www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

নীতি পর্যালোচনা

কৃষিজমির সংকোচন ও আফ্রিকায় কনট্র্যাক্ট ফার্মিং


 হুমায়ুন কবির    ২৭ ডিসেম্বর ২০২১, সোমবার, ১০:০৯   সম্পাদকীয় বিভাগ


গত ৫০ বছরে দেশের কৃষি খাতের দৃশ্যপট অনেকখানি বদলেছে। মোট কৃষি উৎপাদন বেড়েছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর দেশে খাদ্য উৎপাদনের (প্রধানত ধান-গম) পরিমাণ ছিল প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টন। বর্তমানে তা প্রায় সোয়া ৪ কোটি টন ছাড়িয়ে গেছে। একই ভাবে শস্যনিবিড়তাও আগের চেয়ে বেড়েছে। ফসলেও এসেছে কিছুটা বহুমুখিতা। প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণের সম্প্রসারণ ঘটছে। এসব নিঃসন্দেহে ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে এখন বড় একটা সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে কৃষিজমির ক্রমসংকোচন। যেভাবে কৃষিজমি কমছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে কৃষি খাতে আর কতটুকু উৎপাদনশীলতা বাড়ানো যাবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে অনেক দিন ধরে রাষ্ট্রীয় পরিসরে বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে আফ্রিকার দেশগুলোয় কনট্র্যাক্ট ফার্মিংয়ের ব্যাপারে কথাবার্তা চলছে। এ ধরনের প্রচেষ্টা জোরালোভাবে এগিয়ে নেয়ার এখনই সময়। সুদূর আফ্রিকায় গিয়ে চাষাবাদের বিষয়টি অনেকের কাছে কিছুটা অদ্ভুত ও বিস্ময়কর শোনাতে পারে। তবে বিশ্বায়নের সুবাদে আমাদের ধরিত্রী আজকাল বিশ্বগ্রামে পরিণত হয়েছে, কাজেই তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। বর্তমানে এটিই বরং এখন সময় ও বাস্তবতার সঙ্গে অনেক বেশি সংগতিপূর্ণ। প্রকৃত প্রস্তাবে প্রতিবেশী ভারতসহ আরো কিছু দেশ এক্ষেত্রে অনেকটা এগিয়েছে। বেসরকারি পর্যায় থেকে বেশ আগেই অবশ্য আমাদের দেশেও এ ধরনের একটা উদ্যোগের কথা সংবাদমাধ্যমে এসেছিল। ২০১১ সালে দেশের অর্ধশত ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী আফ্রিকায় কনট্র্যাক্ট ফার্মিংয়ে আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন সরকারকে। তারা এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আবেদনও করেছিলেন। তাদের আবেদনের সূত্র ধরে পররাষ্ট্র ও কৃষি মন্ত্রণালয় একটি ধারণাপত্রও তৈরি করেছিল। কিন্তু কয়েকজন উদ্যোক্তার আফ্রিকার দু-একটি দেশে জমি ইজারা নেয়া এবং খুব সীমিত মাত্রায় চাষাবাদ শুরু করা ছাড়া নানা জটিলতায় উদ্যোগটি খুব একটা এগোয়নি।

সম্প্রতি সুদান ও কেনিয়া থেকে কনট্র্যাক্ট ফার্মিংয়ের একটা প্রস্তাব আসার খবর মিলছে। দেশ দুটির সরকার বাংলাদেশকে সেখানে চাষাবাদের জন্য আহ্বান জানিয়েছে। সরকারও তাতে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে, আগ্রহ প্রকাশ করেছে। জরুরিভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে এ সুযোগের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার একর জমি অনাবাদি অবস্থায় পড়ে আছে। বিপুল জনসংখ্যার ভূমি অপ্রতুল বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য আফ্রিকা মহাদেশে চাষাবাদ সেদিক থেকে এক সুবর্ণ সুযোগ হতে পারে। শুধু প্রস্তাবকারী দুই দেশই নয়, সরকারি-বেসরকারিভাবে জাম্বিয়া, উগান্ডা, তানজানিয়া, ঘানা, লাইবেরিয়া, আইভরি কোস্ট, সেনেগাল, ঘানা ও সিয়েরালিয়ন হতে পারে চুক্তিভিত্তিক কৃষির নতুন গন্তব্য।

গবেষণার তথ্য বলছে, আফ্রিকার মাটি ধান, গম, পেঁয়াজ ও ভুট্টা আবাদের উপযোগী। তার মানে আমাদের দেশে চাহিদা ও উৎপাদনে অমিল থাকা কৃষিপণ্যগুলো সহজেই সেখানে ফলানো যাবে এবং অভ্যন্তরীণ কৃষিজমির ওপর বেড়ে চলা চাপ অনেকটা প্রশমিত হবে। অবশ্যই এক্ষেত্রে তালিকার প্রথম দিকে থাকবে গম ও পেঁয়াজ। দেশে চাহিদার তুলনায় গমের উৎপাদন কম। সেখানে গম আবাদ করা গেলে আমদানি অনেকাংশে কমে আসবে। একইভাবে পেঁয়াজও ফলানো যায়। দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হলেও তা দিয়ে পুরোপুরি অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটে না। একটা বড় অংশ, বিশেষ করে ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। দেশটিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অন্য কোনো সংকট দেখা দিলে এখানে পেঁয়াজের দাম অত্যধিক মাত্রায় বেড়ে যায়। ক্রয়ক্ষমতা চলে যায় সাধারণের সামর্থ্যের বাইরে। আফ্রিকায় পেঁয়াজ উৎপাদন করা গেলে এ ধরনের সরবরাহজনিত অভিঘাত থেকে মুক্তি মিলবে। এমনকি ওইসব দেশে ধানও উৎপাদন হতে পারে। সেটি শুধু অভ্যন্তরীণ ভোগের জন্য নয়, রফতানির জন্যও। কাজেই কনট্র্যাক্ট ফার্মিংয়ের বিষয়টি আমাদের নীতি ও উন্নয়ন এজেন্ডায় গভীরভাবে অঙ্গীভূত করতে হবে।

অবশ্য আফ্রিকা মহাদেশে কনট্র্যাক্ট ফার্মিংয়ের ক্ষেত্রে এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। প্রথম চ্যালেঞ্জটা আসে রাষ্ট্রের দিক থেকে। স্বভাবত কোনো দেশের সঙ্গে আমাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক ভালো না হলে সেখানে গিয়ে স্পন্সর কোম্পানি কিংবা কৃষকের জন্য চাষাবাদের বিষয়টি তেমন সহজ নয়। এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে সরকার টু সরকারের কূটনৈতিক যোগাযোগটা গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে সরকারিভাবে সুনির্দিষ্ট দেশকে বলতে হবে—বাংলাদেশ সেখানে কনট্র্যাক্ট ফার্মিং করতে চায়। ওই দেশের সরকার সম্মত হলেই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নপূর্বক শুরু করা যাবে চাষাবাদ। কিন্তু আমরা দেখছি সরকার আগ্রহ প্রকাশ করলেও রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে বিদেশে চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ এগিয়ে নিতে তত্পরতা-সহযোগিতা এখনো খুব একটা দৃশ্যমান নয়। আছে অভিজ্ঞতা ও কূটকৌশলগত ঘাটতিও। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের কথা বলা হলেও দেশে এর ব্যবহার এখনো সীমিত। কাজেই কৃষকরা এর ব্যবহার ও উপযোগিতা সম্পর্কে খুব একটা ওয়াকিবহাল নন। তদুপরি রয়েছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধা। আলোচনা-সংলাপে কনট্র্যাক্ট ফার্মিংয়ের কথা বলা হলেও এখনো আফ্রিকার সংস্কৃতি, কৃষ্টি-কালচার, সামাজিক মূল্যবোধ প্রভৃতি বিষয়ে কৃষকদের পর্যাপ্ত ধারণা দেয়া হচ্ছে না। তাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে না। চুক্তির ক্ষেত্রেও সক্ষমতার ঘাটতি আছে। কীভাবে চুক্তি করলে উইন উইন অবস্থা সৃষ্টি হবে, আমাদের দেশের কোম্পানি কিংবা সরকার কীভাবে লাভবান হবে সেক্ষেত্রে সক্ষমতা-সামর্থ্য ঘাটতিও প্রবল। বলা চলে, কিছু প্রতিবন্ধকতার ঘেরাটোপে বিদেশে চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদের প্রক্রিয়াটি এখনো বেশ মন্থর।

আন্তর্জাতিক এগ্রিবিজনেসে কনট্র্যাক্ট ফার্মিং নতুন কোনো বিষয় নয়। যেসব দেশে জনসংখ্যানুপাতে কৃষিজমির সংকট রয়েছে, তারা এদিকে আগেই মনোযোগ দিয়েছে। বিশেষ করে চীন, ভারত, পাকিস্তান, মিসর, ব্রাজিল ও কিছু ইউরোপীয় দেশ প্রায় দেড় দশক আগে নিজেদের উন্নয়ন এজেন্ডায় বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। সময়ের চাহিদায় সাড়া দিয়ে বড় পরিসরে আফিকায় কনট্র্যাক্ট ফার্মিংয়ে যুক্ত হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়ন, কূটনৈতিক উদ্যোগ, কৃষক-কর্মীদের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির সন্নিবেশ, প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সমর্থনের মাধ্যমে দেশগুলোর বিনিয়োগকারীরা আফ্রিকার দেশগুলোয় চাষাবাদ করছে। তাতে স্বাগতিক ও বিনিয়োগকারী দেশ উভয়ই লাভবান হয়েছে, হচ্ছে। এটি আমাদের এগিয়ে চলার জন্য বড় শিক্ষা বৈকি।

একদিকে জনসংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে নানাভাবে কৃষিজমি কমছে আমাদের দেশে। এ প্রেক্ষাপটে কনট্র্যাক্ট ফার্মিং বেগবান করতে হবে। এজন্য আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়ন করতে হবে। বহুমাত্রিকভাবে বাড়াতে হবে কূটনৈতিক উদ্যোগ। আফ্রিকার দেশগুলোয় শান্তিরক্ষার কাজে আমাদের দেশের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। দূতাবাসগুলোর সঙ্গে পিসকিপিং মিশনগুলোও এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের সঙ্গে দেশগুলোর স্থানীয় প্রশাসন ও জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। সুতরাং তাদের কাজে লাগে ওইসব দেশের সরকারের ইতিবাচক সমর্থন-সহযোগিতা পাওয়াটা মোটেই কঠিন নয়। একইভাবে দেশের অভ্যন্তরেও কিছু কাজ করতে হবে। কৃষকরা ও কর্মীরা যাতে আগ্রহী হন, তার জন্য তাদের সচেতন করতে হবে। ওই মহাদেশের কৃষ্টি-কালচার জানাতে হবে। সাংস্কৃতিক বাধাগুলো কীভাবে দূর করা যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। সেখানে কৃষক-কর্মীদের অভ্যস্ত করতে প্রয়োজনে দ্বিপক্ষীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। চুক্তিতে পারঙ্গমতা অর্জনে কোম্পানিগুলোর নিজেদের সক্ষমতা আরো বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে এক্ষেত্রে অন্য অভিজ্ঞ ও দক্ষ আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিতে পারে তারা। সর্বোপরি, আমাদের রাষ্ট্রের তরফ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত রাখা চাই।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মুখে খাদ্য জোগানো এবং বেড়ে চলা জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় বিদেশে কনট্র্যাক্ট ফার্মিংয়ের মতো এগ্রিবিজনেসের সুযোগ অনুসন্ধান ছাড়া আমাদের বিকল্প নেই। বাংলাদেশ শাকসবজি ও সুস্বাদু ফল আবাদে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। খাদ্যের দিক থেকে দেশের কৃষি বিভাগ যথেষ্ট অগ্রগতি করেছে। বিদেশের জমিতে কৃষি উদ্যোগ শুরু করতে এখন আমরা নিজেদের লব্ধ অভিজ্ঞতা-জ্ঞানের ওপর নির্ভর করতে পারি, কাজে লাগাতে পারি। বহিস্থ ও অভ্যন্তরীণ বাধাগুলো অতিক্রম করে বিদেশের মাটিতে নিতে পারি নতুন চ্যালেঞ্জ।

সরকারি মহল থেকে দাবি করা হলেও আমরা দেখছি দেশে খাদ্যনিরাপত্তা এখন অনেকটা হুমকির মুখে। খাদ্য স্বয়ম্ভরতার মিথও ফিকে হয়ে আসছে—বিপুল পরিমাণ খাদ্য আমদানির তথ্য থেকেই এর ইঙ্গিত মেলে। এ অবস্থায় আফ্রিকায় কনট্র্যাক্ট ফার্মিং আমাদের হতে পারে উত্তম বিকল্প। রাষ্ট্রীয় সমর্থনে বাংলাদেশী বিনিয়োগকারীরা যদি আফ্রিকায় বড় মাত্রায় চুক্তিভিত্তিক কৃষির দায়িত্ব নেন, তাহলে এ ধরনের উদ্যোগ উভয় দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রভূতভাবে অবদান রাখতে সহায়ক। কিছু ঝুঁকি নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু এতে করে বাংলাদেশ দুই দিক থেকে লাভবান হবে। একদিকে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে পারবে, অন্যদিকে বিদেশে বিপুল মানুষের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে। তাই এ ধরনের উদ্যোগ এগিয়ে নেয়াটাই এখন জরুরি।

  • হুমায়ুন কবির: সাংবাদিক



  এ বিভাগের অন্যান্য