www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

দেলোয়ারের ‘প্রাকৃতিক কৃষি’ সাড়া ফেলেছে মানিকগঞ্জে


 এগ্রিবার্তা ডেস্ক    ৭ ডিসেম্বর ২০২১, মঙ্গলবার, ১২:৩৫   কৃষি ব্যক্তিত্ব বিভাগ


ছায়া সুনিবিড় আঁকাবাঁকা গাঁয়ের পথ। পাশে শতবর্ষী একটি বটগাছ। মাটিতে ঝুলে থাকা বটের শিকড়গুলোকেই এক একটা গাছ মনে হচ্ছে। ঝিরঝিরে মিষ্টি বাতাস। যতদূর চোখ যায় সবুজ প্রকৃতির বিস্তীর্ণ দৃশ্য। মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বালিয়াখোড়া ইউনিয়নের কাউটিয়া গ্রাম। কৃষিনির্ভর এ গাঁয়ের এক কিলোমিটার দূর দিয়ে বয়ে গেছে স্বচ্ছ ধারার কালীগঙ্গা। পাখির কিচিরমিচিরে ঘুম ভাঙে গ্রামবাসীর। এর পাশেই দৃষ্টিনন্দন দ্বিতল বাঁশের মাচার ঘর। চার পাশে নানা প্রকার দেশী জাতের ফসলের বৈচিত্র্য। প্রকৃতির সাথে সখ্য থেকেই এখানেই শুরু হয়েছে প্রাকৃতিক কৃষি কেন্দ্র ও প্রাণ বৈচিত্র্য খামার। বর্তমানে শতাধিক রকমের সবজি, ঔষধি, ফুল ও ফল গাছ উৎপাদিত হচ্ছে।

প্রাকৃতিক কৃষি আন্দোলনের সমন্বয়কারী ও প্রান্তজনীয় যোগাযোগ গবেষণা কেন্দ্রের (প্রাযোগ) পরিচালক দেলোয়ার জাহান। মালিকানাহীন এই বিপণন কেন্দ্রে সংগঠনের নিজস্ব খামার ঘিওর ছাড়াও ঝিনাইদহ, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, মেহেরপুরের বেশ কয়েটি গ্রাম থেকে আসছে বিভিন্ন ধরনের পরিবেশবান্ধব উপায়ে উৎপাদিত সবজি, ফল, বীজ। আশপাশের তিন-চারটি গ্রামের চাষিদের মধ্যে বীজ সুরক্ষা, কেঁচো সার ও নিরাপদ ফসল উৎপাদনে উৎসাহিত করছে এই প্রাকৃতিক কৃষিখামার।

এ ছাড়া খামারটি কৃত্রিম রাসায়নিক সার, বিষ ও হরমোনমুক্ত, প্রাকৃতিক কৃষি গবেষণা, কৃষক-কৃষাণী শিক্ষণ, উৎপাদন ও বীজ সুরক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। খামারটিতে দ্বিতল বাঁশের মাচার ঘর ও বন্যা সহনশীল বাড়ি নির্মাণ মডেল দেখানো হয়েছে। প্রাকৃতিক কৃষি কেন্দ্র সম্পূর্ণ সৌর বিদ্যুতে চলে থাকে। শতাধিক দেশী জাতের ফসল, পাখি, মৌমাছি পোকামাকড়ে সমৃদ্ধ খামারটি পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা রেখে চলেছে। খামারে মৌসুমভিত্তিক উৎপাদিত সবজি ঢাকার মোহাম্মদপুরে প্রাকৃতিক কৃষি বিপণন কেন্দ্র বিক্রি করে থাকে। 

প্রাকৃতিক কৃষি কেন্দ্রে গত বৃহস্পতিবার সকালে কথা হয় দেলোয়ার জাহানের সাথে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে ভালো রেজাল্ট নিয়ে ঢাকার একটি পত্রিকায় কৃষিবিষয়ক সাংবাদিকতা করছেন তিনি। পাশাপাশি নিজে কৃষিকাজ ছাড়াও অন্যদের প্রাকৃতিক উপায়ে কৃষিকাজে উৎসাহিত করছেন। অনার্সে দ্বিতীয় ও মাস্টার্সে প্রথম হয়েছিলেন দেলোয়ার। এরপর সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে চাকরির সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেখানে না গিয়ে ঢাকায় সাংবাদিকতা করছেন, আর সার ও কীটনাশক প্রয়োগ ছাড়া ফসল উৎপাদনে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছেন। দেলোয়ার বলেন, বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে কেউ যদি উচ্চশিক্ষার পর চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিকাজে জড়িত হয়ে জীবনযাপন করতে চায়, তা হলে সেটি সম্ভব এবং বাংলাদেশে এখন সেই পরিবেশ বেশ ভলোভাবে তৈরি হয়েছে। তিনি আরো বলেন, সমস্যা হচ্ছে তরুণরা মনে করে কৃষিকাজ মানে অচ্ছুতের কাজ। তাই এটি কেউ করতে চায় না। কারণ চার পাশে এত রঙ, এত প্রত্যাশা জীবনে যে কেউ কৃষিকাজ করতে চায় না। প্রচুর ছেলেমেয়ে আমাদের কাছে প্রাকৃতিক কৃষির কাজ দেখতে আসে। যে পরিমাণ আগ্রহ নিয়ে আসে তার দ্বিগুণ পরিমাণ আগ্রহ নিয়ে চলে যায়, অভিজ্ঞতা থেকে জানালেন দেলোয়ার।

২০১৩ সালে মার্চ মাসে মানিকগঞ্জে জমি লিজ নিয়ে রাসায়নিক সার ও বিষমুক্ত প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে সবজি চাষের মাধ্যমে শুরু হয় তার প্রাকৃতিক কৃষির কার্যক্রম। বর্তমানে এখানে কাজ করছেন ১০ জন কর্মী ও সারা দেশের শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক। চাষিদের ফসলের ন্যায্যমূল্য দিতে ‘প্রাকৃতিক কৃষি আন্দোলন’ ২০১৪ সালের ২৪ অক্টোবর থেকে ঢাকায় প্রাকৃতিক কৃষি ফসল বিপণন কার্যক্রম শুরু করে। এ কাজে তাকে স্ত্রী ডালিয়া আক্তার ডলিও সহায়তা করে আসছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ বিপুল হোসেন বলেন, প্রাকৃতিক কৃষি এ এলাকার কৃষকদের প্রাকৃতিক উপায়ে চাষাবাস করে কৃষিকে রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মাঠকর্মীরা তাদের সমস্যা সমাধান ও পরামর্শ দিয়ে আসছেন। স্থানীয় বালিয়াখোড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুল আওয়াল খান বলেন, লোকমুখে শুনে আমি এই প্রাকৃতিক কৃষিব্যবস্থা ও বাঁশের মাচার ঘর দেখতে যাই। তাদের কার্যক্রম দেখে এবং তাদের স্বপ্নের কথা শুনে বেশ ভালো লাগল। তাদের এই কার্যক্রম সফল হলে বিষমুক্ত সবজি এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে সহায়ক হবে। উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান কাজী মাহেলা বলেন কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে তাদের কার্যক্রমগুলো বেশ সাড়া ফেলেছে।

 




  এ বিভাগের অন্যান্য