www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে রংপুরে আমন চাষে খরচ বাড়ছে


 এগ্রিবার্তা ডেস্ক    ১৩ জানুয়ারি ২০২২, বৃহস্পতিবার, ৯:৪৪   সমকালীন কৃষি  বিভাগ


প্রাচীনকাল থেকেই এ দেশের কৃষি বৃষ্টিনির্ভর। মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতেই মিটত ধান আবাদে পানির চাহিদা। তবে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে বর্তমান ভরা মৌসুমেও পর্যাপ্ত বৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে কৃষকের সেচনির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। এমনকি আষাঢ় মাসেও জমিতে সেচ দিতে হচ্ছে। সেচের মূল উপাদান জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎসহ কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি, বন্যা, অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টিতে ফসল নষ্ট হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে রংপুর অঞ্চলে আমন মৌসুমে কৃষকের উৎপাদন খরচও বাড়ছে।

এসব কারণে আমন চাষের জমির পরিমাণ বাড়াতে কৃষি বিভাগকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। গত ৪ বছরে রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায় আমন চাষের জমি বেড়েছে ৬ হাজার ৬৫২ হেক্টর। এদিকে আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় কৃষি বিভাগ খরাপ্রবণ ও বন্যাসহনশীল জাতের ধান আবাদে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০১৮-১৯ মৌসুমে আমন ধানের জমির পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৩ হাজার ৪৭৬ হেক্টর।

রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মো. মোস্তাফিজার রহমান বলেন, কয়েক বছর ধরে এ অঞ্চলের কোথাও কোথাও জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব জানান দিচ্ছে। হঠাৎ করে তাপমাত্রা হ্রাস-বৃদ্ধির ফলে পরিবেশ এবং প্রাণিকুলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। যদি এ প্রভাব মানবদেহের কথা চিন্তা করি তাহলে দেখা যাবে নানা ধরনের অসুখে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ । আবার যদি এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির কথা বলি তাহলে দেখা যাবে অতিবৃষ্টি এবং অনাবৃষ্টিতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ২০১৮ সালে ৮ জানুয়ারি পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়ায় দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এছাড়া ২০২০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর রংপুরে ২৪ ঘণ্টায় ৩৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়, যা শতবছরেও দেখা যায়নি।

গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলা এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের চর হরিচণ্ডী গ্রামের কৃষক মো. আবু শামীম মণ্ডল। ২০২০ সালে কয়েক দফা বন্যায় তার নিজের চার বিঘা জমির আমন ধান ছাড়াও পারিবারিকভাবে আবাদকৃত আউশ ধান ও পাট নষ্ট হয়। প্রতি বিঘায় ধান আবাদে খরচ হয়েছিল ২ হাজার টাকা। এছাড়া ২০২১ সালে অনাবৃষ্টিতে আবাদ করা ফসলে সম্পূরক সেচ দিতে হয়েছিল।

কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের কৃষক মো. মইনুদ্দিন মিয়া বলেন, এবার পাঁচ বিঘা জমিতে আমন আবাদ করেছেন। বন্যায় বীজতলা এবং রোপণকৃত ধানের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু গত বছর (২০২০-২১) কয়েক দফা বন্যায় দুবার জমির আবাদ করা আমন ধান নষ্ট হয়।

তিনি আরো বলেন, আগে নিয়মমাফিক বন্যা হতো। কিন্তু কয়েক বছর থেকে মৌসুমের শুরুতে এবং শেষ পর্যন্ত একাধিকবার বন্যা হচ্ছে। আবার কখনো অনাবৃষ্টির কারণে জমিতে বর্ষা মৌসুমেও বাড়তি সেচ দিতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে।

নীলফামারী, লালমনিরহাট এবং রংপুর জেলার একাধিক কৃষকের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, এমনিতে কৃষি শ্রমিক থেকে শুরু করে কৃষি উপকরণের দাম প্রতি বছর বাড়ছে। উপরন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে আবাদে বাড়তি ব্যয় যোগ হচ্ছে।

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পরিবেশের ভারসম্য রক্ষায় ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার হ্রাস করতে কাজ করছে কৃষি বিভাগ। কৃষকদের সেচনির্ভর বোরো ধানের আবাদ কমিয়ে আমনসহ অন্যান্য ধানের আবাদ বাড়াতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। কিন্তু কয়েক বছর ধরে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে আমন মৌসুমে ধান আবাদে ক্ষতির মুখে পড়েছেন অনেক কৃষক। ২০১৮-১৯ মৌসুমে আমন আবাদ হয়েছিল ৬ লাখ ৩ হাজার ৪৭৬ হেক্টর জমিতে। ২০১৯-২০ মৌসুমে আমনের আবাদ হয়েছিল ৬ লাখ ৮ হাজার ৮৫২ হেক্টর। ২০২০-২১ মৌসুমে আমনের আবাদ হয়েছিল ৬ লাখ ১২ হাজার ৪৩৫ হেক্টর। ২০২১-২২ মৌসুমে আমনের আবাদ হয়েছে ৬ লাখ ১৪ হাজার ২৯৫ হেক্টর। এর মধ্যে বন্যায় ক্ষতি হয়েছে ৪ হাজার ৫৭২ হেক্টর জমি। তবে যে বছর বন্যা হয়নি সে বছর অনাবৃষ্টির ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়েছে।

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মাহবুবর রহমান বলেন, ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার কম হয়—এমন ফসল আবাদে কৃষকদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। তাই স্বাভাবিকভাবে বোরো ধানের চেয়ে আমন আবাদে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার কাজ করছে কৃষি বিভাগ। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে রংপুর অঞ্চলের কৃষিকাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্বীকার করে তিনি বলেন, যেসব স্থানে অতিবৃষ্টির ফলে আমন আবাদ নষ্ট হয় সেসব স্থানে বন্যাসহনীয় জাতের ধান রোপণের জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি যেসব স্থানে বৃষ্টি কম হয় সেখানে খরাসহনীয় ধান আবাদে কৃষকদের বলা হচ্ছে। তিরি আরো বলেন, বোরো মৌসুমে যেসব জমিতে সেচের জন্য ফিতা পাইপসহ বিভিন্ন ড্রেনেজ ব্যবস্থা করা হয় সেগুলো নষ্ট না করার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে যাতে আমন মৌসুমে সম্পূরক সেচ দিতে খরচ কম লাগে।




  এ বিভাগের অন্যান্য