ঢাকা, ১৭ জুন ২০২৪, সোমবার

পলিনেট হাউজে চাষ হচ্ছে অফসিজনের সবজি



কৃষি

(৩ সপ্তাহ আগে) ২৭ মে ২০২৪, সোমবার, ১০:৫০ পূর্বাহ্ন

agribarta

শীতকালীন সবজি মূলা। দেশের অন্যতম এই সবজি চাষে কৃষক কখনো লাভবান হন, আবার কখনো দাম না পেয়ে গরুকে খাওয়ান। লোকসানি কৃষককে দেখা যায় অনেক সময় অঝোরে কাঁদতে। কিন্তু সেই দিন আর নেই। পলিনেট হাউজে অফসিজনে চাষ হচ্ছে মূলা। 

প্রথমবারের মতো সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার ঘাটিনা গ্রামে পলিনেট হাউজে মূলা চাষ করেছেন কৃষক ফজলুল হক। তিনি বলেন, আর ১৫-২০ দিনের মধ্যেই মূলা বাজারে বিক্রি করতে পারব। শীতকালে দাম পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকে, কিন্তু এখন যেহেতু অফ সিজন, তাই দামটাও বেশি পাব বলেই আশা করছি। তার সুরেই কথা বলছিলেন উল্লাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবর্ণা ইয়াসমিন। 

তিনি বলেন, অসময়ে বাজারে যেকোনো জিনিসেরই দাম বেশি থাকে। কৃষক ফজলু অফসিজনের মূলা লাগিয়েছেন তার পলিনেট হাউজে। ভালো দাম পাবেন বলেই আশা করছি। আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি প্রকল্পের অধীন ফজলুল হককে ২৫ শতাংশ জমিতে পলিনেট হাউজ করে দেয়া হয়েছে।

ফজলুল হক জানান, ওই জমিতে তেমন ফসল হতো না। পলিনেট হাউজ করার পর বিভিন্ন সবজি চাষ করছেন। গত বছর খরচ বাদে প্রায় ২ লাখ টাকা লাভ হয়েছে। শুধু ফজলুল হক নন, রাজশাহী বিভাগের এ রকম অনেকেই পলিনেট হাউজে সবজি চাষ করে সফলতার পথ দেখাচ্ছেন।

জানা যায়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানুয়ারি-২০২০ হতে ডিসেম্বর-২০২৫ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬৮ কোটি ২০ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। রাজশাহী বিভাগের ০৮ জেলা রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, নওগাঁ ও জয়পুরহাট জেলার ৬৭টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পলিনেট হাউস হচ্ছে নেট, পলি এবং স্টিলের অবকাঠামো দিয়ে তৈরি চাষযোগ্য কৃষিঘর। চারপাশে নেট দিয়ে ঘেরা হয়। আর ওপরের অংশে থাকে পলিথিন। পলিনেট হাউস তৈরি করতে প্রয়োজন তাপমাত্রা সহনশীল বিশেষ পলিথিন ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী মেশিন। 

এর সাথে জৈব সার আর নারিকেলের ছোবড়া পেচিয়ে বিশেষ উপাদান তৈরি করতে হয়। ভেতরে যেসব সবজির আবাদ করা হবে, সেগুলোর প্রয়োজন অনুযায়ী তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আর এর ভেতরের অংশে চাষাবাদের জন্য পলিমাটি, ভরাট বালি, ছাই, গোবর সার, খৈলসহ নানা উপকরণ মিশ্রণে প্রস্তুত করা হয় চাষের জমি। সেখানে পলিথিনের আচ্ছাদন ব্যবহার করায় সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি ভেতরে প্রবেশে বাধা পায় এবং অতি বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগেও ফসল অক্ষত থাকে।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, প্রকল্পের আওতায় রাজশাহী বিভাগের ৮ জেলায় ২৫ শতাংশ আয়তনের মিস্ট ও ড্রিপ ইরিগেশন সুবিধা সম্বলিত ৮১টি পলিনেট হাউজ নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৫৩টি পলিনেট হাউজে ফসল চাষ করা হচ্ছে। ২৮টির নির্মাণ কাজ চলমান আছে। 

প্রকল্পভুক্ত এলাকা জলবায়ুর ঝুঁকিপূর্ণ (গ্রীষ্মকালে অধিক তাপ ও ভূগর্ভস্থ নিম্ন পানিস্তর) এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় এর ক্ষতির প্রভাবমুক্ত উৎপাদন পরিবেশ বজায় রাখতে এবং নিরাপদ শাকসবজি (চীনা শাক, লেটুস পাতা, কারি পাতা, ক্যাপসিকাম, টমেটো, ব্রোকলি, স্কোয়াস ইত্যাদি) ও ফল (স্ট্রবেরী, মেলন) এবং ফুল (জারবেরা, গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা ইত্যাদি) চাষ করার উদ্যোগ নেয়া হয় এই পলিনেট হাউজে।

কৃষি ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে প্রকৃতিতে এখন টালমাটাল অবস্থা। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গবেষকরা বলছেন, সময় যত গড়াচ্ছে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ততই বাড়ছে। 
এ অবস্থায় ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে কৃষি। তাই কৃষিকে বাঁচাতে নতুন নতুন গবেষণা ও উদ্ভাবনের চেষ্টা চলছে বিশ্বজুড়েই। পলিনেট হাউজ তেমনই এক গবেষণার ফসল। সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি নিয়ন্ত্রণ, অত্যাধুনিক সেচ ব্যবস্থাপনা, ক্ষতিকর পোকার প্রবেশ রুখে দিয়ে নিরাপদ ফসল উৎপাদনের এক আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি।

গ্রিনহাউসের আদলে দেশীয় কৃষি ব্যবস্থাপনায় নতুন সংযোজন পলিনেট হাউস। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করে নিরাপদ ফসল উৎপাদনের আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য কৃষি প্রযুক্তি হচ্ছে পলিনেট হাউজ। 

এর আধুনিক প্রযুক্তির সাফল্য রাজশাহী বিভাগের কৃষকের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। কারণ, এই পলিনেট হাউস প্রযুক্তির মাধ্যমে ভারী বৃষ্টি, তীব্র তাপদাহ, কীটপতঙ্গ, ভাইরাসজনিত রোগ ইত্যাদির মতো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নিরাপদ থাকবে শাকসবজি এবং ফলমূলসহ সব ধরনের কৃষি উৎপাদন। 

আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ, রোগবালাইয়ের আক্রমণ প্রতিরোধ, বীজতলার মান নিয়ন্ত্রণ এবং অসময়ের সবজি চাষসহ আধুনিক কৃষিকাজের জন্য পলিনেট হাউজের জুড়ি নেই। এর মাধ্যমে শীতকালীন সবজি যেমন গ্রীষ্মকালে উৎপাদন করা যাবে, তেমনি গ্রীষ্মকালের সবজিও শীতে উৎপাদন করা যায়। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে উচ্চমূল্যের ফসল চাষ এবং আগাম চারা উৎপাদনের কাজ নিশ্চিত হওয়ায় বাংলাদেশের কৃষি ক্রমে ক্রমে এগিয়ে যাচ্ছে আধুনিকতার প্রাণস্পর্শে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলেন, রাজশাহী বিভাগ দেশের সার্বিক খাদ্যচাহিদা পূরণে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। এখানে রয়েছে বিস্তীর্ণ সমভূমি, বৃহদাকার বরেন্দ্র অঞ্চল, সহস্রাধিক বিল, বালুকাময় পদ্মা ও যমুনাসহ ছোট-বড় অসংখ্য নদীর চরাঞ্চল। 

এই বিভাগটি সব ধরনের দানাশস্য, ডাল, তেল, সবজি, ফল ও মশলা চাষের জন্য উপযোগী। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ কম হওয়ায় এর বিস্তীর্ণ সমভূমির উঁচু ও মাঝারি উঁচু অঞ্চলে বিদ্যমান ফসলের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রয়োগ, নতুন ফসল অন্তর্ভুক্তকরণ, উচ্চমূল্যের ফসল চাষসহ জলবায়ুর ঝুঁকি এড়াতে সক্ষম লাগসই কৃষি প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে শস্যের নিবিড়তা বাড়ানোর পাশাপাশি ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। 

এ ছাড়াও এ অঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চল ও অজস্র নিচু বিল অঞ্চলে বিভিন্ন কৃষি প্রযুক্তি গ্রহণসহ এখানকার পদ্মা, যমুনাসহ অসংখ্য নদনদীর বিস্তীর্ণ উর্বর চরাঞ্চলে পরিকল্পিত উপায়ে বিভিন্ন প্রকার উচ্চমূল্য ফসলের আওতায় নিয়ে নিবিড়তা বাড়ানোর ব্যাপক সুযোগ আছে। এ ছাড়া এ অঞ্চলের বাণিজ্যিকভাবে আবাদকৃত ফলের বাগান বৈজ্ঞানিক উপায়ে পরিচর্যা ও আন্তঃফসলের আবাদের মাধ্যমে এসব ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি ও নিবিড়তা বাড়ানোর সুযোগ বিদ্যমান।

কৃষিবিদরা বলছেন, পলিনেট হাউজে যেকোনো সময় যেকোনো ফসলের চারা উৎপাদনের কাজটি সহজে করা যায়। কারণ এটিতে কৃষক তার ইচ্ছা অনুযায়ী অনুকূল আবহাওয়া বিরাজমান রাখতে পারেন। তাপ নিয়ন্ত্রণের কাজটি যেহেতু হাতের মুঠোয়, সেহেতু যেকোনো সময় অধিকসংখ্যক চারা উৎপাদন করে বিক্রি করতে পারেন। পলিনেট হাউজে পোকামাকড়ের আক্রমণ হওয়ার তেমন সুযোগ থাকে না। 

তাই বালাইনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না। এর ফলে বিষমুক্ত নিরাপদ ফসল উৎপাদন নিশ্চিত হয়। বিশেষ করে উচ্চমূল্যের বিষমুক্ত ও নিরাপদ সবজি উৎপাদনের নির্ভরযোগ্য কৌশল হলো পলিনেট হাউজ। উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ায় পলিনেট হাউজ প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য। 

পলিনেট হাউসে উচ্চমূল্যের ফসল যেমন ক্যাপসিকাম, রকমেলন, গ্রীষ্মকালীন টমেটো, রঙিন তরমুজ, রঙিন ফুলকপি, বাঁধাকপি, লেটুস ও অসময়ের সবজির পাশাপাশি চারা উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে গ্রীষ্মকালেও ফলবে শীতকালীন সবজি। ফলে সবজি চাষে যেমন বৈচিত্র্য আসবে, তেমনি অনেকেই আয়ের নতুন উৎসের সন্ধান পাবে বলে মনে করেন প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ ড. এস এম হাসানুজ্জামান।