www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

বগুড়ায় পুরনো লোহায় ১২০০ কোটি টাকার নতুন পণ্যবাজার


 এগ্রিবার্তা ডেস্ক    ১২ জানুয়ারি ২০২২, বুধবার, ১০:৩৩   কৃষি অর্থনীতি  বিভাগ


বগুড়ায় কৃষি ও গৃহস্থালি পণ্য উৎপাদনে পুরনো লোহা, জাহাজভাঙা লোহার কদর বেড়েছে। পুরনো লোহা কেজি দরে ক্রয় করে তা গলিয়ে তৈরি পণ্য ব্যবহার হচ্ছে কৃষিকাজে। পুরনো শ্যালো মেশিন, পাওয়ার টিলার, লেদ ওয়ার্কশপের ফেলনা লোহার টুকরো থেকে কৃষিকাজে ব্যবহার্য পণ্য ও পুরনো অ্যালুমিনিয়াম থেকে নতুন অ্যালুমিনিয়াম পাত্র যেমন হাঁড়ি-পাতিল, জগ, গ্লাসসহ নানা পণ্য উৎপাদন করে তা সরবরাহ করা হচ্ছে উত্তরের ১৬ জেলায়। ভাঙাড়ি লোহা দিয়ে এসব পণ্য তৈরির ফলে বিদেশ থেকে নতুন করে লোহা আমদানি করতে হচ্ছে না। এতে স্থানীয় অর্থনীতি শক্ত হচ্ছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।


জানা যায়, স্বাধীনতার আগে থেকে বগুড়ায় বিভিন্ন যন্ত্রের খুচরা পার্টস তৈরি হতে থাকে। বগুড়া শহরের ফুলবাড়ী এলাকায় বিসিক শিল্প ও কাটনারপাড়াসহ বেশকিছু এলাকায় এ পার্টস তৈরি করত কয়েকজন ওয়ার্কশপ মালিক-শ্রমিক। উত্তরের জেলাগুলো কৃষিভিত্তিক হওয়ার কারণে উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে কৃষিযন্ত্রের চাহিদা বেড়ে যায়। স্বাধীনতার পর পর্যায়ক্রমে এ শিল্পের বিকাশে এটি এখন বগুড়ার সবচেয়ে বড় শিল্পে রূপান্তরিত হয়েছে। এ শিল্পের কাঁচামাল হলো পুরনো লোহা, বাসাবাড়িতে ভাঙা তৈজসপত্র, ছাদ ঢালাইয়ে ব্যবহূত পুরনো রড, পাওয়ার টিলারের যন্ত্রাংশ, লেদ মেশিন, গাড়ির বিভিন্ন লোহাজাতীয় পার্টস, টিউবওয়েল, লেদ ওয়ার্কশপের ফেলনা লোহার টুকরো, জাহাজ ভাঙার লোহা। এসব সংগৃহীত লোহা গলিয়ে আবারও তৈরি হচ্ছে পাওয়ার টিলারের যন্ত্রাংশ, কৃষির জন্য ব্যবহূত ফাল, শ্যালো মেশিনের পার্টস, সেচকাজে ব্যবহূত বিভিন্ন পার্টস। বগুড়ায় তৈরি হওয়া এ পার্টস ছড়িয়ে যাচ্ছে উত্তরের ১৬ জেলায়। আবার এসব জেলা থেকেই সংগ্রহ করা হয় কৃষিযন্ত্র, যন্ত্রাংশ ও গৃহস্থালি পণ্য তৈরির রসদ।

ভাঙাড়ি লোহা সংগ্রহকারীরা জানান, বাসাবাড়িসহ বিভিন্ন স্থান থেকে লোহা ৩০ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে তারা কিনে নিয়ে আসেন। এসব ভাঙাড়ি লোহার মধ্য থেকে আলাদা করা হয় ঢালাই লোহা, মাইল্ড স্টোন (এমএস) এসএস ও কাস্ট আয়রন হিসেবে। আলাদা করার পর মানসম্মত লোহা বিসিকের শিল্পমালিকদের কাছে বেশী দামে বিক্রি করা হয়। এ পুরনো লোহা ক্রয়-বিক্রয়, তারপর গলিয়ে নতুন পণ্য তৈরি করা পর্যন্ত একটি বৃহৎ শ্রমবাজার জড়িয়ে আছে বলে ওয়ার্কশপ মালিকরা জানিয়েছেন। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক হাজার পরিবার।

তারা আরো জানান, অচল হয়ে পড়া পাওয়ার টিলার ও শ্যালো মেশিন বগুড়া শহরের শাপলা সুপার মার্কেট, রেলওয়ে হকার্স মার্কেট, গোহাইল রোড, বিআরটিসি মার্কেট এলাকায় কেনাবেচা হয়। বগুড়া, নাটোর, নওগাঁ, জয়পুরহাট, হিলি, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, রংপুর, কুড়িগ্রাম, পাবনাসহ উত্তরের ১৬ জেলার পাশাপাশি ঢাকার ধোলাইখাল, চট্টগ্রাম পোর্ট, যশোর থেকেও পুরনো শ্যালো মেশিন ও পাওয়ার টিলার সংগ্রহ করা হয়। পুরনো পাওয়ার টিলার ও শ্যালো মেশিন কিনে নেয়া মেশিনগুলো পার্ট বাই পার্ট খুলে ভালো ও সচল থাকা পার্ট বিক্রি করা হয় কৃষকের কাছে। আর বাকিটা বিক্রি হচ্ছে ভাঙাড়ি ব্যবসায়ীদের কাছে।

বগুড়া শহরের বিসিক শিল্পনগরীর প্রতিষ্ঠান গুঞ্জন মেটাল ওয়ার্কশপ সূত্রে জানা যায়, পুরনো লোহা গলানো হয় সিলিকন, পিগআয়রন ও হার্ডকোক দিয়ে। গলানোর পর তা বিভিন্ন ছাঁচে ঢেলে একটি আকৃতি তৈরি করা হয়।

পুরনো লোহা সংগ্রহকারী আসাদুর রহমান জানান, বিভিন্ন জেলা থেকে পুরনো পাওয়ার টিলার সংগ্রহ করা হয়। ভাঙাড়ি শ্যালো মেশিনও সংগ্রহ করা হয়। এসবের মধ্য থেকে যেসব পার্টস ভালো থাকে তা পুরনো যন্ত্রের দোকানে বিক্রি করা হয় বাকি অংশ ভাঙাড়ি হিসেবে বিক্রি করা হয়।

বগুড়া বিসিকের মিল্টন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কর্মকর্তারা জানান, বগুড়ায় বর্তমানে ১৬ ধরনের উন্নত যন্ত্রাংশ তৈরি হয়। এর মধ্যে ফাউন্ড্রি শিল্পকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে বেশকিছু ওয়ার্কশপ গড়ে উঠেছে। তারা মার্কেটে সরবরাহ করেছে কৃষি যন্ত্রাংশ। কৃষিপণ্যের মধ্যে শ্যালো ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ, পাওয়ার টিলারের যন্ত্রাংশ, পানি সেচের যন্ত্রাংশ।

এর মধ্যে রয়েছে কৃষির জন্য পাওয়ার টিলারের লোহার চাকা, শ্যালো মেশিন দিয়ে মাটির নিচ থেকে পানি তুলতে সেন্ট্রিফিউগাল পাম্প, মেশিনের যন্ত্র পিস্টন, গ্যাজল পিন তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে যানবাহনের ছোট পার্টস, কলকারখানার প্রয়োজনীয় পার্টস তৈরিও শুরু হয়েছে।

শুধু কৃষিযন্ত্র বা যন্ত্রাংশ নয়, এর পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে গৃহস্থালি পণ্যও। বগুড়া বিসিক কর্মকর্তারা জানান, জেলায় পুরনো অ্যালুমিনিয়াম গলিয়ে তা থেকে নতুন করে অ্যালুমিনিয়াম পাত্র তৈরি হওয়ার কারখানা রয়েছে অন্তত ১২টি। আর এসব কারখানা থেকে অ্যালুমিনিয়াম সংগ্রহ করে হাঁড়ি-পাতিল, বাটি, টিফিন ক্যারিয়ার, কড়াই, জগ, গ্লাস তৈরির কারখানা রয়েছে ১৮টি। কারখানাগুলোর মধ্যে বগুড়া বিসিকে রয়েছে চারটি। বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার তালোড়ায় রয়েছে ১৬টি, কাহালু উপজেলায় রয়েছে ছয়টি। এছাড়া বগুড়া আদমদীঘি উপজেলায় রয়েছে আরো চারটি।

বগুড়ার কাহালু উপজেলা সদরের হাইস্কুল রোডের অ্যালুমিনিয়াম থেকে পাতিল তৈরির কারখানার শ্রমিকরা জানান, এক কেজি গলানো অ্যালুমিনিয়াম প্রায় ৩০০ টাকায় কেনা হয়। সেটি থেকে পাতিল তৈরি হয় ৪০০ টাকার। তিনি জানান, এক কেজি অ্যালুমিনিয়াম থেকে মাঝারি পাতিল তৈরি হয় আটটি, ছোট পাতিল তৈরি হয় ১৬টি। নতুন ও পুরনো অ্যালুমিনিয়াম প্রায় সমান দামেই কেনাবেচা হয়।

ফাউন্ড্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের সভাপতি আবদুল মালেক আকন্দ বণিক বার্তাকে জানান, বর্তমানে বিসিকের আওতাভুক্ত নয়টি কারখানাসহ বগুড়ার ৬০টি কারখানায় পুরনো ভাঙাড়ি লোহা ব্যবহার হয় ২ লাখ ২৫ হাজার টন। আর পুরনো লোহা ও অ্যালুমিনিয়াম থেকে নতুন কৃষিযন্ত্র, যন্ত্রাংশ ও গৃহস্থালি পণ্যের বাজার প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এটি দেশের আরো সম্ভাবনায় খাত হিসেবে গড়ে উঠবে।




  এ বিভাগের অন্যান্য