ঢাকা, ১ এপ্রিল ২০২৬, বুধবার

কালের কন্ঠ'র প্রতিবেদন

নীরব কিন্তু দৃঢ় কৃষি বিপ্লব



কৃষি

শাইখ সিরাজ

(২ মাস আগে) ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, শুক্রবার, ৮:০৬ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ৮:১৫ অপরাহ্ন

agribarta

বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষের ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। আজ যেটিকে আমরা স্বাভাবিক কৃষিপণ্য হিসেবে দেখি, একসময় সেটিই ছিল প্রায় অকল্পনীয়। আশির দশকের গোড়ার দিকে যশোরের ঝিকরগাছার গদখালীতে যে ছোট্ট সূচনা হয়েছিল, সেটিই আজ ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে একটি নীরব, কিন্তু দৃঢ় কৃষি বিপ্লব হয়ে।

আজ থেকে প্রায় ৪০ বছর আগে দেশে ফুল চাষ বলতে বোঝাত শখের বাগান। অভিজাত কিছু পরিবার বাড়ির আঙিনা বা বাগানবাড়িতে ফুল আর পাতাবাহারের গাছ লাগাত। সেই সব বাগানের মালিরা মাঝেমধ্যে ফুল এনে বিক্রি করতেন হাইকোর্টের প্রধান ফটকের সামনে, কার্জন হলের পাশের বটতলায়। সেই অর্থে সেটিকেই বলা যায় বাংলাদেশের প্রথম ফুলের বাজার। তখন সাপ্তাহিক ‘রোববার’-এ নিয়মিত লিখতাম। হাইকোর্টের সেই ফুলের বাজার নিয়ে লিখেছিলাম ‘হাইকোর্টে মৌসুমি ফুলের বাহার’ শিরোনামের একটি ফিচার।

 

বন্ধু বিশিষ্ট বিনোদন সাংবাদিক আবদুর রহমান মতিঝিলে ‘পুষ্পক’ নামে দেশের প্রথম বাণিজ্যিক ফুলের দোকান চালু করেছিলেন। তাঁর বাবা প্রয়াত আলী আহমেদ আরো আগে, আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে, মতিঝিলের রাজউক এভিনিউয়ে ‘ঢাকা সীডস স্টোরস’ নামের যে বীজের দোকান দিয়েছিলেন, সেটিই ছিল ঢাকা শহরের প্রথম নার্সারি ও বীজের দোকান। পরে ধীরে ধীরে শাহবাগে গড়ে ওঠে ফুলের বাজার। সামাজিক আচারে ফুলের ব্যবহার বাড়তে থাকে।

 

বিশ্বায়নের হাত ধরে ফুল এখন আমাদের নিত্যদিনের জীবনের অংশ। শুভেচ্ছা বিনিময় থেকে শুরু করে উৎসব-অনুষ্ঠান ফুল ছাড়া যেন সম্পূর্ণ হয় না। ফলে ফুল আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য।

বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ফুল চাষের ইতিহাস বললেই যে নামটি প্রথম উচ্চারণ করতে হয়, তিনি শের আলী সরদার। ১৯৮৩ সালে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালীতে মাত্র ৩০ শতক জমিতে তিনি রজনীগন্ধা ফুলের চাষ শুরু করেছিলেন। সেই ছোট্ট উদ্যোগ থেকেই শুরু হয় দেশের ফুল চাষ ও বিপণনের পথচলা। আজ গদখালী পরিচিত ‘ফুলের রাজধানী’ নামে। মাঠের পর মাঠজুড়ে সেখানে এখন রঙিন ফুলের সমারোহ।

 

বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির হিসাব বলছে, বর্তমানে গদখালীর ৭৫টি গ্রামের প্রায় পাঁচ হাজার চাষিসহ প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ ফুল উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত। সারা দেশের ২৪টি জেলায় প্রায় ১২ হাজার একর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ করা হচ্ছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে এই খাতে। বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার বাজার গড়ে উঠেছে ফুলকে ঘিরে। ঘিরে। যশোর ছাড়াও এখন সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, সাতক্ষীরা, কুমিল্লাসহ নানা এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ করা হচ্ছে।

এই ফুল বিপ্লবকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। বিটিভির ‘মাটি ও মানুষ’ এবং পরে চ্যানেল আইয়ের ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বারবার ফিরে গেছি গদখালীতে। ইউরোপিয়ান কাট ফ্লাওয়ার ক্রিসেনথিমাম, জারবেরা, কার্নেশন, টিউলিপ ইত্যাদি ফুল বাংলাদেশে প্রথম চাষ ও সম্প্রসারণের পেছনে যাঁর বড় ভূমিকা, সেই বেলজিয়ান উন্নয়নকর্মী জন পল পেরিনের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। বিশ্বের ফুল বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র ফ্লোরা হল্যান্ড, রয়াল ভ্যানজানটিসহ নানা দেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছি দর্শকদের সামনে। ২০০৬ সালে চীনের কুনমিংয়ে জারবেরা ফুলের চাষ দেখেছি। দেখেছি উগান্ডার গ্রিনহাউস, কাতারের ফুলের রাজ্য।

তারই এক প্রতিচ্ছবি দেখেছিলাম বছর কয়েক আগে, ময়মনসিংহের ভালুকার নিশিন্দা গ্রামে। নিউ এশিয়া গ্রুপের পলিনেট হাউসে বিশাল পরিসরে জারবেরা ফুলের চাষ। গহিন গ্রামের মধ্যে এমন আধুনিক ফুল চাষ দেখে সত্যিই অভিভূত হয়েছিলাম। গদখালীর তুলনায় এটি একেবারেই ভিন্ন মডেল। বড় বিনিয়োগ, উন্নত বিশ্বের প্রযুক্তি, ভারতীয় কারিগরি সহায়তা।

এখন সারা দেশেই গ্রিনহাউসে ফুল চাষ বাড়ছে। তিন মাসের পরিকল্পিত চাষে ফুল তুলে বাজারে পাঠানোর সুযোগ কৃষকদের নতুন কৃষিবিন্যাসের পথ খুলে দিয়েছে। ফুল চাষ থেকে বিপণনের প্রতিটি ধাপে তৈরি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান। পুরুষদের পাশাপাশি স্থানীয় নারীরাও যুক্ত হচ্ছেন ফুল চাষ ও প্যাকেজিংয়ে। গ্রামীণ নারীদের জন্য এটি এক সম্ভাবনাময় জীবিকার পথ।

কৃষির সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থেকে আমি স্পষ্টভাবে দেখছি, বিশ্বব্যাপী কৃষিতে বড় পরিবর্তন আসছে। প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই। আমাদের দেশেও কৃষিপ্রেমী শিল্পোদ্যোক্তারা এগিয়ে আসছেন বাণিজ্যিক কৃষিতে। ফুলের ক্ষেত্রে আমরা এরই মধ্যে আমদানিনির্ভরতা অনেকটাই কমাতে পেরেছি। সামনে সুযোগ আছে রপ্তানিরও। তবে এই পরিবর্তনের দৌড়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কৃষক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অংশীদারি নিশ্চিত করা। কৃষকের স্বার্থ বিবেচনায় একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা এখন সময়ের দাবি। বিদেশি ফুল চাষের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারি-বেসরকারি বাস্তবমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি।

  • কালের কন্ঠ

কৃষি থেকে আরও পড়ুন

সর্বশেষ