বাগানবিলাস এখন ‘টাকার গাছ’
বরিশালের আগৈলঝাড়ার প্রত্যন্ত গ্রাম কালুপাড়ে বাগানবিলাসের রঙিন পাতা থেকে তৈরি হচ্ছে বিশেষ ধরনের কাগজ। যার নাম ‘টেক্সচার সিল্ক পেপার’। ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এই কাগজ রপ্তানি হচ্ছে, যা থেকে বছরে আয় হচ্ছে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা।
দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে বাগানবিলাস গাছের পাতা থেকে প্রায় আট কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা এসেছে দেশে।
পণ্য তৈরিতে নারীদের অংশগ্রহণে বাড়ছে কর্মসংস্থান, স্বাবলম্বী হচ্ছেন নারীরা। বাগানবিলাস দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশের উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাগানবিলাসের লাল-সবুজ সৌন্দর্য সবার মন কেড়ে নেয়। বারো মাস ফুল ধরে গাছে।
তাই উদ্যান, বাগান বা বাড়ির প্রবেশদ্বারের শোভা বাড়াতে বাগানবিলাসের এত কদর। এখন বৈদেশিক মুদ্রা আয়েও বাগানবিলাস বিশাল অবদান রাখছে। এলাকায় পরিচিতি পেয়েছে ‘টাকার গাছ’ নামে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মাসুদুর রহমান বলেন, বাগানবিলাস হচ্ছে এক ধরনের গুল্মজাতীয় বৃক্ষের গণবিশেষ।
বিভিন্ন রঙের অধিকারী এ ফুল গাছটির আদি নিবাস ব্রাজিল ও দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশে। উষ্ণমণ্ডলীয় দেশগুলোসহ যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে বাড়ির সজ্জা কিংবা বাড়ির চারপাশের সৌন্দর্য বাড়াতে লতাজাতীয় গুল্ম হিসেবে বাগানবিলাস জন্মানো হয়। শীতপ্রধান দেশে গ্রিনহাউস প্রক্রিয়ায় বাগানবিলাস জন্মানো হয়। শুধু শীত বা বসন্ত নয়, সারা বছর বাগানে শোভা পায় বাগানবিলাস।
কচুরিপানা থেকে কাগজ তৈরির পর বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে ১৯৮৪ সালে এমসিসির উদ্যোগে আগৈলঝাড়ায় গড়ে ওঠে জোবারপাড় এন্টারপ্রাইজ নামের একটি বেসরকারি প্রকল্প।
এরপর একে একে গড়ে ওঠে তরুলতা, বিবর্তন হ্যান্ডমেইড পেপার অ্যান্ড ক্রাফট, বাগধা এন্টারপ্রাইজ নামে আরো চারটি প্রতিষ্ঠান।
বিবর্তন নামের প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মীরা ফেলনা কচুরিপানার সঙ্গে পাট, পরিত্যক্ত কাগজ ও সিল্ক কাপড় দিয়ে তৈরি করেন মণ্ড। এরপর এতে রং দিয়ে রোদে শুকানোর পর বানানো হয় কাগজ। সে কাগজ দিয়ে বানানো হয় পুতলের বাক্স, খেলনাসহ প্রয়োজনীয় শৌখিন সামগ্রী। আর কলাগাছের পরিত্যক্ত খোল-বাকল দিয়ে কার্ড, তালপাতা দিয়ে ঝুড়ি, ব্যাগ এবং ফেলে দেওয়া শাড়ি দিয়েও উৎপাদিত হচ্ছে নজরকাড়া বিভিন্ন পণ্য। সেই পণ্য রপ্তানি করা হয় বিভিন্ন দেশে। কিন্তু হঠাৎ করেই বিদেশে কার্ডের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। একই সঙ্গে নোটবুকেও চাহিদা গিয়ে তলানিতে ঠেকে।
কার্ডের জনপ্রিয়তা কমতে থাকায় বিকল্প হিসেবে কাগজের নতুন একটা পণ্য তৈরির পরিকল্পনা করে সংস্থাটি। বিবর্তন অফিসের প্রবেশদ্বারের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ২৫ বছর আগে রোপণ করা বাগানবিলাস নিয়ে চিন্তা করেন। এর পাতা দিয়ে অন্য কিছু করা যায় কি না প্রকল্প কর্মকর্তারা তা নিয়ে চিন্তা করেন। তাঁরা হ্যান্ডমেইড পেপারের মধ্যে এই পাতা ব্যবহার করে র্যাপিং পেপার তৈরি করেন। শুরুতেই তা বেশ জনপ্রিয়তা পায়। সেখান থেকেই শুরু তাদের এই টেক্সচার সিল্ক পেপার উৎপাদন।
সম্প্রতি বিবর্তন গিয়ে দেখা গেছে, বর্জ্য পাট, বর্জ্য তুলা, কচুরিপানা, গাছের পাতা, ঘাস ইত্যাদি ভালোভাবে পরিষ্কার করছেন নারী শ্রমিকরা। তারপর ছোট ছোট আকারে কেটে ঝাড়াই যন্ত্র দিয়ে ধুলাবালু মুক্ত করে বয়লারে সিদ্ধ করছেন সেসব। বয়লারে মণ্ড তৈরি হলে সেসব ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে একটি কাপড়ের ওপর রাখছেন। এরপর হাইড্রোলিক প্রেশার যন্ত্র দিয়ে পানি অপসারণ করে রোদে শুকিয়ে তৈরি করছেন কাগজ।
বাগানবিলাসে স্বাবলম্বী অঞ্জনা রায়ের হাতে তৈরি কাগজ দিয়ে বিবর্তনে তৈরি হচ্ছে হস্তশিল্পের নানা ধরনের পণ্য। এগুলো তৈরি করছেন আগৈলঝাড়া উপজেলার নারীরাই। তাঁদেরই একজন অঞ্জনা রায়। কাগজে বাগানবিলাসের রঙিন পাতা সেটে দেন তিনি। রোদে রাখেন, আর এভাবেই পাতাটি কাগজে যুক্ত হয়ে অসাধারণ কারুকার্য খচিত র্যাপিং কাগজ তৈরি হয়। এই কাগজ রপ্তানি করা হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, যা থেকে আয় হচ্ছে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। আর এর মাধ্যমে অঞ্জনা রায়ের মতো নারীরা হচ্ছেন স্বাবলম্বী। পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি আরো চাঙ্গা হচ্ছে।
অঞ্জনা রায়ের সহকর্মীরা জানান, ছবি আঁকার কাগজ ছাড়াও এখানে পোশাক কারখানার ট্যাগ, বিয়ের চিঠি, খাম ও র্যাপিং পেপারে ব্যবহার উপযোগী কাগজ তৈরি হয়। বাগানবিলাসের টেক্সচার সিল্ক পেপার দিয়ে তৈরি করা হয় অ্যালবাম, নোটবুক, গিফটবক্স, শুভেচ্ছা কার্ড, ওয়ালমার্ট, সাইড ব্যাগসহ বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্পের উপহারসামগ্রী।
এ ছাড়া হাতে তৈরি কাগজ দিয়ে এই কারখানায় তৈরি হচ্ছে ল্যাম্পশেড, পেনসিল হোল্ডার, পেন হোল্ডার ও গ্রিটিং কার্ড। দিন দিন এসব হস্তশিল্পের কদর বাড়ছে ইতালিতে। প্রতিবছর প্রায় ৩৫ হাজার পিস কাগজ উৎপাদন করা হয়। এই গাছ থেকে যে কাগজ উৎপাদিত হয়, তার প্রতিটি প্রায় এক ডলার হিসেবে বছরে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা সমমানের বৈদেশিক মুদ্রা আসে। সেই হিসাবে এই ২৫ বছরে গাছ থেকে মোট অর্জিত টাকার পরিমাণ গিয়ে প্রায় আট কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বিবর্তন হ্যান্ড মেইড পেপার প্রকল্প সমন্বয়কারী অঞ্জন কুমার বলেন, বর্জ্য পাট, সুতা ও ধানের তুষ দিয়ে সরু ও মোটা দুই ধরনের কাগজ তৈরি হয়। সেই কাগজের সঙ্গে বাগানবিলাস গাছের পাতা দিয়ে বিশেষ ধরনের কাগজ তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া মার্বেল পেপার নামের বিশেষ কাগজও এখানে তৈরি হচ্ছে। এই কারখানায় প্রতি মাসে এক টনের বেশি কাগজ উৎপাদিত হয়। উৎপাদিত কাগজ রপ্তানি হয় ইতালি, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের মতো দেশ। তা থেকে বছরে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা দেশে আসে।
এগ্রিবার্তা ডেস্ক
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।