নদীর নাব্য সংকটে হুমকিতে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য

কৃষি অর্থনীতি/
বণিক বার্তা

(১ সপ্তাহ আগে) ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, শনিবার, ১০:২৫ পূর্বাহ্ন

agribarta

ভোলা, খড়মা ও আড়ুয়ারবেড় নদীর নাব্য সংকটে হুমকির মুখে পড়েছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য। শুধু বনের জীববৈচিত্র্যই নয় বরং পলি পড়ে নদী ভরাটের বিরূপ প্রভাব পড়ছে কৃষিতেও। কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া, সেচের পানির অপর্যাপ্ততা, জেলেদের জীবিকা হারানোসহ নানা সংকট তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত নদী খনন করে নাব্য সংকট সমাধানের দাবি স্থানীয়দের।

বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার লোকালয় ও পূর্ব সুন্দরবনের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে একসময়ের খরস্রোতা ভোলা নদী। এই নদীতে জেলেরা ইলিশ আহরণ করতেন। বন বিভাগের লঞ্চ, স্টিমার ও নৌকা চলাচল করে মোংলা বন্দরে যেত, কিন্তু বছরের পর বছর পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় এই নদী যেন খালে পরিণত হয়েছে। ফলে এসব অঞ্চলের কৃষিজমিতে তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা, বাড়ছে লবণাক্ততা, ফসল চাষের জন্য কৃষক পাচ্ছেন না পর্যাপ্ত সেচের পানি, জেলেরা হয়ে পড়ছেন কর্মহীন। এতে করে নদীর ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকা নির্বাহ করা দিনের পর দিন আরো কঠিন হয়ে উঠছে।

উপজেলার রাজাপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. কবির তালুকদার বলেন, ’২৫-২৬ বছর আগে ভোলা নদীতে জেলেরা ইলিশ মাছ ধরতেন। স্টিমার ও জাহাজসহ বিভিন্ন জলযান চলাচল করত। কিন্তু আজ সেই ভোলা নদী পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। একসময়ের প্রকাণ্ড নদীটি যেন খালে পরিণত হয়েছে। ভরাট হয়ে যাওয়ায় সরকারের কাছ থেকে বন্দোবস্ত নিয়ে অনেকে সেখানে বসতি স্থাপন করেছে।’

শরণখোলা উপজেলার সাউথখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইমরান হোসেন রাজীব বলেন, ‘ভোলা নদীর তীরে নাব্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে। নদীর কোথাও কোথাও ৫০০-৬০০ ফুট পর্যন্ত ভরাট হয়ে গেছে, সেসব জায়গায় স্থানীয় লোকজন সরকারের কাছ থেকে বন্দোবস্ত নিয়ে বসতি স্থাপন করেছে। এমনকি অনেকে ইমারত নির্মাণ করেছে। ফলে নদী সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এতে করে সহজেই চোরা শিকারিরা সুন্দরবনে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে। অনেকে সময় গবাদি পশুও বনে ঢুকে পড়ে। তাই লোকালয় ও বন রক্ষায় দ্রুত ভোলা নদী খনন করা প্রয়োজন।’

ভরাট হয়ে যাওয়া জমিতে অবৈধ দখলদারত্বের মাধ্যমে নানা স্থাপনা নির্মাণ করছে একশ্রেণীর অসাধু চক্র। এগুলো উচ্ছেদে নেই তেমন কার্যকর উদ্যোগ। অন্যদিকে সুন্দরবনসংলগ্ন নদ-নদী সংকুচিত হয়ে পড়ায় মাঝেমধ্যে বনের বাঘ, হরিণ, শূকরসহ নানা প্রাণী লোকালয়ে প্রবেশ করে। লোকালয়ে এসে মারা পড়ছে অনেক প্রাণী। আবার স্থানীয় বাসিন্দার গরু, ছাগল অনেক সময় হেঁটে ও সাঁতরে বনে ঢুকে পড়ে। তারাও বাঘসহ অন্য বন্যপ্রাণীর আক্রমণের শিকার হন।

স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ী মিলন ফরাজী বলেন, ‘একসময় ভোলা নদী দিয়ে জেলেরা মাছ ধরতে সুন্দরবনে যেতেন। আবার বন থেকে নৌকা ও ট্রলারযোগে মাছ নিয়ে লোকালয় আসতেন। কিন্তু নদী ভরাট হয়ে যওয়ায় সময় ও অর্থ দুই-ই অপচয় হচ্ছে।’ কৃষক সোহাগ হাওলাদার বলেন, ‘পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় খরস্রোতা ভোলা নদী মরে গেছে। এই নাব্য সংকটের ফলে এসব অঞ্চলের কৃষিজমিতে বর্ষার মৌসুমে তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা, বাড়ছে লবণাক্ততা। ফসল চাষের জন্য পর্যাপ্ত সেচের পানির সংকট তৈরি হচ্ছে। নদী খনন করলে এক ফসলি জমিকে তিন ফসলি জমিতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।’

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ নুরুল করিম বলেন, ‘ভোলা, খড়মা ও আড়ুয়ারবেড় নদীর ২০ কিলোমিটারের অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নাব্য ফিরিয়ে আনতে একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। সেটি অনুমোদন পেলে পানি উন্নয়ন বোর্ড পুনরায় খননকাজ পরিচালনা করবে।’