www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

কোরিয়ান তেলবীজ চাষ হচ্ছে পাবনায়


 এগ্রিবার্তা ডেস্ক    ২২ নভেম্বর ২০২১, সোমবার, ৫:০৫   উদ্যোক্তা বিভাগ


পাবনার সাঁথিয়ায় কোরিয়ান তেলবীজ ‘পেরিলা’ চাষ শুরু হয়েছে। সাঁথিয়া উপজেলার ঢাকা-পাবনা মহাসড়কের পাশে মাধপুরে শহীদুল ইসলাম এই প্রথম নতুন জাতের পেরিলা চাষ শুরু করেছেন। ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ বলে তেলের বাজারে পেরিলার ব্যাপক চাহিদা। তাই এ ফসল চাষে চাষিরা ব্যাপকভাবে লাভবান হবেন বলে জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা।

জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এই ফসল চাষের জন্য উপযোগী সময়। প্রথমে চারা তৈরিতে চার সপ্তাহ সময় লাগে। চারা লাগানোর ৭০ থেকে ৭৫ দিনের মধ্যে ফসল সংগ্রহ করা যায়। নতুন জাতের এ ফসল দেখতে চাষি শহীদুল ইসলামের প্রদর্শনী প্লট দেখতে আশেপাশের লোকজন প্রতিদিনই ভিড় করছেন। স্থানীয়রা চাষিরা বলছেন তারা আগামীতে পেরিলার বীজ পেলে তারা এর চাষাবাদ শুরু করতে আগ্রহী।

কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এইচ এম এম তারিক হোসেন ২০০৭ সালে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সংগ্রহ করেন এই জাত। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় বীজ বোর্ড সাউথ কোরিয়ান ভ্যারাইটির সাউ পেরিলা-১ নামে জাতটির নিবন্ধন দেয়।

জাতটি দেশের আবহাওয়ার উপযোগী। সূর্যমুখী ও সরিষার মতো পেরিলার বীজ থেকেও ভোজ্যতেল উৎপন্ন হয়। পেরিলার আদি নিবাস চীন হলেও দক্ষিণ কোরিয়ায় এর ব্যাপক বিস্তৃতির কারণে বিশ্বে এটি কোরিয়ান পেরিলা নামে পরিচিত। বাংলাদেশের কৃষকরা এখনো এই পেরিলার ফসলের সাথে খুব বেশি একটা পরিচিত নন।

উৎপাদন নিয়ে চলছে নানা গবেষণা। এরই ধারাবাহিকতায় কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় সাঁথিয়ার মাধপুরে প্রদর্শনী প্লটে পেরিলার চাষ করেছেন চাষি শহীদুল।

সরেজমিন দেখা গেছে, সবুজ পেরিলা দেখতে কোনো শাক-সবজির বাগানের মতো। অনেকটা পান পাতার মতো সবুজ এর প্রতিটি পাতা। ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে হাঁটলে পুদিনা পাতার মত একটু ঝাঁঝাল সুবাস নাকে আসে। কৃষি কর্মকর্তারা বলেন, এর কারণেই ক্ষেতে পোকা মাকড়ের উপদ্রব নেই। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন এ ফসলটি পোকা-মাকড় বিকর্ষক ফসল হিসেবে খ্যাত।

সাঁথিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার সঞ্জীব কুমার গোস্বামী জানান, পেরিলার ৩টি জাতের মধ্যে বাংলাদেশে কোরিয়ান পেরিলা নিয়ে শেকৃবির কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এইচ এম তারিক হোসেন ২০০৭ সালে শেকৃবিতে অল্প পরিসরে গবেষণা শুরু করেছিলেন। কোন সময়ে ভালো হয় দেখার জন্য বছরব্যাপী বিভিন্ন সময়ে পেরিলা চাষ করেছেন তারা।

২০১৮ সালে ড. তারিক হোসেনের তত্ত্বাধানে পেরিলা নিয়ে আবার গবেষণা শুরু করেন কাইয়ুম মজুমদার। চাষের উপযুক্ত সময়, কম খরচে তেল নিষ্কাশন, তেলের গুণাগুণ নিয়ে দুই বছর গবেষণার পর তারা সফলতা লাভ করেছেন। এখন দেশের বিভিন্ন এলাকায় চাষি পর্যায়ে চাষাবাদ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে এ ফসল চাষাবাদে পাবনা প্রথম সারিতে রয়েছে।

চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে সঞ্জীব কুমার গোস্বামী বলেন, জুলাইলের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবর এ পর্যন্ত এ ফসল চাষ উপযোগী। প্রথমে বেডে চারা তৈরিতে চার সপ্তাহ সময় লাগে। চারা লাগানোর ৭০ থেকে ৭৫ দিনের মধ্যে ফসল সংগ্রহ করা যায়। ফলে বছরজুড়ে একই জমিতে একাধিক ফসল চাষ করা যায়। চাষে খরচ অনেক কম।

খরিপ-২ মৌসুমে চাষ হওয়ায় আলাদা সেচের প্রয়োজন হয় না। তবে একটানা বৃষ্টি না হলে ১০ থেকে ১৫ দিন পর হালকা সেচ দিলেই হয়। হেক্টর প্রতি প্রায় দেড় টন ফলন পাওয়া যায়। এর পাতা ও ফুল মাটিতে পচে জৈব সারের যোগান দেয়।

পেরিলার গুণাগুণ সম্পর্কে সঞ্জীব কুমার গোস্বামী বলেন, পেরিলা অত্যন্ত উপকারী ভোজ্য তেল। এতে শতকরা ৫০-৬৫ ভাগ ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড থাকে যা হার্টের জন্য খুব উপকারী। মোট ফ্যাটের শতকরা ৯১ ভাগ অসম্পৃক্ত। এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে। এটি চোখের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

রোগবালাই সম্পর্কে সঞ্জীব কুমার গোস্বামী বলেন, রোগের পরিমাণ খুবই কম। আমরা কোনো রোগ পাইনি। সাঁথিয়ার মাধপুরে তাদের প্রদর্শনী প্লটে সামান্য কিছু ক্যাটারপিলার (শুয়োপোকা) দেখা গিয়েছিল। বালাইনাশক স্প্রে করার পর আর আক্রমণ হয়নি।

কথা হয় কৃষক শহীদুল ইসলামের সাথে। তিনি বলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ড. আ. সালামের মাধ্যমে তিনি পেরিলা তেলবীজের কথা প্রথমে জানতে পারেন। এরপর তার পরামর্শে তিনি এটির চাষাবাদ শুরু করার উদ্যাগ নেন। তার আগ্রহে সাঁথিয়ার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আনিসুর রহমান তাক পেরিলার বীজ সরবরাহ করেন। তিনি জানান, তার ৭ শতাংশ উঁচু জমি পতিত পড়েছিল। চিন্তা করলাম এ পতিত জমিতে নতুন ফসল চাষ করে দেখি কী হয়, দেখা যাক।

নতুন ফসল তাই কম জায়গায় চাষ করেছেন বলে জানান। তিনি জানান, পাবনায় তিনিই প্রথম সারির চাষি যারা তেল বীজ হিসেবে প্রথম পেরিলা চাষ করেছেন। তিনি জানান, তিনি প্রথমে বেডে চারা করেছিলেন।

অনেকটা মরিচের চারার মতো। এরপর ক্ষেতে চারা রোপণ করেছেন। তার জমিতে কৃষি শ্রমিকসহ মোট হাজার তিনেক টাকা খরচ হয়েছে। সে হিসেবে এক বিঘায় ১০ হাজার টাকার বেশি খরচ হবে না বলে তিনি ধারণা পেয়েছেন। বিঘা প্রতি অন্তত ২০ হাজার টাকার মতো লাভ থাকবে বলে তিনি ধারণা পেয়েছেন। কৃষক শহীদুল ইসলাম জানান, ফলন আশানুরূপ হয়েছে। আগামীতে এই ফসল আরো বেশি জায়গায় চাষ করবেন।

স্থানীয়দের এ ফসলটি নিয়ে আগ্রহের শেষ নেই। আজমত আলী নামের একজন চাষি জানান, তারা প্রথমে বুঝতে পারেননি এটা কি ক্ষেত। কেউ বলেছেন হাতির শুঁড়ের গাছ। এলাকার গৃহিনী নাজিরা খাতুন জানান, তিনি জানতেন না এটা কি ফসল? এটায় কি হবে? ক্ষেতের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নানা প্রশ্ন ছিল তাদের মনে। এলাকার খ্যাতিমান চাষি নজরুল ইসলাম ফকির জানান, তিনি শুনেছেন এর এক কেজি তেলের দাম দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা লিটার।

যেখানে সরিষা তেল বিক্রি হয় দুইশত টাকা লিটার। তাই এ মূল্যবান ফসলটি চাষে চাষিদের ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি নিজেও এ ফসলটির আবাদ করবেন বলে জানা। একই কথা জানান, গ্রামের অপর চাষি আ. ছালাম।

উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আনিসুর রহমান জানান, প্রায় সব ধরনের মাটিতে যেখানে পানি জমে থাকে না- এমন এ ফসল চাষের জন্য উপযোগী।

৭০-৭৫ দিনের মধ্যে পেরিলা ফসল সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। পরিপক্বতা আসার পর পর গাছের গোঁড়া কেটে বা উপড়ে ফেলতে হয়। এরপর সেগুলো ধরে হালকাভাবে পিটিয়ে বীজ সহজেই সংগ্রহ করা যায়।

আনিসুর রহমান আরো জানান, তিনি সাঁথিয়ার প্রদর্শনী প্লটটি সব সময় দেখভাল করেছেন। চাষির সাথে যোগাযোগ করেছেন। তিনি জানান, এ ক্ষেতে একবার অতিবৃষ্টির কারণে সামান্য সমস্যা দেখা দিয়েছিল। সেটা খুব সহজেই নিরাময় করা গেছে। তিনি বলেন, চাষিরা খুব আগ্রহ দেখাচ্ছেন এ ফসল চাষে। আগামী মৌসুমে এ এলাকায় ব্যাপক আবাদ হবে বলে আশা করছেন তিনি।

এরই মধ্যে পেরিলা পাকতে শুরু করেছে। আর তা কাটতে শুরু করেছেন চাষি শহীদুল ইসলাম। তিনি জানান, কাটার পর একটু সাবধানে বস্তায় ভরতে হয়। নতুবা ছোট ছোট দানা মাটিতে পড়ে যায়। তিনি পেরিলা কেটে বাড়ির ছাদে শুকাতে শুরু করছেন। এরপর একটু ঝাঁকি দিয়ে বা একটা দণ্ড দিয়ে হালকা আগাতেই বীজ বের হয়ে আসছে বলে জানান।

চাষি মহীদুল ইসলাম জানান, এ ফসলটির দাম ও উপকারিতা জানার পর তার কাছে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসছে এটি সম্বন্ধে জানতে। অনেকেই আগাম অর্ডার দিয়ে রাখছেন বীজের জন্য। আগামীতে তিনি নিজেও বেশি আবাদ করবেন বলে জানান।

সাঁথিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার সঞ্জীব কুমার গোস্বামী জানান বলেন, দেশীয় যন্ত্রের (ঘাণী) মাধ্যমে পেরিলা বীজ থেকে প্রায় ৪০-৪২ শতাংশ তেল বের করা যায়। ফলে বীজ থেকে কৃষকরা সহজেই তেল বের করতে পারবে। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ী কিংবা সরকারের অতিরিক্ত কোনো বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে না।

সঞ্জীব কুমার গোস্বামী গবেষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানান, পেরিলা ভোজ্যতেল জাতীয় ফসল, যার শতকরা ৬৫ ভাগই ওমেগা-৩ ফ্যাটি এ্যাসিড। এই অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এ্যাসিড আমাদের শরীরের জন্য অনেক উপকারী বিশেষত হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক ও ত্বকসহ ডায়াবেটিস রোগ-প্রতিরোধে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখে।

তিনি আরো জানান, বীজ থেকে তেল বের করে সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে টেস্ট করানো হয়েছে। এতে ক্ষতিকর ইউরোসিস এসিড নেই। এজন্য এই শতাব্দীতে এই পেরিলা তেলকে সম্ভাবনাময় তেল বলা হয়।

পাবনার অন্যতম উদ্যোক্তা দেওয়ান মাহবুব জানান, বিভিন্ন অনলাইনে এই তেল ৩ হাজার টাকা কেজি ধরে বিক্রি হচ্ছে। পাবনায় চাষ সম্প্রসারণ হলে এর তেল পাবনার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তরা বিভিন্ন স্থানে অনলাইনে সরবরাহ করতে পারবেন। আর পেরিলা ফসলের চাষাবাদ সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পারলে এর চেয়ে অনেক কম মূল্যে পেরিলা তেল বাজারজাত করা সম্ভব হবে।

কৃষি কর্মকর্তারা জানান, পরীক্ষামূলক চাষাবাদের সময় হেক্টরে দেড় টন পেরিলা বীজ উৎপাদন হয়েছে (যেখানে বীজ তেল ৪০ শতাংশ)। এছাড়া পাতা বিক্রি করেও চাষি লাভবান হতে পারবেন।

পাবনা জেনারেল হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ডা. আকসাদ আল মাসুর আনন জানান, পেরিলাতে রয়েছে অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড যা শরীরের জন্য অনেক উপকারী। বিশেষত হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক ও ত্বকসহ ডায়াবেটিস রোগ প্রতিরোধে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ ফামার্স এসাসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি আলহাজ শাহজাহান আলী বাদশা বলেন, পেরিলা থেকে উৎপাদিত তেলের দামও বেশি। এটা ১৮০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া সম্ভব।

ফলনও ভালো। বিঘাপ্রতি ৮ থেকে ৯ মণ ফসল মেলে। তিনি বলেন, দেশে প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টনের বেশি তেল আমদানি করতে হয়। যার বাজার মূল্য প্রায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলার। সেক্ষেত্রে এই পেরিলার চাষাবাদ বাড়ানো গেলে আমদানি কমানো যাবে। সেক্ষেত্রে দেশে পেরিলা চাষের বিস্তৃতি আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।