ঢাকা, ১৭ জুন ২০২৪, সোমবার

বোরোর হিট স্ট্রোক মোকাবেলায় করণীয়



সম্পাদকীয়

মো. জিয়াউল হক

(১ মাস আগে) ৩০ এপ্রিল ২০২৪, মঙ্গলবার, ৯:৪৭ পূর্বাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ১১:২৩ অপরাহ্ন

agribarta

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ এবং জনগোষ্ঠীর প্রধানতম খাদ্য ফসল ধান। কৃষিতে মৌসুম তিনটি—খরিফ-১, খরিফ-২ ও রবি। প্রতিটি মৌসুমে কমবেশি ধান উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে মোট উৎপাদনের ৫৫-৬০ শতাংশ রবি মৌসুমের বোরোতে হয়। ফসল উৎপাদনের মৌলিক উপকরণ তিনটি। উন্নত জাতের বীজ, সার ও সেচ। রবি মৌসুমে উফশী ও হাইব্রিড জাতের ধান চাষ সম্পূর্ণ সেচনির্ভর। কৃষক সাধারণত নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বোরো ধান রোপণ এবং মে মাসের প্রথম দিকে জমিতে সেচ প্রদান করে থাকে। রবি মৌসুমে খুবই সামান্য পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়।

বোরো ধান চাষের জীবৎকালে মোট ৪৮ একর-ইঞ্চি পানির প্রয়োজন হয়। যাতে মোট উৎপাদন খরচের ৩০-৩৫ শতাংশ সেচ ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয়। কিন্তু কৃষক পর্যায়ে সেচের পানি ব্যবহারে কৃষি প্রকৌশলগত জ্ঞানের অভাবে দু-তিন গুণ পানি বেশি ব্যবহার হয়। তবে অন্যান্য ফসলের জীবৎকালে পানির চাহিদা বোরো ধানের চেয়ে অনেক কম। বর্তমানে বাংলাদেশে বোরো ধানে সেচ দক্ষতা মাত্র ৩৮ শতাংশ।

অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় বোরো ধানে সেচ দক্ষতা যথাক্রমে ফিলিপাইনে ৫০ শতাংশ, পাকিস্তানে ৪৯, চীনে ৪৫, থাইল্যান্ডে ৪৩, ভিয়েতনামে ৪২, ভারতে ৪০, মিয়ানমারে ৩৯ ও শ্রীলংকায় ৩৬ শতাংশ। সেচ দক্ষতা ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচ কমানোর মুখ্য ভূমিকা পালন করে। তাই সেচের আধুনিক কলাকৌশল মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৩-২৪ রবি মৌসুমে সারা দেশে প্রায় ৫৭ লাখ ৮৯ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ও অন্যান্য ফসলের সেচ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বোরো ধান প্রায় ৫০ লাখ ৫৮ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে (সূত্র: বিএডিসি ও ডিএই)। দেশের সিলেট বিভাগের চারটি জেলা, ময়মনসিংহ বিভাগের দুটি জেলা (নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ) ও চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার হাওর-বাঁওড়বেষ্টিত নিচু এলাকাগুলোয় বন্যা-পরবর্তী সময়ে কৃষকরা বোরো রোপণ করে থাকে।

ফলে ওই এলাকাগুলোয় বোরো ধান কর্তন আগে শুরু হয়। অন্যদিকে বর্তমানে দেশের অধিকাংশ এলাকায় বোরো ধানে ফুল ফোটা বা দানা বাঁধা অবস্থায় রয়েছে। কৃষিকাজ আবহাওয়া ও জলবায়ুর ওপর নির্ভরশীল। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, খরা, মৌসুম পরিবর্তন, জলাধার ভরাট, জলাবদ্ধতা, ভূগর্ভস্থ পানি স্তরের নিম্নগামিতা, বন্যাপ্রবণ এলাকা বৃদ্ধি, মাটি ক্ষয় বৃদ্ধি, ট্রপিক্যাল সাইক্লোন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, সমুদ্র উপকূলে লবণাক্ততায় লাখ লাখ মানুষের জীবনযাপনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

চৈত্রের শেষ ভাগ হতে দেশের কিছু কিছু এলাকায় প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ দেখা দিয়েছে। ফলে অতিরিক্ত তাপপ্রবাহে বোরো ধানে হিট স্ট্রোক বা সান স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। বোরো ধানের ফুল ফোটা পর্যায়ে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রা হলে চিটা দেখা দেয় (সূত্র: ব্রি)। এ বছর কিছু কিছু এলাকায় চৈত্রের শেষ সপ্তাহ থেকে দিনের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অধিক ছিল। বর্তমানে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যশোর ও চুয়াডাঙ্গা জেলায় দিনের তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস চলমান রয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে জানা যায়, দেশের তাপমাত্রা আগামী কয়েক দিন আরো বাড়তে পারে। তাই বোরো ধানের হিট স্ট্রোক হতে পরিত্রাণের জন্য সব সেচপাম্প অপারেটর/ম্যানেজারদের নিম্নবর্ণিত করণীয় প্রতিপালনের জন্য অনুরোধ করা যেতে পারে:

  • যেসব বোরো ধান ফুল ফোটা পর্যায় বা ফুল ফুটছে কিংবা ফুল ফুটবে, সেসব জমিতে দু-তিন ইঞ্চি পানি ধানের দানা শক্ত না হওয়া পর্যন্ত ধরে রাখতে হবে;
  • চৈত্র ও বৈশাখের তাপপ্রবাহে দিনের বেলায় কোনো অবস্থায় শুকনো বা স্যাঁতসেঁতে জমিতে সেচ দেয়া যাবে না। এতে বোরো ধানে হিট স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে;
  • বোরো ধানের শুকনো জমিতে সেচ দিলে মাটিতে সংগৃহীত তাপ ও সূর্যের তাপে সেচের পানি দ্রুত বাষ্পীভূত হবে, যা বায়ুমণ্ডলে চলে যাওয়ার সময় ফুটন্ত ফুলকে শুকিয়ে দেবে। ফলে ধানে চিটা হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে;
  • দিনের বেলায় ধানখেতে সেচ বন্ধ রাখতে হবে। কারণ বোরোর জমিতে প্রয়োগকৃত বিভিন্ন সার সূর্যের তাপে সেচের পানির সঙ্গে বাষ্প হয়ে বায়ুমণ্ডলে চলে যায়। অন্যদিকে রাতে সেচ প্রদান করা হলে পানি বাষ্পীয়ভবন হয় না;
  • সেচের পানি পরিবহনে ভূগর্ভস্থ সেচনালা (বারিড পাইপ পদ্ধতি) বা স্বল্প দূরত্বে সেচ প্রদানে ফিতা পাইপ ও হোজ পাইপ ব্যবহার করতে হবে। এতে সেচনালায় পানির অপচয় ও তাপমাত্রায় পানি বাষ্পীয়ভবন হবে না;
  • ধারাবাহিকভাবে দেশে কিছু কিছু এলাকায় বন্যার পরিমাণ কম এবং বরেন্দ্র এলাকায় সাকশন মোডে ভূগর্ভস্থ পানির প্রাপ্যতা কমে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে নিম্নবর্ণিত বিকল্প উপায়ে সেচ কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে;
  • চলমান সেচমৌসুমে যেসব এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি নলকূপের সাকশন সীমার নিচে চলে যাবে, সেসব এলাকার অগভীর নলকূপগুলো ডিপসেট/ভেরি ডিপসেটে রূপান্তর করতে হবে;
  • গভীর নলকূপের ক্ষেত্রে হাউজিং পাইপ এবং পাম্প হেডের ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে পাম্প নিচে নামাতে হবে;
  • আবাদকৃত ফসল রক্ষার্থে আন্তঃসেচযন্ত্র (ইন্টার কানেক্টেট) বারিড পাইপ সংযোগের মাধ্যমে সেচ ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে;
  • নদী, নালা, খাল, বিলে স্থাপিত শক্তিচালিত পাম্পে (এলএলপি) পানির প্রাপ্যতা কমে গেলে নিকটবর্তী পানির উৎস হতে নালা খনন বা অতিরিক্ত সাকশন পাইপ দিয়ে সেচের পানির সরবরাহ ব্যবস্থা করতে হবে;
  • এলাকাভিত্তিক নলকূপগুলো পরিচালনায় সেচ শিডিউলিংয়ের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলন করতে হবে। অন্যথায় একসঙ্গে সব নলকূপ চালু করা হলে ড্র-ডাউন বাড়বে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানি সাকশন সীমার নিচে চলে যাবে;
  • বিদ্যুচ্চালিত সেচযন্ত্র চালু রাখার নিমিত্ত বিদ্যুৎ সমস্যা দেখা দিলে স্থানীয় পিবিএস/বাবিউবো অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রাপ্তি এবং লো-ভোল্টেজের ক্ষতি হতে রক্ষার নিমিত্ত রাত ১১টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত সেচযন্ত্র চালু রাখতে হবে;
  • এ সময় সেচযন্ত্রগুলো প্রতিদিন বেশি সময় চালু রাখার কারণে যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ যান্ত্রিক সমস্যা সমাধানের নিমিত্ত গ্রামীণ মেকানিকের সঙ্গে যোগাযোগপূর্বক মেরামতের ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে স্থানীয় সেচসংক্রান্ত অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে কারিগরি সহায়তা নেয়া যেতে পারে।

সর্বোপরি ওপরে বর্ণিত প্রযুক্তিগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত রোধ করা যেতে পারে। তা না হলে চলতি রবি মৌসুমে সব মাঠ ফসলের উৎপাদনশীলতা অনেক কমে যাবে। অন্যদিকে আনুষঙ্গিক সব খরচ অনেক বেড়ে যাবে। ফলে একদিকে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।

মো. জিয়াউল হক: প্রকৌশলী ও অবসরপ্রাপ্ত সদস্য পরিচালক (ক্ষুদ্র সেচ), বিএডিসি