ঢাকা, ৩ এপ্রিল ২০২৬, শুক্রবার

বিলুপ্তপ্রায় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা



জাতীয়

এগ্রিবার্তা ডেস্ক

(১০ মাস আগে) ২৮ মে ২০২৫, বুধবার, ৯:১৬ পূর্বাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ৮:০৮ অপরাহ্ন

agribarta

কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামীণ বাংলার এক অনন্যসাধারণ হস্তশিল্প—নকশিকাঁথা। কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার কিছু মানুষ এখনও আবহমান বাংলার এই ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন সযত্নে, মনের টানে। আধুনিকতা আর বাজারের রঙিন রেডিমেড পণ্যের ভিড়ে যখন হারিয়ে যাচ্ছে সুঁই-সুতোয় বোনা জীবনের গল্প, তখনও খোকসার নারায়ণপুর, চরবিহারীয়া বা পৌর এলাকার কিছু ঘরবধূ নিঃশব্দে চালিয়ে যাচ্ছেন একটি শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

নকশিকাঁথা কেবল একটি কাপড় নয়—এটি গ্রামীণ নারীদের অনুভব, স্মৃতি, আবেগ আর কল্পনার গাঁথা। পুরোনো কাপড় আর রঙিন সুতার সংমিশ্রণে তৈরি এই কাঁথায় উঠে আসে নারীদের জীবন, প্রকৃতির ছবি, সংসারের গল্প। একসময় বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামের গৃহবধূরাই পরিবারের পুরোনো কাপড় জড়ো করে নিজ হাতে নকশি আঁকতেন, সুঁইয়ের ফোঁড়ে ফোঁড়ে গাঁথতেন শিল্প ও স্বপ্ন।

আজ যদিও সেই চিত্রটা অনেকটাই বদলে গেছে, তবুও এখনও খোকসার লাভলী বিশ্বাস, সাথী পারভীন কিংবা মিতা মণ্ডলের মতো নারীরা এই শিল্পটিকে ধরে রেখেছেন। লাভলী বিশ্বাস ছোটবেলায় এক প্রতিবেশী নারীর কাছ থেকে কাঁথা সেলাই শেখেন। সেই শেখা আজও তার জীবনের অংশ। দিনের বড় একটা সময় তিনি কাটান সুঁই-সুতো হাতে। কেউ ব্যবসার উদ্দেশ্যে নয়, বরং নিজের ঘরের ব্যবহার কিংবা ভালোবাসা থেকে এই কাজটি করেন।

চরবিহারীয়ার মিতা মণ্ডল জানান, পুরোনো বা নতুন কাপড়েই তৈরি হয় নকশিকাঁথা। প্রথমে কাপড়ে নকশার ছক আঁকা হয়, তারপর সেই ছক অনুযায়ী বিভিন্ন রঙের সুতা দিয়ে করা হয় সূজনি ফোঁড়, কাঁথা ফোঁড় কিংবা বকুল ঝাড় ধরনের নকশা। প্রতিটি কাঁথা তৈরির পেছনে তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত সময় লাগে, আকার ও জটিলতার ওপর নির্ভর করে সেই সময় কমবেশিও হয়।

তবে এই কঠিন পরিশ্রমের বিনিময়ে খুব বেশি মজুরি মেলে না। ৪ বাই ৫ ফুট কাঁথায় মজুরি পাওয়া যায় মাত্র দেড় হাজার টাকা, আর সাড়ে তিন বাই ৫ ফুট কাঁথার জন্য ৮০০-৯০০ টাকা। এই সামান্য আয়ে পরিবার চালানো, সন্তানদের পড়াশোনা কিংবা সংসারের খরচ মেটানো দুঃসাধ্য হলেও, অনেকেই এই কাঁথা সেলাইয়ের কাজকে আঁকড়ে ধরে বাঁচিয়ে রেখেছেন নিজেদের অস্তিত্বের মতো করে।

উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা রুবি আক্তার জানিয়েছেন, গ্রামীণ নারীদের আত্মকর্মসংস্থানে উৎসাহিত করতে স্থানীয় সমিতির মাধ্যমে হস্তশিল্প, সেলাই, বুটিক-বাটিকসহ বিভিন্ন আয়বর্ধক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে নারীদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার কাজ চলছে। তবে প্রয়োজন আরও বিস্তৃত উদ্যোগ—বাজারজাতকরণ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পৌঁছানো এবং ন্যায্য মজুরির নিশ্চয়তা দেওয়া।

নকশিকাঁথা শুধু আমাদের একটি হস্তশিল্প নয়, এটি এক ঐতিহ্য, যা আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনের পরিচায়ক। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে দরকার সম্মিলিত প্রচেষ্টা—প্রশিক্ষণ, পৃষ্ঠপোষকতা, সঠিক মূল্যায়ন ও বাজার সম্প্রসারণের। তবেই গ্রামীণ বাংলার এই অনন্য গর্ব আবারও ফিরে পেতে পারে তার হারানো মর্যাদা। নিঃসন্দেহে, নকশিকাঁথার প্রতিটি সুতোয় গাঁথা আছে এক একটি জীবনের গল্প—যা সংরক্ষণ করা মানেই আমাদের শেকড়কে ধারণ করা।

জাতীয় থেকে আরও পড়ুন

agribarta
খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষি মন্ত্রী  
কৃষকদের ফসল সুরক্ষায় ইনসুরেন্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে

সর্বশেষ