শীত-কুয়াশায় নষ্ট হচ্ছে বোরো বীজতলা

সমকালীন কৃষি/
এগ্রিবার্তা ডেস্ক

(৫ দিন আগে) ২৪ জানুয়ারি ২০২৩, মঙ্গলবার, ৮:১০ পূর্বাহ্ন

agribarta

মেহেরপুরে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলছে শৈত্যপ্রবাহ। ঘন কুয়াশায় কোল্ড ইনজুরিতে পড়েছে বোরো ধানের বীজতলা। শীতের তীব্রতায় নষ্ট হচ্ছে বীজতলা। এতে হুমকির মুখে পড়েছে বোরো ধানের আবাদ।

কৃষি বিভাগের দাবি, দেরিতে যেসব বীজতলা করা হয়েছে কেবল সেগুলোয় সমস্যা হয়েছে। এক্ষেত্রে অন্য এলাকা থেকে ধানের চারা সংগ্রহ করে চাষীরা চাহিদা পূরণ করতে পারবেন।

জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ১ হাজার ৮০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের বীজতলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩৪ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড ও ৯৪৬ হেক্টরে উফসি জাতের ধানের বীজতলা রয়েছে। এ বছর জেলায় বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে।

মেহেরপুর জেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশার কারণে অনেক বীজতলায় চারা গজায়নি, অনেক বীজতলার চারা হলুদ রঙ ধারণ করেছে। অনেকের চারাগুলোর মাথা পুড়ে নুইয়ে পড়ছে। কোনো কোনো খেতের বেশির ভাগ চারাই মরতে শুরু করেছে। আবার কোথাও ধরেছে পচন।

চাষীর অভিযোগ, বীজতলায় পানি বা পলিথিন ব্যবহার করেও কোনো ফল মেলেনি। তীব্র শৈত্যপ্রবাহে আর ঘন কুয়াশায় বীজতলার অনেকাংশ নষ্টের পথে। দেখা দিয়েছে কোল্ড ইনজুরি। চারাগুলো হলুদ রঙের মতো হয়ে গেছে। ওষুধ ছিটিয়েও কোনো লাভ হচ্ছে না। পাওয়া যাচ্ছে না কৃষি কর্মকর্তাদের কোনো পরামর্শ।

চাষীদের আশঙ্কা, বীজতলা নষ্ট হলে বোরো ধানের চারা সংকট দেখা দেবে। চারা কিনে আবাদ করাও কঠিন হয়ে যাবে। কারণ অধিকাংশ কৃষকের একই অবস্থা। এতে ব্যাহত হবে বোরো লক্ষ্যমাত্রা অর্জন।

গাংনী উপজেলার চাষী রুহুল আমিন বলেন, ‘আমি ১০ বিঘা জমিতে ধান লাগানোর জন্য চার কাঠা জমিতে বীজতলা দিয়েছিলাম, কিন্তু তীব্র শীতে চারা হলুদ হয়ে মরে যাচ্ছে। শুধু আমার একার নয়, পাশের অনেক খেতের চারা মরে গেছে।’

মেহেরপুর সদর উপজেলার ঢুসারপাড়া গ্রামের চাষী আব্দুল হালিম বলেন, ‘আমার বীজতলা দিতে কয়েকদিন দেরি হয়। কিন্তু চারা আর হবে না। শীত আর ঘন কুয়াশায় বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। যে যা বলেছে আমি তা-ই করেছি, কেউ বলেছে একদিন পরপর পানি দিতে, দিয়েছি। সার, কীটনাশকসহ পলিথিন দিয়ে ঢেকেও দিয়েছি। তবু কোনো কাজ হয়নি।’

গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লাভলী খাতুন জানান, যে আবহওয়া বিরাজ করছে তাতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থাকছে। চাষীদের বীজতলা রক্ষায় প্রতি রাতে পানি জমিয়ে সকালে তা ছেড়ে দিতে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। ঘন কুয়াশা থেকে রক্ষায় প্রতি রাতে পলিথিন দিয়ে বেড ঢেকে রাখতে ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করারও পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শংকর কুমার বলেন, ‘যারা পরে বীজতলা দিয়েছেন, তাদের চারা ঠাণ্ডায় হলুদ হয়ে যাচ্ছে বা চারা গজানোয় সমস্যা হয়েছে। সেসব জায়গার চাষীরা অন্য এলাকা থেকে চারা সংগ্রহ করবেন।’

এদিকে দিনাজপুরের হিলিতেও তীব্র শীতে বোরো ধানের বীজতলা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেক বীজতলা হলুদ ও লাল বর্ণের হয়ে মরে যাচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণে কীটনাশক ব্যবহার করেও কোনো ফল পাচ্ছেন না কৃষক। এমন অবস্থা থাকলে চারা সংকটের সঙ্গে বোরো ধান রোপণের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষক। তবে এ সময়ে আবহাওয়া কিছুটা ভালো। পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে বলে দাবি কৃষি বিভাগের।

হাকিমপুর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে বোরো আবাদের জন্য এরই মধ্যে বীজতলা তৈরি হয়েছে। ৩৩৯ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরির ও ৭ হাজার ১২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

হিলির ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশায় আমরা বোরো ধান আবাদের জন্য ধানের যেসব বীজতলা করেছিলাম সেগুলোয় রোগ দেখা দিয়েছে। বেশির ভাগ ধানের বীজ হলুদ হয়ে মরে যাচ্ছে।’

অন্য কৃষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘কয়েকদিন ধরে ঘন কুয়াশার কারণে আমাদের ধানের বিছন মারা গেছে। এখন বীজতলায় পানি দিচ্ছি, সার দিচ্ছি কিন্তু কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েকদিনের আবহাওয়া বিশেষ করে বৃষ্টির মতো কুয়াশা ঝরার কারণে আমার জমির সব ধানের বিছন মরে শেষ হয়ে যাচ্ছে।’

হাকিমপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ড. মমতাজ সুলতানা বলেন, ‘তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার কারণে কিছু কিছু বীজতলায় লালচে ভাব চলে এসেছিল। সরেজমিন বীজতলা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে আমাদের পক্ষ থেকে যথাযথ পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। তারা সে মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়ায় এ থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছেন। বর্তমানে রোদ দেখা যাচ্ছে, যার কারণে ক্ষতির আশঙ্কা তেমন নেই। যেসব বীজতলায় লালচে ভাব এসেছিল সেগুলোয় সঠিকভাবে সার ও বালাইনাশক স্প্রে এবং জমে থাকা পানি বের করে দিতে হবে। তাহলে সেগুলো আবারো ঠিক হয়ে যাবে।’