www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ
শিরোনাম:

ব্রয়লার মুরগির প্রতি খারাপ ধারণাঃ কতটুকু যৌক্তিক


 মোঃ আব্দুল আজিজ    ৪ অক্টোবর ২০২০, রবিবার, ১২:৫৮   সম্পাদকীয় বিভাগ


ব্রয়লার মুরগি আদী মুরগি তথা জঙ্গলে বাস করত এমন মুরগি গুলির বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করে এবং সিলেকশন এর মাধ্যমে তৈরি করা হয়। আর এই বৈশিষ্ট্য গুলি কে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য উন্নত ও সুষম খাবার, সঠিক ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য সম্মত ব্যবস্থা, উপযুক্ত পরিবেশ ইত্যাদি দিতে হয়। যার কারণে অতি অল্প সময়ে দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং খাওয়ার উপযুক্ত হয়। আর এই মাংস নরম, সহজ পাচ্য এবং সকলের পছন্দনীয় হয়। আর এই জন্যই সারা পৃথিবীতে ব্রয়লার মাংস গ্রহণ অন্যান্য প্রাণী অপেক্ষা অনেক বেশি।

নিম্নের উদাহরণ থেকে সহজেই আমরা বিষয় টি বুঝতে পারি

  • সৌদি আরব - ৪৩ কেজি প্রতি জন প্রতি বৎসর
  • মালয়শিয়া - ৪৬ কেজি প্রতি জন প্রতি বৎসর
  • ইরান - ২৭ কেজি প্রতি জন প্রতি বৎসর
  • ইরাক - ১৫ কেজি প্রতি জন প্রতি বৎসর
  • ব্রুনাই - ৬২.৯ কেজি প্রতি জন প্রতি বৎসর
  • ইন্দোনেশিয়া - ৮ কেজি প্রতি জন প্রতি বছর
  • ওমান - ২১ কেজি প্রতি জন প্রতি বৎসর

আবার অমুসলিম রাষ্ট্রগুলিতে ব্রয়লার মুরগির মাংস গ্রহণের পরিমাণ আরো বেশি। কিন্তু দেখা যায় যে বাংলাদেশ একটি মুসলিম রাষ্ট্র এবং ৯০ শতাংশ মুসলমান বাস করে অথচ মুরগির মাংস গ্রহণ করে মাত্র ৬ কেজি প্রতি জন প্রতি বৎসর।

বাংলাদেশের মানুষের ব্রয়লার মুরগির মাংস কম খাওয়ার কি কারণ থাকতে পারে?
নিশ্চয়ই এর পিছনে কিছু কারণ আছে যার জন্য ব্রয়লার মুরগির মাংস কম খায়। এর কয়েকটি বাস্তব উদাহরণের একটি হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযয়ের একজন অধ্যাপক ২ টি ব্রয়লার মুরগি নিয়ে গবেষণা করেন। এই মুরগি গুলিকে তিনি ট্যানারির বর্জ্য খাওয়ান। এতে ২ টি মুরগি মারা যায়। এই দুইটি মুরগির মাংস বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন যে ব্রয়লার মুরগির মাংসে ক্রোমিয়াম অনেক বেশী এবং এই ক্রোমিয়াম কারসিনোজেনিক। আর এই গবেষণার ফলাফল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রকাশ করলেন। যেহেতু তিনি ট্যানারির বর্জ মুরগিকে খাওয়াছেন, যার জন্য মাংসে ক্রোমিয়াম এর পরিমাণ বেশি। এটা স্বাভাবিক, কেননা ট্যানারিতে চামড়া প্রসেস করার জন্য ক্রোমিয়াম ব্যবহার করা হয়। আর এই চামড়া প্রসেসিং করার সময় যে অপ্রযয়োজনীয় বস্তু পাওয়া যায় তাকেই ট্যানারি বর্জ্য বলে এবং তাতে ক্রোমিয়াম এর পরিমাণ বেশি থাকে।

অথচ উক্ত অধ্যাপক প্রচার করলেন যে ব্রয়লার মুরগিতে অর্থাৎ মাংসে ক্রোমিয়াম থাকে যা কারসিনোজেনিক। এই খবর ছড়িয়ে দেওয়া হলো সারাদেশে। টিভি সাংবাদিকগণ উৎসুক হয়ে তার সাক্ষাৎকার নিতে গেলেন এবং তাকে জিজ্ঞাসা করলেন আপনি কোন ব্রয়লার ফিড টেস্ট করেছেন কি যেখানে ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে? তিনি বললেন না। আমি শুধুমাত্র ট্যানারি বর্জ্য ২ টি বয়লার মুরগি কে খাওয়াই এবং সেই ব্রয়লারের মাংস টেস্ট করেছি। বাজারের কোন ব্রয়লার মুরগি টেস্ট করিনি, তাহলে আপনি বাংলাদেশের সকল ব্রয়লার মুরগির উপর ক্রোমিয়ামের কথা ছড়াালেন কেন? তার কোন উত্তর দিতে পারলেন না। আজ পর্যন্ত তিনি লজ্জা ও অপমানিত অবস্থায় আছেন। আর আমাদের দেশের মানুষও যাচাই-বাছাই করে না। এটা একটা খারাপ দিক। আমি মনে করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযয়ের প্রশাসনের উচিত ছিল উক্ত অধ্যাপকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তাহলে এরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।

আরো একটি উদাহরণ হল একজন মাওলানা তথা আলেম তিনি এক মাহফিলে বললেন যে ব্রয়লার মুরগির মাংস খেলে পুরুষ লোক খাসি হয়ে যায় অর্থাৎ উনার কথায় বুঝা যায় যে, টেস্টিস্টেরন হরমন নিঃসরণ বন্ধ হয়ে যায় ফলে পুরুষ লোকের স্পার্ম তৈরি হয় না অর্থাৎ খাসির বৈশিষ্ট্য লাভ করে। এক কথায় বলা যায় অটো ক্যাসট্রেটেড হয়ে যায়। অথচ তিনি মুরগির সম্বন্ধে কিছুই জানেন না। আর এই কথাটি সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া হল এবং মানুষও বিশ্বাস করল এবং ব্রয়লার মুরগি খাওয়া অনেকেই বন্ধ করে দিল।

বাংলাদেশের মানুষ এক্ষেত্রে কোন প্রকার যাচাই-বাছাই করল না। অথচ মুসলমানদের প্রাণপ্রিয় দেশ সৌদি আরব যেখানে ১০০% মুসলমান এবং তারা প্রতি জন প্রতি বছরে ৪৩ কেজি ব্রয়লার মুরগির মাংস খায় এবং মালয়শিয়ার লোকজন প্রতি বৎসর প্রতি জন ৪৬ কেজি ব্রয়লার মুরগির মাংস খায়। তবে কি তারা খাসি হয়ে গেছে? অদ্ভুত আমাদের দেশের মানুষ। আমাদের দেশের মানুষ হজ্বে গিয়ে ব্রয়লার মাংস খান, মালয়শিয়া গিয়ে ব্রয়লার মাংস খান তাতে কোনো সমস্যা হয় না। অথচ নিজ দেশে খান বাহাদুর সেজে যান। কারণ অন্য দেশে প্রমাণ ছাড়া এ ধরনের কথা বললে তাকে জেল খানায় যেতে হবে। বাংলাদেশে এমন একটি দেশ যেখানে যা খুশি তা বলা যায় কোন প্রকার প্রমাণ দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

অথচ এই লোকগুলি বাজারে মাছ কিনতে গেলে কিছু দালাল টাইপের লোকজন তাদেরকে ভিড় করে ধরে এবং বলে যে স্যার নদীর মাছ, দেশি মাছ, ফুলকা এখনো লাল আছে, ফরমালিনমুক্ত ইত্যাদি। মোটকথা উক্ত মাছ কিনতে বাধ্য করে। কিন্তু বাসায় গিয়ে দেখে যে ষোল আনাই মিছে। এভাবে বাংলাদেশের মানুষ সত্য কে বর্জন করে এবং মিথ্যাকে গ্রহণ করে। অথচ ব্রয়লার মুরগির খারাপ দিক সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোন তথ্য প্রমাণ দিতে পারেনি। একটি কথা সত্য যে তাদের এই কথাগুলির প্রমাণ না সরকারিভাবে চাওয়া হয় আর না বেসরকারিভাবে চাওয়া হয়। যার কারণে তারা এ ধরনের মিথ্যা কথা বলতেছে এবং ভবিষ্যতেও বলতে থাকবে। আমাদের দেশে ব্রিডার এসোসিয়েশন আছে, ওয়ার্ল্ড পোল্ট্রি সাইন্স এসোসিয়েশন আছে, পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশন আছে, এনিমেল হাজবেন্ড্রি সোসাইটি আছে, স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে কিন্তু কেহই এর প্রমাণ তাদের কাছে চান নি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এ ব্যাপারে কোন তথ্য প্রমাণ জমা দিতে বলেননি। অথচ অন্য কোন দেশে এরূপ একটি উক্তি করলে অবশ্যই তাকে প্রমাণ হাজির করতে হত। যদি প্রমাণ দিতে না পারত তবে তাকে শাস্তি ভোগ করতে হত।

তবে আমরা একটি কাজ করে থাকি তা হল কেহ এরূপ একটি উক্তি করলে তখন অনেকেই তাদেরকে গালিগালাজ, সমালোচনা ইত্যাদি করে থাকি। আবার অনেকেই বলেন যে মামলা করতে হবে এই করতে হবে ওই করতে হবে ইত্যাদি। কয়েকদিন পরেই সব চুপচাপ অথচ উচিত ছিল পরিকল্পনামাফিক দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

আবার অনেকে সোনালী মুরগি দেশি মুরগি হিসেবে খাচ্ছেন। বাংলাদেশের মানুষ সত্যকে গ্রহণ করতে চান না কিন্তু ধোকাকে গ্রহণ করতে পছন্দ করেন। এজন্য তারা সোনালী মুরগি দেশি মুরগি হিসেবে খাচ্ছেন। অথচ সোনালী মুরগির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্রিডিং পলিসি না থাকার কারণে এবং ইনব্রিডিং হওয়ার কারণে বংশ পরস্পরায় কিছু রোগ বহন করে। যেমন মারেক্স, লিউকেসিস, মাইক্রোপ্লাজমা, সালমোনিলা, ইত্যাদি। মারেক্স এমন একটি রোগ যা শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরিতে বাধা প্রদান করে। অর্থাৎ ইমোনো সাপ্রেশন ঘটায়। যার জন্য সোনালী মুরগিতে ভ্যাকসিন দেয়ার পরেও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় না। ফলে বিভিন্ন রোগ গুলি শরীরে বাসাা বাঁধে। যাার কারণে একদিন বয়স থেকে বিক্রি পর্যন্ত মাঝে মাঝে এন্টিবাযয়োটিক দেয়ার প্রযয়োজন হয়। বাজারে গেলে দেখা যায় যে সোনালি মুরগি বেশিরভাগ অসুস্থ থাকে। কোনটির ঝিমানোভাব, কোনটির মাথা ও চক্ষু ফোলা, শ্বাস-প্রশ্বাস সমস্যা ইত্যাদি।

বেশিরভাগ সময় অসুস্থ থাকার কারণে মাংসের পরিমাণ ও গুনগত মান খারাপ হয়। তাই দেখা যায় যে সোনালি মুরগির ড্রেসিং পার্সেন্টেজ ৬০%। পক্ষান্তরে ব্রয়লার মুরগির ড্রেসিং পার্সেন্টেজ ৭০% - ৭৩%। সোনালি মুরগি তে পালক খুব বেশি থাকার কারণে মাংসের পরিমাণ অনেক কম হয়। আবার হাড়ের পরিমাণ বেশি থাকে। মাংস প্লাস্টিকের মত লাগে এবং উপরের মাংসের লেয়ার উঠালে রগ গুলি (ভেইন) বড় আকারের দেখা যায়। এর ফলে খাবারেও অরুচি চলে আসে। তাছাড়া মৃত্যুর হার বেশি এবং খাদ্য রূপান্তর হার অনেক কম। অন্যদিকে ব্রয়লার মুরগির ক্ষেত্রে সুনিদৃষ্ট ও বিজ্ঞানসম্মত ব্রিডিং পলিসি অনুসরণ করা হয় এবং ফার্ম গুলিতে সকল প্রকার জীবাণু মুক্ত রাখা হয়। যার কারণে ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা জীবাণুমুক্ত থাকে এবং রোগপ্রতির ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। আবার প্যারেন্টকে বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে কিল্ড ভ্যাকসিন দেওয়াা হয় যার ফলে ১৮ - ২০ দিন পর্যন্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়। আবর উন্নত মানের খাবার দেওয়ার কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে থাকে। ব্রয়লার মুরগি ৩০ - ৩৫ দিন বয়সে বাজারের উপযুক্ত হয় বিধায় অ্যান্টিবাযয়োটিক খাওয়ানোর প্রযয়োজন খুব একটা পড়েনা।

বাজারে ব্রয়লার মুরগি দোকানে গেলে মনে হয় যে মুরগি গুলি খুবই স্বাস্থবান ও সতেজ এবং পালক খুবই কম যার জন্য মাংসের পরিমাণ অনেক বেশি হয় অর্থাৎ ড্রেসিং পার্সেন্টেজ অনেক বেশি। এই কারণেই সারা দুনিয়ায় ব্রয়লার মুরগি সকলের নিকট অত্যাধিক প্রিয় খাদ্য হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে এবং সবচেয়ে বেশি ব্রয়লার মুরগির মাংস সারা দুনিয়ার মানুষ গ্রহণ করছে।

লেখকঃ
মোঃ আব্দুল আজিজ
সিনিয়র জেনারেল ম্যানাজার
আমান পোল্ট্রি এন্ড হ্যাচারী লিঃ




  এ বিভাগের অন্যান্য