকে জরুরি সার্ভিস ঘোষনা করা হোক


 এগ্রিবার্তা ডেস্কঃ    ৬ জুলাই ২০২০, সোমবার, ৮:০৬   সম্পাদকীয় বিভাগ


বর্তমান করোনার ক্রান্তিকালে এই খাত ও পেশার গুরুত্ব দিবালোকের মতোই আরও একবার সকলের সামনে স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হল। বিশেষ করে, দেশের অন্তত ৭০% গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যাদের জীবিকা ও কর্মসংস্থান এই খাতের সাথে একসূত্রে জড়িয়ে আছে, যেই মানুষগুলোর হাতে পালিত পশুপাখি ও উৎপাদিত দুধ, মাংস, ডিম বিক্রি করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে হয়, তার পরিবারের খাবার যোগাড় করতে হয় তারা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছে -সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের লোকগুলো তাদের পশুপাখির সুরক্ষার জন্য, উৎপাদিত ডিম, মাংস, দুধের বিক্রয় ব্যবস্থা চালু রাখার জন্য কি প্রাণান্তকর শ্রম দিয়ে চলেছে!

এই চরম ভীতিকর দুঃসময়ে সরকার ঘোষিত ছুটির মধ্যেও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা- কর্মচারীরা তাদের জীবন বাজি রেখে সাধ্যমতো ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা বজায় রেখে (যাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে অন্য কেউ ভাবছে না) মাঠে-প্রান্তরে, কৃষকের বাড়ি বাড়ি ঘুরে পশুপাখির চিকিৎসা, রোগ প্রতিষেধক প্রদান, কৃত্রিম প্রজনন ও অন্যান্য পরামর্শ সেবা দিয়ে যাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকের পাশে দাড়াচ্ছে। তাদের জন্য কোন আর্থিক সুবিধা ঘোষনা করা হয়নি।

শুধু সরকারি দায়িত্ব পালনে নয়, গ্রামের ওই ভূমিহীন, প্রান্তিক মানুষগুলোর ভাগ্যের সাথে নিজেদের অংশীদার করে তাদের জীবিকার অবলম্বনগুলোর সুরক্ষা দেয়ার নৈতিক দায় থেকে, তাদের হাসি মুখের নিশ্চয়তা দিতে, রাষ্ট্রের কল্যাণে তারা নিষ্ঠার সাথে কাজ করে চলেছে। দেশে পর্যাপ্ত ধান উৎপাদিত হয়েছে। করনা সংকটোত্তর কালে এদেশের মানুষ না খেয়ে মরবে না, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। কিন্তু যে ভূমিহীন, প্রান্তিক মানুষগুলো তাদের ঐতিহ্যগত কারণে গবাদিপশু লালন-পালনকে জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে আঁকড়ে ধরে আছে, তাদের এই সম্পদ টিকিয়ে রাখতে না পারলে তারাই না খেয়ে মরবে। তদুপরি, একমাত্র জমির উপর নির্ভর করে কৃষকের জীবন চলে না। তাদের জীবিকা, পারিবারিক স্বচ্ছলতা, সকর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান অবলম্বন হল প্রাণিসম্পদ।

আর এই সম্পদের সুরক্ষা, খাদ্যসংস্থান, সংখ্যাবৃদ্ধি, জাত উন্নয়নের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, উৎপাদিত প্রাণিজ পণ্য--দুধ, দুগ্ধজাত পণ্য, ডিম, পোল্ট্রি ও অন্যান্য মাংসসহ দ্রুত পচনশীল খাদ্যপণ্য পরিবহন, বিপণনের দায়িত্ব নিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। পাশাপাশি ভোক্তাদের প্রত্যাশিত প্রাণিজ আমিষ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দেওয়ার ম্যান্ডেট রয়েছে এই মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাধে। আর তাই প্রশাসনের সহযোগিতায় সারাদেশে ভ্রাম্যমান প্রাণিজ পণ্য বিক্রয় কেন্দ্র চালু রাখা হয়েছে। মিষ্টির দোকান খোলা রেখে খামারির দুধ বিক্রির ব্যবস্থা সচল রাখার নিরলস প্রয়াস করে যাচ্ছে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

করনা প্রাদুর্ভাবের এই ঝুকিপূর্ণ সময়ে সরকার ঘোষিত ছুটির মধ্যেও প্রাণিসম্পদ বিভাগের সকল রুটিন কার্যক্রম যথারীতি এগিয়ে চলেছে। বিগত এপ্রিল মাসের বিভাগীয় সম্প্রসারণ কার্যক্রমের অর্জন নিম্নরূপঃ
১) গবাদিপশু পাখির চিকিৎসাঃ ৬৪,৫৫,৩৯২
২) টিকাবীজ উৎপাদনঃ ২,২৮,১৪,০৪৪ মাত্রা
৩) টিকাদানকৃত গবাদিপশু পাখিঃ ১,২৩,৫০,০০০
৪) সিমেন উৎপাদনঃ ৪,২৪,৬৯৪ মাত্রা
৫) কৃত্রিম প্রজননকৃত গাভীর সংখ্যাঃ ৩,২৭,৮৫৩
৬) উৎপাদনঃ দুধঃ ৭.২৭ লক্ষ মে.টন
                        মাংসঃ ৬.৪৪ লক্ষ মে.টন
                        ডিমঃ ৭৩০.১৮ কোটি
৭) কৃষক প্রশিক্ষণঃ ১৬,১৫৭
৮) খামার রেজিষ্ট্রেশনঃ ১,৬৭২
৯) রোগ নমুণা পরীক্ষাঃ ১০,০৩৬

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ করা প্রয়োজন, আমরা যারা ভোক্তা, আমাদের সন্তানদের দুধ, দুগ্ধজাত পণ্য--মিষ্টান্ন, দধি, ঘি, মাখন, পনির এবং ডিম, মাংস খাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারব? তাদের উন্নত পুষ্টি, মেধাবিকাশে এইসব প্রাণিজ আমিষের ভূমিকাকে কেউ অস্বীকার করতে পারবে? সম্মানজনক মেহমানদারি, সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় এগুলোর কোনো বিকল্প আছে কি?

সবই ভোগ করবো অথচ সেগুলো আকাশ থেকে পড়ে নাকি কৃষকের ঘাম আর রক্ত জল করা শ্রমে তৈরি হয়, কোন মন্ত্রণালয়/ বিভাগের নিষ্ঠা আর দিবারাত্রির নিরলস প্রয়াসে ১৮ কোটি মানুষের পুষ্টি নিশ্চিত হয়, তা জেনে-বুঝেও সচেতনভাবে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করব--এ কোন নীতি?

প্রাণিসম্পদ একটি জীবন্ত সম্পদ। এই সম্পদকে সৃষ্টিকর্তা তার সৃষ্টির সেরা জীবের ভোগের জন্য সৃষ্টি করেছেন। পশুপাখি যেই পালন করুক, তাকে সুষম খাদ্য দিতে হবে, স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান দিতে হবে, তবেই না সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আপনাকে দুধ দেবে, ডিম দেবে, গাভী ডাকে আসবে, তাকে প্রজনন করালে সে বাছুর দেবে, মুরগীর ডিম ফুটে বাচ্চা হবে। এদের রোগব্যাধি হবে, চিকিৎসা ও নিয়মিত প্রতিষেধক দিতে হবে। ছুটি থাকলে, হরতাল হলে, লকডাউন থাকলে গাভীর দুধ দেয়া, হাস-মুরগীর ডিম পাড়া, ডাকে আসা, অসুস্থতা বা রোগবালাই হওয়া- কোনটিই স্থগিত থাকবে না। তাই প্রাণিসম্পদের সেবার ব্রত যারা নিয়েছে, তাদের অফিস টাইম নেই, ছুটি নেই, হরতাল নেই, লকডাউন নেই, দিন নেই, রাত্রি নেই, দুর্যোগ নেই। এর নাম কি জরুরি সেবা নয়?

এ-ই মুহুর্তে স্বাস্থ্য বিভাগ, সরকারের প্রশাসন যন্ত্র, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ত্রাণ বিভাগের পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ বিভাগ কি মাঠেঘাটে, কৃষক- খামারির দোরে দোরে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে না? আপনারাই বিচার করুন!

মাননীয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী ও সম্মানিত সচিব স্যারের কাছে প্রাণিসম্পদ বিভাগে কর্মরত সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা- কর্মচারিদের প্রাণের দাবি--এখনই সময় জাতির কল্যাণে, দেশের প্রয়োজনে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষুধা দারিদ্রমুক্ত, মেধা-মননে পুষ্টিসমৃদ্ধ জাতি গড়তে প্রাণিসম্পদ খাতকে অগ্রাধিকার খাত এবং ভেটেরিনারি সার্ভিসকে জরুরি সার্ভিস ঘোষণার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। আপামর কৃষক, খামারিসহ এদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আপনাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

লেখকঃ
ডাঃ ভবতোষ কান্তি সরকার
প্রাণিসম্পদ অর্থনীতিবিদ
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ, ঢাকা।
প্রাক্তন জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার, যশোর।




  এ বিভাগের অন্যান্য