www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

একুশের শিকড়, গ্রামীণ সংস্কৃতি ও প্রবাদ-প্রবচন


 মোহাম্মদ জমির    ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, সোমবার, ১০:৪৩   সম্পাদকীয় বিভাগ


প্রবাদ-প্রবচন আমাদের গ্রামীণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে একটা অনপনেয় প্রতিচ্ছাপ রেখে গেছে। বাংলা ভাষা, একুশের শহীদ দিবস ও পুরো ফেব্রুয়ারিতেও এর বিশেষ তাৎপর্য আছে।

ভাষা হিসেবে বাংলার সঙ্গে বিভিন্ন প্রবাদ-প্রবচনের এ সংযোগ সুপ্রাচীন ও গভীর শিকড়ে গ্রথিত। সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক রেকর্ড-সাক্ষ্যপ্রমাণ নেই বাংলার মানুষ কখন কৃষিকাজ শুরু করেছিল, তবে আনুমানিক এটা খ্রিস্টপূর্ব চার শতকেরও কম হবে না। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজ্য সরকার চব্বিশ পরগনা, মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ এবং বীরভূমে বিভিন্ন খননকাজ চালিয়েছে। তাতে সুস্পষ্টভাবে ইঙ্গিত মিলেছে যে, কৃষিজ জ্ঞানে সমৃদ্ধ এ অঞ্চল এক ক্রমবিবর্তনশীল সভ্যতার অংশ। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনার চন্দ্রকেতুগড়ে পরিচালিত হওয়া খননকাজে কৃষিজ ধরনের পোড়ামাটির ফলক (টেরাকোটা) পাওয়া গেছে। ওইসব ফলকে নারকেল, সুপারি ও তালগাছের উপস্থিতি মিলেছে।

এসব ঐতিহাসিক সাক্ষ্যপ্রমাণ থেকে স্পষ্ট যে, প্রাচীনকালে বাংলায় ধর্ম মূলত কৃষির সঙ্গে যুক্ত ছিল। এটা বাংলা প্রবচনগুচ্ছের ক্রমবিবর্তনশীল ভাণ্ডারেও প্রতিফলিত হয়েছে। এক্ষেত্রে ১৯৭৬ ও ১৯৮৫ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত একটি বইয়ের কথা উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে। সেটি হলো মুহম্মদ হানিফ পাঠান রচিত ‘বাংলা প্রবাদ-পরিচিতি’। তিনি বাস্তবসম্মতভাবে প্রবাদ-প্রবচন সংগ্রহ এবং সেগুলো প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত জটিলতাগুলো চিহ্নিত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি মৌখিক-প্রচলিত ঐতিহ্যের (ওরাল ট্র্যাডিশন) ভিত্তিতে তৈরি হওয়া প্রবচনের তাত্পর্যপূর্ণ ফ্যাক্টরগুলো যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। সন্দেহ নেই, প্রবাদ তার নিজস্ব গতিশীলতা ও দৈনন্দিন ব্যবহারিক মিথস্ক্রিয়া সৃষ্টি করে। এটা সামষ্টিক অভিজ্ঞতার অবয়ব গড়ে দেয় এবং পরিভাষা ও বাগবিধির বিবর্তনে সাহায্য করে।

কাজেই আমি মনে করি, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে এসব প্রবচনের মধ্যে জাতির মনীষা ও স্পিরিট উন্মোচন করা যেতে পারে। এই ফ্যাক্টরের সমাজতাত্ত্বিক গুরুত্বও বিপুল। আমাদের গ্রামীণ সমাজের জনগোষ্ঠীগত নৈতিক কাঠামোয় বিশেষ করে ধর্মীয় রীতিনীতি-সংক্রান্ত প্রবচনগুলোর একটা তাত্পর্যপূর্ণ প্রভাব বিদ্যমান। অবশ্য আমাদের প্রাচীন কবি ও জ্যোতির্বিদ খনাকে উল্লেখ করা ছাড়া গ্রামবাংলায় বাংলা প্রবচন ও সেগুলোর প্রাসঙ্গিকতা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। খনার বচনগুলো এ দেশের ঐতিহ্যবাহী কৃষিসংক্রান্ত রীতি-প্রথার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ গঠন করেছে। একই সঙ্গে কথা বলার ধরন-ধারণ, আদবকেতা এবং জনস্বাস্থ্য-বিষয়ক বিভিন্ন পরামর্শও এতে রয়েছে। সুপ্রাচীনকাল থেকে এগুলো এ দেশের সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির বোঝাপড়ায় ভূমিকা রেখে আসছে।

বাংলার প্রাচীন অর্থনৈতিক ইতিহাসের একটি নিরপেক্ষ-সযত্ন বিশ্লেষণ ইঙ্গিত দেয় যে, আগে চাষাবাদ এবং কৃষির সঙ্গে কাজগুলো ছিল খুব সম্মানজনক। খনার বচনের অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে যে, বাংলার অর্থনৈতিক জীবনে কৃষকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। মধ্যযুগের চারণকবি মুকুন্দরামের বিভিন্ন কবিতা, বিশেষ করে তার চণ্ডিমঙ্গলেও এর প্রমাণ মেলে। খনা বেশ কয়েকবারই বলেছিলেন:

‘যার ঘরে নেই ঢেঁকি মশাল, সেই বউঝির নেই কুশল’; ‘গরু, জরু, ধান এ তিনে রাখে মান’; ‘যার গোলায় নাই ধান, তার আবার কথার টান’ এবং ‘যার নেই গরু, সেই সবার হরু’।

এসব প্রবাদে খনা স্বাস্থ্যসম্মতভাবে গবাদি পশু পালন এবং খাদ্যশস্যের চাষাবাদের গুরুত্ব তুলে ধরেছে এবং আবশ্যিকভাবে এসব বিষয় যেকোনো পরিবারের সম্পদ সৃজনের গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।

এখানে এটা উল্লেখ করা দরকার যে, নিকট অতীতে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় পরিচালিত কিছু জরিপে উঠে এসেছে, যদিও দেশের জনসাধারণ মানুষ ডাক বা খনা এ দুজন প্রাচীন দ্রষ্টাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পড়েননি, তবু তাদের প্রবাদ-প্রবচনগুলো স্থানীয়ভাবে চর্চা হয়েছে, জনমানুষের দৈনন্দিন জীবনে তাদের প্রভাব বিপুলভাবে পড়েছে। এটা বিশেষভাবে ময়মনসিংহের ত্রিশাল, কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া ও দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ উপজেলার ক্ষেত্রে সত্য। এসব জায়গায় কেবল ৯ শতাংশ বাসিন্দাই মনে হয় বচন পড়ার মাধ্যমে খনা বা ডাকের সঙ্গে পরিচিত। যদিও ৯৭ শতাংশই বলেছেন যে, তারা খনা ও কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্তির কথা জানেন। এটিও বেরিয়ে এসেছে যে, বিশেষ করে সামাজিক তাত্পর্যের বিষয়গুলোয় প্রায় ৯৮ শতাংশ জনগোষ্ঠীর কাছে খনা এখনো প্রভাববিস্তারী।

প্রবাদ-প্রবচন বিশ্বের সব জায়গায় পাওয়া যায় এবং সেগুলো সাংস্কৃতিক অবস্থা, ভাষা এবং প্রকাশের স্থানীয় ধরনগুলো তুলে ধরে। এভাবে বাইবেলে বর্ণিত ‘ চোখের বিনিময়ে চোখ, দাঁতের বিনিময়ে দাঁতের’ মতো প্রকাশের সঙ্গে পূর্ব আফ্রিকার নান্দি জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত ‘ছাগলের বদলে ছাগল এবং লাউয়ের বদলে লাউয়ের’ সমরূপ মিল আছে। উভয় অভিপ্রকাশই আচরণবিধি, উপজাতীয় ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রজ্ঞার বিস্তৃতি এবং বিধিব্যবস্থার দৃষ্টান্তমূলক ব্যবহার ফুটিয়ে তোলে। এখানে শুধু যে দিকটি বুঝতে হবে সেটি হলো একই প্রবাদ-প্রবচনের অনেক ধরন পাওয়া যায়।

ফেব্রুয়ারি এবং রাষ্ট্রভাষা-মাতৃভাষা হিসেবে বাংলার প্রতি আমাদের অঙ্গীকার ও লড়াইয়ের একটি স্বতন্ত্র দিক আছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের পার্শ্ববর্তী পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য, ওড়িশা, আসাম, বিহার, তামিলনাডু, এমনকি নেপাল ও ভুটানেও ভাষা হিসেবে বাংলার একটা তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা আছে।

সবাইকে বুঝতে হবে যে, বাংলাদেশের প্রবাদ-প্রবচনগুলো কেন আমরা এত সমীহ করি, গুরুত্ব দিই। প্রবাদগুলো অবয়বে ছোট হলেও এর একক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। সাধারণত এগুলোর একটা দার্শনিক সারাৎসার ও বিশেষ অর্থ থাকে। এটিও বোঝা জরুরি যে, এসব অভিপ্রকাশ সাধারণত আবেগ নয়, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তৈরি হয়। এটি এমন দিক, যা ব্যবহারগুণে সম্মান-সমীহ সৃষ্টি করে, যখন একজন ব্যক্তি প্রবাদের মাধ্যমে তার সুনির্দিষ্ট মতামত তুলে ধরেন। আমাদের অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে, প্রবাদ-প্রবচনগুলো সত্যিই সংকেত ও তথ্যবাহক এবং সেগুলো অভিজ্ঞদের প্রকাশ। এদিকটিই তুলে ধরেছেন আমেরিকান লেখক ডব্লিউসি হ্যাজলিট, যিনি প্রবাদ-প্রবচনকে ‘সত্য ধারণের শব্দের সমষ্টি বা অভিপ্রকাশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। রূপক অর্থে যা বিরোধিতামূলক বা অতিশয়োক্তির মতো।

বাংলা প্রবাদ-প্রবচনগুলো সাধারণত একটি বর্ণনামূলক পদ্ধতিতে গঠিত হয়, যা একটি বিষয় ও মন্তব্য ধারণ করে। কাণ্ডজ্ঞানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা প্রবাদগুলো গ্রামবাংলায় নৈতিকতার অলিখিত মর্যাদা ধারণ করে হাজার বছর ধরে প্রচলিত হয়ে আসছে। স্বাভাবিকভাবে এগুলো বিভিন্নভাবে সামাজিক মূল্যবোধ, জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয় বা এ অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিফলন ঘটায়।

সাধারণত বাংলা প্রবাদের একটি প্রতিপাদ্য ও স্বতন্ত্র অর্থ থাকে। এসব প্রবচনের কিছু গঠনের স্ববিরোধী, প্রকৃতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়; আবার কিছু প্রকৃতির পরিপূরক হয়। আরো কিছু প্রবাদ-প্রবচন আছে যেগুলো সামাজিক বিজ্ঞান, রাজনীতি বা অর্থনীতির মূলনীতিগুলো নিয়ে কাজ করে। আরো কিছু প্রবচন আছে যেগুলো আবহাওয়া, আবহাওয়ার ধরন, অতিপ্রাকৃতিক বিষয়-আশয়, ফুল-ফল এবং দৈনন্দিন জীবনে জ্যোতির্বিদ্যার গুরুত্ব তুলে ধরে। বঙ্গবন্ধু খনার খুব গুণমুগ্ধ ছিলেন। প্রায়ই তিনি (বঙ্গবন্ধু) এ বিদুষী নারীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতেন। কৃষির ম্যাট্রিকস এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে চাষাবাদ কীভাবে মানুষের খাদ্য জোগানো ও অর্থনৈতিক জীবিকা উন্নয়নে কাজ করতে পারে, সেটি তিনি বারবারই বলেছিলেন। বিশেষ করে এক্ষেত্রে তিনি নির্দিষ্ট ধরনের গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, গরু, বলদ, ছাগল, কবুতর প্রভৃতি পশু-পাখি পালনের ওপর জোর দিয়েছিলেন। আরো দৃষ্টি দিয়ে বলেছিলেন, খনা কীভাবে শাকসবজি বিশেষ করে লাউয়ের তাত্পর্যের কথা উল্লেখ করেছিলেন এবং সেগুলো কীভাবে কৃষককে সাহায্য করত। তিনি এও বলেছিলেন, ফলমূল যেমন আম, কাঁঠাল, কলা প্রভৃতি ফলের আবাদ উৎসাহিত করতে খনা কীভবে কৃষকদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন।

স্বাধীনতার পরে বিভিন্ন সময়ে ঢাকার বাইরে গেলে কৃষকদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দেখা হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সার না পাওয়াসহ বিভিন্ন সমস্যা যখন কৃষকরা তার কাছে তুলে ধরতেন, তিনি তাদের কাছে খনার কথা উল্লেখ করতেন। তিনি কখনো বলতে দ্বিধা করেননি খনা কীভাবে জৈব সারের (শুধু সহজলভ্য গোবর নয়, ছাই, ঝরা পাতা ও ঘাসও) গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু কৃষকদের গবাদি পশুর প্রজনন এবং যথাযথ বাঁধ নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছিলেন।

আরেকটা মজার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু কৃষকদের মনোযোগ দিতে বলেছিলেন, খনাও যেটিতে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সেটি হলো, আবহাওয়ার ধরন নির্ণয়ে পোকামাকড় ও ব্যাঙ বিষয়ে তার (খনা) পর্যবেক্ষণ। উল্লেখ করা যেতে পারে, খনা মনে হয় একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন, যেমনটা তখনকার চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আরো অনেক এলাকায় প্রচলিত ছিল। এটা আবহাওয়ার পূর্বাভাসসংক্রান্ত। সেটি হলো, ‘ব্যাঙ যদি বেশ দ্রুত ডাকে, তাহলে এটি বৃষ্টির আসন্ন সংকেত’।

বঙ্গবন্ধুও এ ধরনের পরামর্শ কৃষকদের দিয়েছিলেন। কেননা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর চাহিদা এবং কীভাবে কৃষির বিরাজমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে হবে সেই সম্পর্কে তার গভীর সংযুক্তি ছিল। সাত শতাব্দী পরে খনা ও তার বচনগুলো এক্ষেত্রে তাতে ব্যাপকভাবে সাহায্য করেছিল। বঙ্গবন্ধু এসব লোকায়ত বচনের মর্ম বুঝেছিলেন। এগুলো আমাদের অনন্য সম্পদ। একুশের চেতনা, ভাষা, কৃষি, কৃষ্টি-কালচার এবং গ্রামবাংলা সব ক্ষেত্রে প্রবাদ-প্রবচনগুলো এ অঞ্চলে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। নানাভাবে এগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি।

  • মোহাম্মদ জমির: সাবেক রাষ্ট্রদূত, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, তথ্য অধিকার ও সুশাসনবিষয়ক বিশ্লেষক



  এ বিভাগের অন্যান্য