www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

প্রাণিসম্পদ খাতে করোনার প্রভাব মোকাবেলায় করণীয় ও সম্ভাবনা


 এগ্রিবার্তা ডেস্কঃ    ৬ জুলাই ২০২০, সোমবার, ১০:৫৬   পোল্ট্রি বিভাগ


বৈশ্বিক করোনা মহামারির এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অন্যান্য দেশের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিও এখন নাজুক অবস্থায়। অনেকেই কর্মসংস্থান হারিয়ে নাম লিখিয়েছেন বেকারত্বের খাতায়,পরিবার পরিজন নিয়ে পড়েছেন বিপাকে আবার অনেকেই অপ্রত্যাশিতভাবে পেশা বদল করতেও বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে দেশের প্রায় ১৭% মানুষ এখনও পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন, যার ফলে খুব সহজেই বিভিন্ন রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার আশংকাও রয়েছে প্রকট। এই অবস্থায় বেকারত্ব দূরীকরণ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি,মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণ এবং দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রাণিসম্পদ অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।

দেশের কৃষি নির্ভর অর্থনীতিতে প্রধান উপখাত হিসেবে প্রাণীসম্পদের বিশেষ ভূমিকা ইতিমধ্যেই প্রসংশনীয়। বাংলাদেশের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে এবং ৫০ শতাংশেরও অধিক মানুষ পরোক্ষভাবে প্রাণী সম্পদের উপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে। প্রাণিজ আমিষের(মাংস,দুধ,ডিম,মাছ) চাহিদার প্রায় ৭৬%– ৮০% আসে প্রাণিসম্পদ খাত থেকে। বর্তমানে দেশের জিডিপিতে প্রাণিসম্পদের অবদান ১.৪৭% এবং প্রবৃদ্ধির হার ৩.৪৭% (সূত্র: প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদন ১৮–১৯),যদিও বাস্তবে এর পরিমাণ আরও বেশি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে চাকরি হারিয়ে,উপার্জন কমে যাওয়ায় অথবা বাণিজ্যিক ভাবে লাভের আশায় অনেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন,সেক্ষেত্রে প্রাণিসম্পদ খাত হতে পারে অনন্য সম্ভাবনাময়। এ খাতের পোল্ট্রি এবং ডেইরি সেক্টর ইতিমধ্যেই সম্ভবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। গার্মেন্টস শিল্পের পরেই দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোল্ট্রি শিল্পে বর্তমানে ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ রয়েছে এবং বর্তমানে প্রায় ৬৬ লাখেরও অধিক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে,২০৩০ সাল নাগাদ পোল্ট্রি সেক্টরে ১ কোটিরও অধিক মানুষের কর্ম সংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পুরাতন ধ্যান-ধারণা পাল্টে মৌসুমি গরু মোটাতাজাকরণের স্থলে সারাবছর গরু মোটাতাজাকরণ শিল্প গড়ে উঠছে। প্রক্রিয়াজাত দুগ্ধপণ্য শিল্পের প্রসার ঘটছে প্রতিনিয়ত। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশ এখন মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। চাহিদার অতিরিক্ত মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানি করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

দেশে এখন প্রতিদিন প্রায় ২১৬ মিলিয়ন লিটার গো-মূত্র নিষ্কাশিত হয় যা থেকে গাজন প্রক্রিয়ায় প্রায় ২ মিলিয়ন টন ইউরিয়া স্যার উৎপাদন করা সম্ভব। বিশ্লেষকদের মতে,২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের জন্য যে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা আমাদের সামনে রয়েছে, এর মধ্যে ৯টির সঙ্গে প্রাণিসম্পদ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। প্রানিসম্পদ থেকে একদিকে যেমন মাংস, দুধ,ডিম উৎপাদিত হয়,অন্যদিকে মাংস, দুধ,ডিম থেকে আবার বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়াজাত ভোগ্যপণ্য তৈরী করা হয়। কাজেই এই খাতকে একটি দ্বিপক্ষীয় খাত হিসেবে বিবেচনা করলে এর বহুমাত্রিক সম্ভাবনাই পরিলক্ষিত হয়।

প্রাণিসম্পদের সম্ভাবনায় করণীয়:

  • অনতিবিলম্বে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অরগানোগ্রাম বাস্তবায়ন করে ভেটেরিনারি চিকিৎসা সেবাকে জরুরি সেবা হিসেবে ঘোষণা করা যাতে খামারিরা ২৪/৭ সেবা নিতে পারে।
  • যথাযথভাবে রোগ নির্ণয় করে প্রাণিস্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে প্রতিটি উপজেলায় সরকারি, বেসরকারি অথবা সমন্বিত উদ্যোগে ভেটেরিনারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার নির্মাণ করা এবং উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরকে পূর্ণাঙ্গ ভেটেরিনারি হাসপাতালে রূপান্তর করা।
  • প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন এম্বুলেটরি ভেটেরিনারি সেবা চালু করা।
  • সুলভমূল্যে সুষম পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ পশুখাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা।
  • বিদেশ থেকে আমদানিকৃত পোল্ট্রি খাদ্য উপকরণ এ করের পরিমাণ ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ বা ১০ শতাংশে নিয়ে আসা।
  • বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক ঐ অঞ্চলের উপযোগী পশু পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করা,বিশেষ করে চরাঞ্চল গুলো বিবেচনায় নিয়ে সেখানে পশুপালনের পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা।
  • প্রাণিসম্পদ খাত হতে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্যের অনলাইন বিপনণ ব্যবস্থার প্রসার ঘটানো।
  • জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন বোর্ড এবং জাতীয় ডেইরী উন্নয়ন বোর্ড গঠন করা।
  • নতুন উদ্যোক্তা এবং করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক খামারিদের সহজ শর্তে অথবা সুদমুক্ত ঋণ সুবিধার উদ্যোগ গ্রহণ করা।
  • নারী উদ্যোক্তাদের বিশেষ সুবিধা অথবা প্রনোদনার আওতায় এনে দক্ষ জনসম্পদে পরিণত করা।


পরিশেষে,এই খাতে সরকারি নীতি প্রণয়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন,প্রয়োজনীয় বেসরকারি বিনিয়োগ দেশের নাজুক অর্থনীতিকে গতিশীল করতে অনন্য ভূমিকা পালন করতে পারে।দুধ,ডিম,মাংসের চাহিদা পূরণ করে বর্তমানে প্রাণিসম্পদ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে দক্ষ জনশক্তি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

লেখকঃ
এস এম জুবায়ের আহমেদ
শিক্ষার্থী
লাইভস্টক সাইন্স এন্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়,গোপালগঞ্জ।




  এ বিভাগের অন্যান্য