হিমাগারের ভাড়া বেড়েছে, আলু রাখছেন না কৃষক
এ বছর দেশে আলুর আবাদ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি জমিতে হয়েছে, ফলে উৎপাদন ছাড়িয়ে যেতে পারে ১ কোটি ২০ লাখ টন। কিন্তু এত বেশি উৎপাদনের কারণে বাজারে আলুর দাম কমে গেছে, ফলে কৃষকরা উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না। এর মধ্যে হিমাগার মালিকরা সংরক্ষণ খরচ ৬০ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে প্রান্তিক কৃষকরা এই অতিরিক্ত খরচ বহন করতে না পেরে মাঠেই কম দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এতে বাজারের নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে পারে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে, যা ভবিষ্যতে ভোক্তা পর্যায়ে আলুর দাম অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএসএ) গত ৮ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে কেজিপ্রতি সংরক্ষণ ভাড়া ৮ টাকা নির্ধারণ করে। আগে যেখানে ৭০ কেজির এক বস্তা ৩৫০ টাকায় সংরক্ষণ করা যেত, নতুন নিয়মে ৫০ কেজির প্রতি বস্তার জন্য ৪০০ টাকা গুনতে হচ্ছে, ফলে খরচ বেড়ে গেছে ৬০ শতাংশ। অথচ কৃষি বিপণন আইন অনুযায়ী, ভাড়া নির্ধারণ করতে হলে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের অনুমোদন প্রয়োজন, যা নেওয়া হয়নি।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, কৃষকরা এমনিতেই কম দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন, তার ওপর হিমাগারে সংরক্ষণের খরচ বাড়ানোয় তাদের লোকসান আরও বেড়ে যাবে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের জন্য মজুদ গড়ে বাজারকে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মাসুদ করিম বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী আমাদের সঙ্গে আলোচনা করে ভাড়া নির্ধারণের কথা ছিল, কিন্তু তা করা হয়নি। আমরা ইতোমধ্যে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছি, যা দ্রুত আইন অনুযায়ী নতুন ভাড়া নির্ধারণ করবে।’
অন্যদিকে, হিমাগার মালিকরা বলছেন, ব্যাংকের সুদহারসহ ব্যবসার অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, ‘কৃষকরা পরিকল্পনা ছাড়া বেশি আলু উৎপাদন করেছেন, ফলে বাজারে দাম কমেছে। এটি আমাদের দায় নয়। বরং সরকার যদি কৃষকদের সুরক্ষা দিতে চায়, তাহলে আমাদের সুদহার কমানো উচিত।’
এ বছর ৪ লাখ ৬৭ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও চাষ হয়েছে ৫ লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে। আগের বছরের তুলনায় ফলনও ভালো হয়েছে, কিন্তু চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন বাজারে সংকট তৈরি করেছে।
এ বিষয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহমেদ বলেন, ‘যেহেতু বিদ্যুতের দাম বাড়েনি, তাই হিমাগারের ভাড়া দ্বিগুণ করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে আলুর দরপতন লক্ষ করা যাচ্ছে। গত বছর মৌসুমের শুরুতে মণপ্রতি আলুর দাম ছিল ১১০০-১৩০০ টাকা, যা এবার কমে ৪৫০-৬৫০ টাকায় নেমে এসেছে। এতে কৃষকরা লোকসানের মুখে পড়েছেন।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার কৃষক সামিউল ইসলাম জানান, তিনি দুই বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন, যার জন্য খরচ হয়েছে ৭৫ হাজার টাকা। কিন্তু বর্তমান বাজার দামে তিনি সেই খরচও তুলতে পারছেন না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার যদি প্রান্তিক কৃষকদের সুরক্ষা দিতে চায়, তাহলে হিমাগারে ৩০ শতাংশ জায়গা কৃষকদের জন্য সংরক্ষিত রাখার নির্দেশ দিতে পারে। পাশাপাশি কেজিপ্রতি ২ টাকা ভর্তুকি দেওয়া হলে সংরক্ষণ খরচ কিছুটা কমবে। এছাড়া সরকার নিজে ৫-৭ লাখ টন আলু সংরক্ষণ করতে পারে, যাতে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়।
সামগ্রিকভাবে, কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন, অন্যথায় মধ্যস্বত্বভোগীরা পুরো বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে, যার প্রভাব পড়বে ভোক্তা পর্যায়ে আলুর মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে।
এগ্রিবার্তা ডেস্ক
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।