www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

ভারতের কৃষি আইন ও বাংলাদেশে কৃষকবঞ্চনার কতিপয় অনুষঙ্গ


 এগ্রিবার্তা ডেস্ক    ১৩ অক্টোবর ২০২১, বুধবার, ১১:০৮   সমকালীন কৃষি  বিভাগ


কোভিড-১৯ তার মহামারি চরিত্র দিয়ে ইতোমধ্যে পৃথিবী থেকে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিলেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তা দেশটির বহুল বিতর্কিত কৃষি আইনবিরোধী আন্দোলন মোকাবিলার ঝুঁকি থেকে বহুলাংশে বাঁচিয়ে দিয়েছে বলেই মনে হয়।

উক্ত আইন বাতিলের দাবিতে কৃষকদের রাজপথের আন্দোলন সেখানে যে উত্তাল রূপ ধারণ করেছিল, কোভিডের কারণে এখন তার প্রায় পুরোটাই স্তিমিত হয়ে এসেছে। এ ক্ষেত্রে মূল উপলব্ধ বিষয় এই যে, করপোরেট স্বার্থের নিরন্তর প্রতিভূ নরেন্দ্র মোদি ও তার দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নিজেদের শ্রেণিস্বার্থের বিপক্ষে যেয়ে কৃষকের দাবিমতে ২০২০-এর নভেম্বরে প্রণীত এ কৃষি আইন একান্ত নিরুপায় না হলে বাতিল করতে কখনোই সম্মত হবেন না। তবে করোনা কেটে গেলে কৃষকরা আবারও আন্দোলনে নামবেন না--এমনটি নিশ্চিত করে বলা যায় না। আর এ আইন ও একে ঘিরে ইতিপূর্বে সৃষ্ট আন্দোলনের গতিবিধির ব্যাপারে ভারতের বাইরেও ব্যাপক মানুষের মধ্যে যেহেতু বিশেষ উৎসুক্য তৈরি হয়েছিল, সেহেতু আপাততঃ এ আন্দোলন স্তিমিত হয়ে আসলেও এর গতিবিধির ব্যাপারে আন্তর্জাতিক আগ্রহ নিকট ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা চলে। আর সেই সূত্রে এ আলোচনাও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে যে, ঐতিহ্যিক ধারায় ক্রমাগত বঞ্চিত হয়ে আসা বাংলাদেশের সাধারণ কৃষকের চারপাশে গৃধ্নু, লোভী ও ধূর্ত কারবারি এবং সামাজিক দড়িবাজ শক্তির যে দৌরাত্ম্য, তার হাত থেকে ওই শোষিত কৃষকের মুক্তি কবে ও কিভাবে ঘটবে?

উপরোক্ত আগ্রহ ও জিজ্ঞাসাসমূহের জবাব খুঁজতে গেলে বিষয়গুলোকে একটু পেছন থেকে ও গভীরভাবে দেখা প্রয়োজন। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ২০১৯ সালে দ্বিতীয় দফায় সরকার গঠনের পর পরই দেশটির নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন জারি করলে তা নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এমনকি এক পর্যায়ে তা দেশব্যাপী সর্বাত্মক বিক্ষোভ-আন্দোলনেরও রূপ পরিগ্রহ করে। আর সরকারের পক্ষ থেকে সে আন্দোলন-বিক্ষোভ দমন করতে গেলে নিরাপত্তারক্ষীবাহিনীর হাতে অন্তত ৬৫ জন নিহত হয়েছিল। এমনি পরিস্থিতিতে ভারতসহ পৃথিবীব্যাপী করোনার ব্যাপক প্রাদুর্ভাব ঘটলে স্বভাবতই সে আন্দোলন-বিক্ষোভে ভাটা পড়ে। নইলে সে আন্দোলন-বিক্ষোভ কোথায় যেয়ে ঠেকতো এবং এ সূত্রে হতাহতের সংখ্যা কোথায় যেয়ে দাঁড়াতো, তা কারোর পক্ষেই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে এ নিয়ে দেশে দেশে এ অভিমতই ব্যাপকভাবে ব্যক্ত হয়েছে যে, এ আইন কোনোভাবেই অগ্রসর গণতান্ত্রিক চেতনার অনুগামী নয়। এমনকি মোদির প্রথম দফার সরকার পরিচালনার মেজাজের (স্পিরিট) সাথেও এটি যায় না।

তো, করোনাকালীন এ পরিস্থিতি চলতে থাকা অবস্থাতেই মোদি নতুন করে জারি করলেন বিতর্কিত কৃষি আইন, ভারতীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে যা বস্তুত দেশি-বিদেশি করপোরেটদের স্বার্থ রক্ষারই উদ্যোগ। ক্ষমতায় যাওয়া বা সেখানে টিকে থাকার জন্য ২০১০-পরবর্তী রাজনীতিতে বিজেপি নিজেদের গায়ে যতোই গণতান্ত্রিক লেবাস পরাবার চেষ্টা করুক না কেন, হিন্দু মহাসভা (১৯৪৮-৫১) থেকে জনসংঘ (১৯৫১-৭৭) হয়ে প্রথমে জনতা পার্টি (১৯৭৭-৮০) ও পরে ১৯৮০ সালে বিজেপিতে রূপান্তরিত এ দলটির ইতিহাস বস্তুতঃ বুর্জোয়া সাম্প্রদায়িকতারই ইতিহাস। ফলে এ দলের পক্ষে সাম্প্রদায়িক চেতনার বোধ দ্বারা তাড়িত হয়ে নাগরিক সংশোধনী আইন প্রণয়ন বা কট্টর মুনাফালোভী বুর্জোয়া পুঁজির পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করতে যেয়ে নতুন কৃষি আইন প্রণয়ন করাটা ছিল খুবই স্বাভাবিক। আর এটাতো স্বীকৃত বাস্তবতা যে, কিছু বিরল ব্যতিক্রম বাদে বিশ্ব এবং ভারত উভয়ের রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রায় পুরোটাই এখন করপোরেট পুঁজির হাতে বন্দী। কিন্তু তারপরও-যে ভারতের কৃষকেরা ওই জনবিরোধী কৃষি আইনকে রুখে দাঁড়াতে পথে নেমেছিল, তা নিঃসন্দেহে তাদের প্রতিবাদী চেতনা ও অসম সাহসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। আর তাদের এ ধরনের প্রতিবাদী আচরণের প্রেক্ষিতেই ভারতীয় হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আইনটি স্থগিত করতে উদ্যোগী হয়েছেন। তবে সে দেশের কৃষকদের দাবি পুরো আইনটিই বাতিল করা।




  এ বিভাগের অন্যান্য