হরি ধান ও কৃষির রূপান্তর
গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে অগ্রগতি হয়েছে তা বহুল আলোচিত। সেই তুলনায় কৃষির পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হয়েছে কম। কৃষির পরিবর্তন মানে প্রযুক্তির পরিবর্তন। এখন থেকে পাঁচ দশক আগে এ দেশের কৃষি বলতে ধান ও পাট চাষকেই বোঝাত। তার মধ্যে আধিপত্যে ছিল ধান। পাঁচ দশক আগে এ দেশে যেসব স্থানীয় প্রজাতির ধান চাষ হতো, সেগুলোর নাম কিন্তু ধীরে ধীরে বিস্মৃতির অতলে চলে যাচ্ছে। তার পরিবর্তে নতুন উচ্চফলনশীল ধান এসেছে। তাতে ফলন বেড়েছে এত বেশি, যেটা এক সময় ছিল অকল্পনীয়। ফলে এ দেশের জনসংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে, তবুও খাদ্যশস্যের অভাব নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হয়নি। ঝিনাইদহের কৃষক শ্রী হরিপদ কাপালীর হাতে হরি ধানের আবিষ্কার দুই দশক আগে যার কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ হয়নি কেবল দরিদ্রতার কারণে। এখানে উল্লেখ্য, হরিপদ কাপালী ১৯২২ সালে ঝিনাইদহ জেলার সদর উপজেলার এনায়েতপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ২০১৮ সালের ৬ জুলাই নিজ শ্বশুরালয় আহসান নগর গ্রামে মৃত্যু বরণ করেন। শ্রী হরিপদ কাপালীর গবেষণাধর্মী কাজ শুরু হয় মূলত ২০০২ সালে। ইরি ধানের খেতে কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখেন তিন-চারটি ধানের গাছ, যা অন্যগুলোর থেকে মোটা ও আকারে বড়। এই চিন্তা থেকে ভালো ফলন হতে পারে এমন আশায় সেগুলো রেখে দেন এই কৃষক গবেষক। পরবর্তী সময়ে এর বীজ থেকে চারা তৈরি করে ছোট্ট এক জায়গায় পরীক্ষামূলক চাষ করেন। সেখানেও ফলন ভালো হয়। এরপর থেকে এ ধানের চাষ বাড়াতে থাকেন হরিপদ কাপালীর এবং পরে স্থানীয়ভাবে ও আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে বিস্তর লাভ করে এ ধান। এটি ধীরে ধীরে পরিচিতি লাভ করে হরি ধান হিসেবে। বর্ষা মৌসুমে চাষকৃত মোটা জাতের এ ধানের বিঘাপ্রতি ফলন হয় গড়ে ১৫-১৬ মণ হারে। কিন্তু উৎপাদন খরচ তুলনামূলক অনেক কম এবং ভাত খেতে অনেক সুস্বাদু হওয়ায় একসময় ধানটি স্থানীয় কৃষকের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এরপর থেকে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ধানটি নিয়ে গবেষণা শুরু করে। গবেষকরা বলছেন, হরি ধান মূলত ধানের জিনগত মিউটেশন সৃষ্ট জাত। ইনব্রিড জাত, হাইব্রিড নয়।
হাইব্রিডের ক্ষেত্রে বীজ বারবার কিনতে হয়। পরের বছরের জন্য বীজ করে চারা করলে উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশ কমে যায়। কিন্তু ইনব্রিড ধানে প্রায় শতভাগ উৎপাদন ধরে রাখা সম্ভব। এই সফল আবিষ্কারটি নিয়ে প্রথমে বেসরকারি টিভি চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব সাইখ সিরাজ প্রচারে নিয়ে আসে, যা সব কৃষি গবেষক মহলে ব্যাপক উৎসাহের বিষয়ে পরিণত হয়। বিষয়টি যখন ধীরে ধীরে এগোতে থাকে তখন প্রতিযোগিতার প্রশ্নটি সামনে চলে আসে এবং কৃষি বিভাগ ব্রি-১১, ব্রি-৫৬ জাতের চেয়ে হরি ধানের ফলন কম বলে যুক্তি দিচ্ছে। তথ্য-উপাত্ত বলছে উচ্চফলনশীল জাতটির উদ্ভাবক হরিপদ কাপালী সরকারি জেলা পর্যায়ের কিছু পুরস্কার পেয়েছেন যেমন জেলা প্রশাসক পুরস্কার, কৃষি সম্প্রসারণ পুরস্কার, গণস্বাস্থ্য পুরস্কার, রোটারি ক্লাব পুরস্কার, চ্যানেল আই পুরস্কার ইত্যাদি। কিন্তু ২০১৮ সালে হরিপদ কাপালীর মৃত্যুর পর হরি ধানটি এখন পর্যন্ত স্বীকৃতি পায়নি।
নিয়ম অনুযায়ী স্বীকৃতির জন্য বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের কিছু নিয়ম ও নানা শর্ত পূরণের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। স্বাভাবিকভাবে হরি ধানের বাজারও সম্প্রসারণ ঘটেনি। এর পেছনে যথাযথ সংরক্ষণের ঘাটতি, প্রাতিষ্ঠানিক শৈথিল্য, অনীহা, মাঠ সম্প্রসারণে তদারকির অভাবসহ আরও ফ্যাক্টরের কথা উঠে এসেছে। একটা সময় ধান বীজের পুরো উৎস ছিল গ্রামের কৃষক। কৃষক নিজে বীজ সংরক্ষণ করতেন, সে বীজ বিক্রি করতেন অন্য কৃষকের কাছে। সময়ের ব্যবধানে বীজ নিয়ে গবেষণা, উন্নয়ন ও উৎপাদনে যুক্ত হয় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান আমদানি শুরু করে। নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে তারা বরাবরই স্থানীয় জাতগুলোকে বাজার ব্যবস্থাপনায় আসতে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করে। হরি ধানের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। এমনকি এখন পর্যন্ত বীজের জাত হিসেবে এর সরকারি স্বীকৃতিও মেলেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় এ জাতটির বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ ছিল।
জনকণ্ঠ থেকে
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।