www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

চিরযৌবনা বোটানিক্যাল গার্ডেন


 মুসাদ্দিকুল ইসলাম তানভীর, বাকৃবিঃ    ১৮ জানুয়ারি ২০২২, মঙ্গলবার, ৮:০৯   ক্যাম্পাস বিভাগ


ময়মনসিংহ শহরের অদূরে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) প্রকৃতির এক অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আঁধার। শিক্ষা গবেষণায় অনন্য উচ্চতায় থাকা প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছে একাধিক দর্শনীয় স্থান। তার মধ্যে অন্যতম বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেন। প্রকৃতি আর অজস্র বৃক্ষের মিতালিতে অনিন্দ্য সুন্দর এক সংগ্রহশালা এটি। ময়মনসিংহের একসময়ের প্রবল খরস্রোতা পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের একদম কোল ঘেঁষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ একর জায়গা নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এই বোটানিক্যাল গার্ডেন। এখানে রয়েছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অঞ্চলের বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় কয়েক হাজার উদ্ভিদের বিশাল সম্ভার। দেশি প্রায় সব প্রজাতির উদ্ভিদের পাশাপাশি বিদেশি অনেক বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। ছোট-বড়-মাঝারি ধরনের অসংখ্য গাছে ভরপুর গার্ডেনে রয়েছে প্রায় ৬০০ প্রজাতির প্রায় ১০০০টি বড়, ১২৭৮টি মাঝারি ও ৪৪৬৭টি ছোটসহ প্রায় ৬৭৪৫ টি গাছ। আন্তর্জাতিক সংস্থা বোটানিক গার্ডেনস কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনাল (বিজিসিআই) কর্তৃক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বাংলাদেশের প্রথম বোটানিক্যাল গার্ডেন এটি। তাই তো এ গার্ডেনটিকে একনজর দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন শত শত মানুষ ছুটে আসে। যা বিমোহিত করে পর্যটক ও দর্শনার্থীদের।

বিভিন্ন প্রজাতির গাছ গাছালি সহজে খুজে পাওয়ার জন্যে উদ্ভিদরাজি সমন্বয়ে গঠিত গার্ডেনটি ৩০টি জোনে বিভক্ত করা হয়েছে। ওষুধি, ফুল, ফল, ক্যাকটাস, অর্কিড, পাম, সাইকাস, মসলা, টিম্বার, বাঁশ, বেত, বিরল উদ্ভিদ ও বনজ উদ্ভিদ জোনসহ জলজ উদ্ভিদ (হাইড্রোফাইটিক) সংরক্ষণের জন্য ওয়াটার গার্ডেন, মরুভূমি ও পাথুরে অঞ্চলের উদ্ভিদ সংরক্ষণের জন্য রক গার্ডেন গড়ে তোলা হয়েছে। বাগান পরিচালনার জন্য ভেতরে রয়েছে দুই তলা অফিস কক্ষ। অফিস কক্ষ সংলগ্ন নিসর্গ ভবনের ভেতরে রয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগৃহীত বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় অসংখ্য প্রজাতির ক্যাকটাস। এর অপরূপ সৌন্দর্যই যেন নিসর্গ নামের সার্থকতা বহন করছে। বাগানের সর্ব দক্ষিণের রয়েছে মনোরম অর্কিড হাউস। তবে বেশি দেখা পাওয়া যাবে দেবদারু গাছের। রয়েছে সুবিশাল পানির ট্যাংক। রয়েছে চা ও কফি বাগান। সেখানে বিটি ১, বিটি ২, বিটি ৩, বিটি ৭, টিভি ১, টিভি ৫ সহ বিভিন্ন চায়ের জাতের সংরক্ষণ এখানে রয়েছে।

বাংলাদেশকে পরম মমতায় আগলে রাখা সুন্দরবনের গাছের জন্যে রয়েছে ব্যাতিক্রমধর্মী সুন্দরবন জোন। এসব উদ্ভিদের বেঁচে থাকার জন্য যেমন পরিবেশ প্রয়োজন ঠিক তেমন করেই এখানে গড়ে তোলা হয়েছে, যা বাংলাদেশে প্রথম ও একমাত্র। শ্বাসমূল (নিউমেটাফোর) ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদসমূহের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, যা এখানে সংরক্ষিত। সুন্দরবনের সুন্দরি গাছও এখানে পাওয়া যায়। এছাড়া রয়েছে গরান, গেওয়া, কেওড়া, পশুর, বাইন, হোগলা ও ফার্ণ জাতীয় নানা প্রজাতির উদ্ভিদ।

পাশাপাশি ওষুধি গাছের জোনে গেলে দেখতে পাওয়া যাবে অশ্বগন্ধা, সর্পগন্ধা, গন্ধভাদুলি, পুনর্নভা, কুর্চি, বচ, উলটচন্ডাল, অন্তমূল, অঞ্জন প্রভৃতি ঔষুধি গাছ এখানে স্থান পেয়েছে। এছাড়া আরো নানান রকমের ঔষধি গাছ আাছে এখানে। যা থেকে দর্শনার্থীরা সহজেই এ সব গাছগাছালি সম্পর্কে ধারণা পাবে।

এছাড়াও রয়েছে বিদেশী, দেশি ফুল ও ফলের গাছ। কমব্রিটাম, রনডেলেসিয়া, পালাম, ক্যামেলিয়া, আফ্রিকান টিউলিপ, ট্যাবেবুঁইয়া, রাইবেলি, জেসিয়া, ডায়ান্থাস, সিলভিয়া, হৈমন্তি বিভিন্ন ধরণের ফুল গাছ এবং স্টার আপেল, আমেরিকান পেয়ারা, থাই মালটা, আঙুর, প্যাসান ফলসহ বিভিন্ন ধরনের মৌসুমী ফলের গাছ এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়াও বাঁশ বাগানে রয়েছে ১৬ প্রজাতির বাঁশ, মসলা জোনে রয়েছে একশথর বেশি মসলা জাতীয় উদ্ভিদ।

বাগানের পূর্ব দিকের সীমানা ঘেঁষে ২০১০ সালে নির্মিত হয় একটি ক্যাকটাস হাউস। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগৃহীত বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় ৬০ এর অধিক প্রজাতির ক্যাকটাস নিয়ে সাজানো হয়েছে হাউসটি। এছাড়া এখানে রয়েছে একটি নার্সারী। শোভা বর্ধনকারী, অর্কিড, ক্যাকটাস, দেশীয় বিলুপ্ত প্রায় প্রজাতিসহ বিভিন্ন ফুলগাছের চারা এখান থেকে ক্রয়ের সুবিধাও রয়েছে। উদ্ভিদরাজির পাশাপাশি বাগানটিতে দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন পশু-পাখির প্রতিকৃতি। বিশ্রামের জন্য নদেও পাড় ঘেষে রয়েছে ৪০টির অধিক বিশ্রাম বেঞ্চ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও স¤প্রসারণ কার্যক্রম, ¯œাতক পর্যায়ে বিভিন্ন অনুষদের শিক্ষার্থীদের উদ্ভিদ জগৎ সম্পর্কে ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন এবং মাস্টার্স ও পিএইচডি শিক্ষার্থীদের গবেষণা কার্যক্রমে বিভিন্নভাবে সহায়তা দিয়ে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীকে পরিচিত করানো হয় বাগানের সঙ্গে। বাগানের প্রধান দায়িত্বে রয়েছেন একজন কিউরেটর। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকদের মধ্য থেকে একজন গার্ডেনের কিউরেটরের দায়িত্ব পান। তার তত্ত¡াবধানেই পরিচালিত হয় গার্ডেনটি। বর্তমানে দ্বায়িত্ব পালন করছেন উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহানারা বেগম। এছাড়া বাগানের রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে রয়েছে একাধিক কর্মচারি। শিক্ষার্থীদের জন্যে ফ্রি হলেও দর্শনার্থীদের জন্যে জনপ্রতি টিকিট মূল্য ১০ টাকা। বাগানটি সপ্তাহের রবি থেকে বৃহস্পতিবার পাঁচ দিন বিকাল ২টা থেকে ৫টা এবং শুক্রবার ও শনিবার সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

অনিন্দ্য সুন্দর আর নানা উদ্ভিদের সমন্বয়ে বোটানিক্যাল গার্ডেনটি বৃহত্তম ময়মনসিংহের গর্ব। এই বোটানিক্যাল গার্ডেনটি দিনের পর দিন মাথা উঁচু করে তার চির সবুজের সৌন্দর্য দর্শনার্থীদের মাঝে বিলিয়ে যাচ্ছে।




  এ বিভাগের অন্যান্য