www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

জলবায়ু বিপর্যয় ঠেকাতে পারে পুনরুজ্জীবনী কৃষি


 এগ্রিবার্তা ডেস্ক    ১৪ অক্টোবর ২০২১, বৃহস্পতিবার, ৭:২১   কৃষি গবেষণা বিভাগ


মানুষ যখন শস্যকে ‘পোষ মানিয়ে’ ঋতু ও সময়ের অনুগত করেছে, তখন থেকেই উৎপাদনশীল ও ক্ষতিকারক কৃষির সূচনা। আদিতে শস্য ছিল চিরজীবী। মানুষ শস্যকে ঋতুনির্ভর করেছে, যাতে তারা একটি নির্দিষ্ট সময়ে সেটা গোলায় ফসল তুলতে পারে। এভাবে মানুষ নিজের প্রয়োজনে শস্যকে ক্রমাগত করে তুলেছে পণ্য। এতে উৎপাদন বেড়ে গেছে সন্দেহ নেই, কিন্তু কমে গেছে টেকসই হওয়ার গুণ।

সভ্যতার প্রয়োজনে মানুষ যখন জমির ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করল, তখনই প্রাকৃতিক পুনরুজ্জীবনী কৃষির অপমৃত্যু ঘটল। ধানের শিষ একদিকে যেমন সম্পূর্ণতার প্রতিচ্ছবি, ঠিক তেমনি এই প্রাচুর্যের পেছনে যে ভূমি ও প্রকৃতির অবমূল্যায়ন হচ্ছে, তা এই প্রাচুর্যের নিশানাকে শেষ অবধি টেকসই করতে পারছে না। প্রতিটি ফসল গোলায় ভরার সঙ্গে সঙ্গে ভূমির জীববৈচিত্র্যের ক্রমাগত বিলুপ্তির খেসারত দিতে হচ্ছে। জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি আমাদের নজরে এসেছে ঠিকই কিন্তু গ্রিনহাউস গ্যাসের বিষবাষ্প পুরো প্রকৃতিকেই চোখ রাঙাচ্ছে।


এখন তাই বেঁচে থাকার ভিন্ন লক্ষ্য হওয়া উচিত। যেকোনো মূল্যে গোলার ধান বাড়ানো নয়, বরং কৃষির সেই প্রাকৃতিক পুনরুজ্জীবনী চরিত্রকে কীভাবে আধুনিক কৃষির সঙ্গে সম্পর্কিত করা যায়, তার সন্ধান করতে হবে। একদিকে ক্রমবর্ধমান মানবসভ্যতার দাবি অন্যদিকে জলবায়ুর স্থিতিশীলতার তাগিদ- এই টানাপোড়েনে আধুনিক কৃষি এখন বড়ই বিপাকে পড়েছে।

কোনো সন্দেহ নেই, যান্ত্রিক কৃষিব্যবস্থা কয়েক দশক ধরে ব্যাপক পরিমাণে খাদ্য উৎপাদন করেছে। প্রতিটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন মানুষের উৎপাদন পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। গরু ও ঘোড়া দিয়ে হালচাষের পরিবর্তে ট্রাক্টর দিয়ে চাষ হচ্ছে। আবার ট্রাক্টরের পরিবর্তে সম্মিলিত চাষ পদ্ধতি আসছে। আমরা নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম উদ্ভিদের বৃদ্ধির উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেছি, তারপর সেগুলো থেকে কৃত্রিম সার তৈরি করেছি। আমরা ভেষজনাশক ও কীটনাশকও আবিষ্কার করেছি। এর সাহায্যে আগাছা ও ধ্বংসাত্মক পোকামাকড় কেবল স্প্রে করে হত্যা করা যায়। কৃষিকাজের শিল্পায়ন মানুষের চেতনার উজ্জ্বল উদাহরণ। তবে এই কৃষিব্যবস্থা অস্থিতিশীল। এটি প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংস করে ফেলে এবং জীববৈচিত্র্য হ্রাস করে দেয়।

অতিরিক্ত জনসংখ্যার বাসস্থানের সংকুলান করতে গিয়ে আবাদি জমির পরিমাণ কমে এসেছে। বিশাল এই জনসংখ্যার খাদ্যের জোগান দিতে গিয়ে অল্প জমিতে বেশি ফসল ফলানোর চেষ্টা করতে হচ্ছে। এই চেষ্টার ফল হিসেবে আধুনিক যান্ত্রিক কৃষিকে বেছে নিতে হয়েছে। এর ফলে কৃষিজমিকে ধ্বংসাত্মক উপায়ে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা থেকে নির্গত হচ্ছে গ্রিনহাউস গ্যাস। এই সমস্যা থেকে বের হওয়ার জন্য জমিকে টেকসই পদ্ধতিতে চাষাবাদ করার গুরুত্ব অপরিসীম। আর এ জন্য প্রয়োজন পুনরুজ্জীবনী কৃষিব্যবস্থা।

পুনরুজ্জীবনী কৃষিব্যবস্থা হলো খাদ্য ও চাষ পদ্ধতির একটি সংরক্ষণশীল ও পুনরুদ্ধারমূলক কৃষি পদ্ধতি। এটি মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্যের সম্প্রসারণ, পানিচক্রের উন্নতি, ইকোসিস্টেমের মান বৃদ্ধি, বায়োসিকোয়েস্ট্রেশন, জলবায়ুর পরিবর্তন রোধ, টেকসই গবাদিপশু পালন ইত্যাদির সম্মিলিত ব্যবস্থা। পুনর্জন্মমূলক কৃষি আবাদযোগ্য মাটির পরিমাণ বৃদ্ধি করে, যার ফলে স্বাস্থ্যকর, উন্নত খাদ্য তৈরি হয়। জলবায়ু বিপর্যয় ঠেকাতে পুনরুজ্জীবনী কৃষিনীতি গ্রহণ করতে হবে।


পুনরুজ্জীবনী কৃষিনীতি
শূন্য আবাদ কৃষি (আচ্ছাদন কৃষি) ও চারণ শস্য: আবাদহীন চাষ মাটির ক্ষয়ক্ষতি কম করে। মাটির ক্ষয় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন কমায়। এই ক্ষেত্রে বিশেষ ড্রিলার বা ডিস্ক প্ল্যান্টার দিয়ে বীজ বপন করা হয়। চারণভূমি ফসল পুনর্জন্মমূলক কৃষিকৌশলের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যখন শস্য চারণের জন্য ঘাস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। উপরন্তু এটি কৃষিবিদদের খালি মাটি এড়াতে এবং ভূমির ক্ষয় মোকাবিলায় সহায়তা করে। একবার ফসল লাগিয়ে বহুবার ফসল ঘরে নেওয়া বাস্তবিক অর্থে আবাদকে অনেক কমিয়ে দেয়।

বার্ষিক জৈব ফসল: জৈব বার্ষিক ফসল প্রকৃতি ও মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব হ্রাস করার জন্য রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার কমানোর পরামর্শ দেয়। যদিও পুনর্জন্মমূলক কৃষি পদ্ধতি শক্তিশালী শিল্প পদ্ধতির তুলনায় অধিক ব্যয়বহুল, কম লাভজনক এবং অধিক শ্রমসাশ্রয়ী। তবু জৈব ফসল দীর্ঘ সময় ধরে মাটির প্রাকৃতিক গুণাগুণ ধরে রেখে মাটিকে পুনঃপুন চাষের উপযোগী করে তোলে।

কম্পোস্ট ও কম্পোস্ট চা: কম্পোস্টের ব্যবহার মাটিতে জৈব পদার্থ সরবরাহ করে মাটির উর্বরতা শক্তি পুনরুদ্ধার করে। কম্পোস্ট চা হলো জৈবিক বস্তুর পচনক্রিয়া থেকে তৈরি পানি, যা উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্য অণুজীব ও পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে।

টেকসই পশুপালন: গবাদিপশু পালনের জন্য যে চারণভূমি তৈরি করা হয়, তা টেকসইভাবে ব্যবহার করতে হবে। এ জন্য দরকার চারণভূমির আবর্তনমূলক ব্যবহার। অর্থাৎ চারণভূমিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে দিয়ে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট ভাগে পশুকে বিচরণ করতে দিতে হবে। ঠিক তার পরের দিন অন্য একটি নির্দিষ্ট অংশে বিচরণের জন্য ছেড়ে দিয়ে আগের বিচরণ করা জমিকে পুনরায় ঘাস জন্মানোর জন্য প্রয়োজনীয় সময় দিতে হবে। এতে একদিকে যেমন পশুর দৈনিক খাদ্যের জোগান নিশ্চিত হবে, তেমনি সংরক্ষণও নিশ্চিত হবে।

বায়োচার: বায়োচার হলো একধরনের চারকোল বা কাঠকয়লা। ফসলের অবশিষ্টাংশ, ঘাস, গাছ বা অন্যান্য উদ্ভিদ থেকে জৈব বস্তু ৩০০-৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে পুড়িয়ে বায়োচার তৈরি করা হয়। এ পদ্ধতি পাইরোলাইসিস নামে পরিচিত, যা জৈব বস্তুর কার্বন ক্ষয় প্রতিরোধ করতে সক্ষম। বায়োচার একটি স্থিতিশীল কঠিন কার্বনসমৃদ্ধ উপাদান, যা হাজার বছর ধরে মাটিতে অপরিবর্তিত অবস্থায় থাকতে পারে। বায়োচার কার্বন সিকোয়েস্ট্রেশন করার মাধ্যমে কার্বন উপাদানকে অনির্দিষ্টকালের জন্য মাটিতে স্থিতিশীল করে রাখে। মাটিতে বায়োচারের উপস্থিতি মাটির গুণমান উন্নত করে, মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি করে, কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে, মাটির পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

বহুবর্ষজীবী ফসলের জীবন্ত শিকড় সংরক্ষণ: পুনর্জন্মমূলক চাষাবাদে বহুবর্ষজীবী ফসল মাটিকে বায়ু ও জলের ক্ষয় থেকে রক্ষা করে এবং তাদের শক্ত শিকড় দিয়ে মাটিকে ধরে রাখে, আর্দ্রতা সঞ্চয় করে, মাটির চাষ হ্রাস এবং আগাছা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চাষের খরচ বাঁচায়।

শস্যের ‘পোষ মানানো’ থেকে শুরু করে কৃষির আধুনিক হয়ে ওঠা মানুষকে শস্যে সমৃদ্ধ করেছে কিন্তু এই উন্নয়ন টেকসই হতে পারেনি। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এখন টেকসই জলবায়ুর বিপরীতে দাঁড়িয়েছে। গ্রিনহাউজ গ্যাসগুলো কমিয়ে আনা এখন পরিবেশবিদের জোরালো দাবি। এই ক্রান্তিলগ্নে জলবায়ুবিজ্ঞান ও জিনবিজ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই। আগামী নভেম্বর মাসে কপ-২৬- সম্মেলনে সারা পৃথিবীর নেতারা জমা হবেন। জলবায়ুবিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠতম চিন্তাবিদেরা জমা হবেন। তাঁদের সিদ্ধান্ত ও পথচলার নির্দেশনা ঠিক করবে আমাদের এই চিরচেনা পৃথিবী কি তার পূর্বতন স্বাস্থ্য নিয়ে টিকে থাকবে, নাকি এক অস্থিতিশীল সময়ের গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হবে। সঠিক বিজ্ঞানসম্মত জলবায়ুনীতি তাই এখন আমাদের অস্তিত্বের দাবি।

ড. আবেদ চৌধুরী জলবায়ুবিজ্ঞানী
জাকিয়া বেগম মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী




  এ বিভাগের অন্যান্য