www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

অর্থনৈতিক বিবেচনায় জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের আবাদ


 ড. মো. সাইদুর রহমান    ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, সোমবার, ২:২৯   সম্পাদকীয় বিভাগ


খাদ্য উপাদান হিসেবে জিঙ্ক মানুষের দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, বুদ্ধিমত্তাসহ নানা শারীরবৃত্তিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জিঙ্কের অভাবে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয় এবং বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি যেমন ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। আমাদের দেশের শতকরা ৪০ ভাগের বেশি মানুষের, বিশেষ করে শিশু ও নারীদের জিঙ্কের ঘাটতি রয়েছে। প্রচলিত উচ্চফলনশীল ধানের জাতভেদে প্রতি কেজি চালে গড়ে ১৫-১৬ মিলিগ্রাম জিঙ্ক থাকে, যার মাধ্যমে ভাতের ওপর নির্ভরশীল সাধারণ মানুষের জিঙ্ক চাহিদার মাত্র ৪০ শতাংশ পূরণ করতে পারে। তবে জিঙ্কসমৃদ্ধ উচ্চফলনশীল ধান থেকে সাধারণ মানুষের জিঙ্কের চাহিদা পুরোপুরি মেটানো সম্ভব।

বাংলাদেশে শতকরা ৭৭ ভাগ জমিতে ধান আবাদ হয় এবং মোট চাল উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। এ দেশের মানুষ জনপ্রতি বছরে প্রায় ১৮০ কেজি চাল খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের ১৬৯ মিলিয়ন মানুষের জন্য চাল উৎপাদন হয়েছে ৩৪ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন টন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে উদ্ভাবিত বিভিন্ন প্রজাতির জিঙ্কসমৃদ্ধ ধান উৎপাদন হয়, যা থেকে বিভিন্ন মাত্রায় জিঙ্ক পাওয়া যায়। জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধু ধান-১০০ (জিঙ্কের পরিমাণ ২৫.৭ মিলিগ্রাম/কেজি), ব্রি ধান-৬২ (জিঙ্কের পরিমাণ ১৯ মি. গ্রাম/কেজি), ব্রি ধান-৬৪ (জিঙ্কের পরিমাণ ২৪ মি. গ্রাম/কেজি), ব্রি ধান-৭২ (জিঙ্কের পরিমাণ ২২.৮ মি. গ্রাম/কেজি), ব্রি ধান-৭৪ (জিঙ্কের পরিমাণ ২৪.২ মি. গ্রাম/কেজি) এবং ব্রি ধান-৮৪ (জিঙ্কের পরিমাণ ২৭.৬ মি. গ্রাম/কেজি)। ওই ধান থেকে কেজিতে গড়ে ২৩ দশমিক ২ মিলিগ্রাম জিঙ্ক পাওয়া সম্ভব। বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, পূর্ণবয়স্ক একজন নারী-পুরুষের দৈনিক ৮-১১ মিলিগ্রাম জিঙ্কের প্রয়োজন হয়। একজন মানুষ প্রতিদিন গড়ে ৪৯০ গ্রাম জিঙ্কসমৃদ্ধ চালের ভাত খেলে তা থেকে দৈনিক প্রায় ১১ দশমিক ৩৪ মিলিগ্রাম জিঙ্ক পাবেন, যা তার প্রয়োজনের চেয়েও অধিক।

সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে জিঙ্কের অভাব বেশি পরিলক্ষিত হয়। যেহেতু এই শ্রেণীর মানুষের ভাত খাবার প্রবণতা বেশি থাকে, তাই তাদের জিঙ্কসমৃদ্ধ চালের ভাত খেতে উত্সাহিত করলে তারা বেশি সুবিধা পাবেন। দেশে চাল উৎপাদনের ক্ষেত্রে জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের আবাদ বৃদ্ধির দিকে নীতিগতভাবে প্রাধান্য দেয়া প্রয়োজন। কারণ উদ্ভাবিত জিঙ্কসমৃদ্ধ জাতের ধানের হেক্টরপ্রতি ফলন ৩ থেকে ৮ দশমিক ৮ টন, যা অন্যান্য উচ্চফলনশীল জাতের ধানের মতোই এবং এদের জীবনকালও অপেক্ষাকৃত কম (১০০ থেকে ১৪৮ দিন)। গবেষণা ও সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে দেশে জিঙ্কসমৃদ্ধ চাল উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে এবং এর মাধ্যমে দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের শরীরে জিঙ্কের চাহিদা পূরণ করা যাবে।

করোনা অতিমারীতে চিকিত্সকরা মানুষের শরীরের অভ্যন্তরীণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি বৃদ্ধিতে জিঙ্কের ভূমিকা রয়েছে বলে জিঙ্ক ট্যাবলেট খেতে পরামর্শ দিচ্ছেন, যা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে। ওষুধ গ্রহণের বিকল্প হিসেবে ভাতের খরচে জিঙ্কের প্রয়োজন মেটানো গেলে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ থেকে তাদের রেহাই দেয়া যাবে। ফলে সাধারণ মানুষের উপকার হবে। সেক্ষেত্রে আমাদের দেশের মানুষের শরীরে প্রয়োজনীয় জিঙ্কের সহজলভ্য ও উত্কৃষ্ট উত্স হতে পারে জিঙ্কসমৃদ্ধ চাল। সে কারণে সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা করে জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের চাষাবাদ বৃদ্ধিতে কাজ করতে হবে। এজন্য গবেষণায় গুরুত্ব ও বিনিয়োগ দুটোই আরো বাড়াতে হবে, যাতে জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের একরপ্রতি ফলন কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে হয় এবং কৃষক সম্প্রদায় জিঙ্কসমৃদ্ধ ধান আবাদে উত্সাহিত হয়।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশ জাপানে ধানের একরপ্রতি উৎপাদন আমাদের তুলনায় অনেক বেশি। বর্তমানে জাপানের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো ভাতের গুণগত মান বৃদ্ধিতে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। মানুষের শরীরের প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান ভাত থেকেই যেন বেশি পরিমাণ পাওয়া যায় তার জন্য গবেষণা করছেন। আমাদের দেশেও তা করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ ভাতই বাঙালি হিসেবে আমাদের প্রধান খাদ্য। অনেক কিছুর পরিবর্তন হলেও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের হার খুবই কম। সে কারণে ভাতের গুণগত মান বৃদ্ধিতে জিঙ্কের পরিমাণ বৃদ্ধিতে জোর দেয়া এবং জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের আবাদের সম্প্রসারণ ঘটাতে সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

  • ড. মো. সাইদুর রহমান: অধ্যাপক, কৃষি অর্থনীতি বিভাগ এবং পরিচালক, কৃষি ব্যবসা ও উন্নয়ন শিক্ষা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ



  এ বিভাগের অন্যান্য