১২ অক্টোবর ২০২৬ · ঢাকা, বাংলাদেশ
এগ্রি বার্তা মাটির খবর, মানুষের কথা
কৃষি

পার্বত্য কৃষিতে জীববৈচিত্র্য হুমকিতে

এগ্রিবার্তা ডেস্ক ২৪ মে ২০২৫ · ৫ মিনিট পড়ার সময় · ১ বার পঠিত
শেয়ার করুন:
পার্বত্য কৃষিতে জীববৈচিত্র্য হুমকিতে

বাংলাদেশ ছোট হলেও এর ভিতরে রয়েছে এক অপার বৈচিত্র্যের ভান্ডার। বিশেষত কৃষি ও জীববৈচিত্র্যে আমাদের দেশ পৃথিবীর অনেক দেশের চেয়েও সমৃদ্ধ। প্রায় ৪০০ প্রকারের ফসল চাষ হয় এখানে, আর প্রতিটি ফসলের রয়েছে অগণিত জাতবৈচিত্র্য। একসময় ধানেই ছিল ১২ হাজারেরও বেশি জাত। এ ছাড়া রয়েছে প্রায় ৬ হাজার উদ্ভিদ প্রজাতি, ১ হাজার ৬০০ প্রজাতির মেরুদণ্ডী ও ২ হাজার ৫০০ অমেরুদণ্ডী প্রাণী। প্রকৃতপক্ষে এখনো আমাদের জীববৈচিত্র্যের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি হয়নি।

দেশের ভূপ্রকৃতিতেও রয়েছে বিস্ময়কর বৈচিত্র্য। হিমালয় ধোয়া পলিমাটি দিয়ে গঠিত বদ্বীপভূমিতে আছে সাগর, নদী, হাওর-বাঁওড়, গড় ও পাহাড়। দক্ষিণে উপকূলীয় লোনামাটিতে রয়েছে লবণাক্ত গাছ, কুমির-কচ্ছপ; মিঠা পানির জলাশয়ে বাস প্রায় ৪০০ প্রজাতির মাছ ও গাঙ্গেয় শুশুকের। আর এই ভূখণ্ডের গর্ব—সুন্দরবন, যেখানে রয়েছে ৫২৮ প্রজাতির গাছ, ৩৩৯ প্রজাতির পাখি ও বহু প্রকার অণুজীবসহ ১,৬০০-এর বেশি প্রাণপ্রজাতি।

অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামের চিরসবুজ অরণ্যকে ধরা হয় পৃথিবীর ৩৪টি জীববৈচিত্র্য-সমৃদ্ধ এলাকার একটি। এখানে অর্কিড, সেগুন, গর্জন, বৈলামসহ আছে ১,৫৬০ প্রজাতির সপুষ্পক উদ্ভিদ। জীবনের ছায়াময় আবাস এই অরণ্য—হাতি, চিতাবাঘ, হরিণ, সাপ, গিরগিটি, প্রজাপতি, পাখির। একসময় পাহাড় ছিল শুধুই প্রকৃতির, এখন তা দ্রুত রূপান্তরিত হচ্ছে অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণের চাষের মাটিতে।

সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য অঞ্চলে সমতলের সবজি ও ফলের চাষ ক্রমেই বাড়ছে। আম, আনারস, মরিচ, ধনিয়া, তামাক, এমনকি কাজুবাদামও এখন পাহাড়ি ঢালে। কিন্তু এর ফলেই পাহাড়ের ঢালে মাটি আলগা হয়ে ভূমিধস ঘটাচ্ছে, ঝিরি ভরে যাচ্ছে, বিলুপ্ত হচ্ছে ছোট মাছ, হারিয়ে যাচ্ছে উৎসের জল, কমছে বনজ গাছ, এবং পাহাড়ি প্রজাতির অনেক জীব হুমকির মুখে পড়ছে।

পাহাড়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ঔষধি গাছ ছিল এক অমূল্য রত্নভাণ্ডার। বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়ামের গবেষণা বলছে, এখানকার মানুষ ৩০২টি রোগের চিকিৎসায় প্রায় ৭০০ প্রজাতির গাছ ব্যবহার করতেন। কিন্তু ফসলচাষ ও আগাছা পরিষ্কারের নামে আমরা সেই ঐশ্বর্যকেই হারিয়ে ফেলছি।

আরো উদ্বেগজনক হলো, যান্ত্রিক কৃষিকাজ, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার পাহাড়ি পরিবেশে সৃষ্টি করছে দূষণের নতুন মাত্রা। মৃত্তিকা, পানি ও বায়ু দুষিত হচ্ছে। ছোট ছোট পোকামাকড় ও পরাগায়নকারী প্রাণীরা হারিয়ে যাচ্ছে। জলজ জীবনের জন্য সংকট তৈরি করছে সেচ ও চাষের পদ্ধতি।

অন্যদিকে সেগুন, ইউক্যালিপটাস, রাবার, আকাশমণি প্রভৃতি আগ্রাসী প্রজাতির বৃক্ষপালা স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করছে। এসব গাছের নিচে অন্য কোনো গাছ জন্মাতে পারে না, ফলে হ্রাস পাচ্ছে দেশীয় উদ্ভিদ ও প্রাণীর সংখ্যা। এমনকি কাপ্তাই হ্রদ ও নদীতে কচুরিপানার আধিক্য জলজ পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

পরিবেশ রক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। যদিও বাংলাদেশে ১৩টি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা চিহ্নিত রয়েছে, তবুও পার্বত্য বনাঞ্চল এখনো সেই তালিকায় নেই। বাস্তবতা হলো, এই অরণ্যগুলোকেও সেই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে পরিবেশ সংরক্ষণের আইন ও নীতির মাধ্যমে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

ফসল চাই, খাদ্য চাই—তবে প্রকৃতি ধ্বংস করে নয়। সমতলের ফসল পাহাড়ে নয়, বরং পাহাড়কে পাহাড়ের মতো থাকতে দিন। এই জীববৈচিত্র্য রক্ষা করাটাই হবে আমাদের প্রকৃত উন্নয়ন।

এগ্রিবার্তা ডেস্ক

মন্তব্য (০)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।