আড়াই মাসে ধান সংগ্রহ হয়নি এক ছটাকও
চলতি আমন মৌসুম প্রায় শেষের পথে, তবে কুমিল্লার ১৭ উপজেলার ১৪টি খাদ্যগুদামে এখনো এক ছটাক ধানও সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি এবং বাজারে ধানের চড়া দামের কারণে কৃষকদের আগ্রহ কমে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি খাদ্য বিভাগ চলতি মৌসুমে ২,৮৩৪ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। তবে ১৭ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে এখন পর্যন্ত কোনো ধান মজুত করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১২,০৩৬ মেট্রিক টন, যার মধ্যে ৮,০৩৬ মেট্রিক টন চাল ইতোমধ্যেই সরকারি গুদামে জমা হয়েছে।
গত বছরের ভয়াবহ বন্যায় কুমিল্লার ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, যার ফলে ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম হয়েছে। জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর আমন ধানের জন্য নির্ধারিত জমির পরিমাণ ছিল ১,৩৫,২৩৮ হেক্টর, যার মধ্যে ৪৯,৬০৮ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩,৪১,৯৫৭ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন, কিন্তু বাস্তবে মাত্র ১,৮৮,৭৫০ মেট্রিক টন ধান পাওয়া গেছে।
বাজারে বর্তমানে ধানের দাম প্রতি কেজি ৩৫-৩৬ টাকা, যেখানে সরকার নির্ধারিত মূল্য মাত্র ৩৩ টাকা। ফলে কৃষকরা সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে আগ্রহী নন। স্থানীয় ব্যাপারীদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করাই তাদের কাছে লাভজনক বলে মনে হচ্ছে।
কুমিল্লার ৮৪টি রাইস মিলের মধ্যে ৬৫টি মিল সরকারি চাল সরবরাহের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। তবে মিলমালিকরা বলছেন, ধান সংকট এবং উচ্চ উৎপাদন খরচের কারণে তারা লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন। প্রতি কেজি চাল উৎপাদনে তাদের খরচ পড়ছে ৫২ টাকা, কিন্তু সরকার নির্ধারিত দাম মাত্র ৪৭ টাকা। এ পরিস্থিতিতে অনেক মিল বন্ধ হয়ে গেছে এবং মিলমালিকরা জামানত ফেরতের আশায় ক্ষতির মুখে চাল সরবরাহ করছেন।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে গেলে নানা জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। ধানের আর্দ্রতা ১৪ শতাংশের নিচে থাকতে হয়, যা হাটবাজারে মানা হয় না। এছাড়া, সরকারি গুদামে ধান বিক্রির টাকা পেতে দেরি হয়, যেখানে বাজারে তাৎক্ষণিক নগদ টাকা পাওয়া যায়। ফলে কৃষকরা সরকারি নীতির পরিবর্তন দাবি করছেন।
কুমিল্লার ভারপ্রাপ্ত খাদ্য নিয়ন্ত্রক নিত্যানন্দ কুন্ডু স্বীকার করেছেন যে, ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব হবে না। তার মতে, বাজারের তুলনায় সরকার নির্ধারিত দাম কম হওয়ায় কৃষকরা সরকারি গুদামে ধান দিতে চান না। এছাড়া, বন্যার কারণে উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
কৃষি ও খাদ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধান সংগ্রহে কৃষকদের উৎসাহিত করতে হলে বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারকে ধানের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি, গুদামে ধান জমার প্রক্রিয়া সহজ করে কৃষকদের আস্থা অর্জন করা জরুরি। অন্যথায়, কৃষক ও মিলমালিকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন এবং সামগ্রিকভাবে খাদ্যসংগ্রহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে।
এগ্রিবার্তা ডেস্ক
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।