www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

নগর পরিকল্পনায় উপেক্ষিত শিশুদের প্রয়োজনীয় পরিসর


 ড. আদিল মুহাম্মদ খান    ৯ মার্চ ২০২২, বুধবার, ৮:১১   সম্পাদকীয় বিভাগ


শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলার গুরুত্বের কথা আমরা সবসময়ই বলি। রাজধানী ঢাকা শহরে দিন দিন শিশু-কিশোরদের বিনোদন ও খেলাধুলার স্থান সংকুচিত হয়ে আসছে। নগর পরিকল্পনায় ঘুরেফিরে উপেক্ষিত রয়ে যাচ্ছে শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় পরিসর, খেলার মাঠ। যে কয়েকটি হাতেগোনা খেলার মাঠ অবশিষ্ট আছে, সেগুলোর অধিকাংশই দখল কিংবা নানা কারণে খেলার মাঠ হিসেবে আর ব্যবহার করার সুযোগ নেই।

এ পটভূমিতে রাজধানী ঢাকার কলাবাগানের উত্তর ধানমন্ডি এলাকার তেঁতুলতলা মাঠ শিশু-কিশোরদের জন্য খুলে দেয়ার দাবিতে বেশ কিছুদিন ধরে সমাবেশ, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করছে কলাবাগান এলাকাবাসী। এ সমাবেশগুলোয় তারা মাঠ রক্ষার জন্য নানা স্লোগান দিচ্ছে। শিশু-কিশোরসহ সব বয়সের মানুষের স্লোগানে পুরো এলাকা মুখরিত হয়ে উঠছে। মাঠ রক্ষার এ আন্দোলনের গভীরে যাওয়ার আগে তেঁতুলতলা মাঠ আর এ মাঠে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা করার অধিকার ব্যাহত করে থানা নির্মাণের পটভূমি সম্পর্কে আমরা একটু জেনে আসি।

বৃহত্তর কলাবাগান (উত্তর ধানমন্ডি, লেক সার্কাস, বশির উদ্দিন রোড, কলাবাগান প্রথম ও দ্বিতীয় লেন) এলাকায় একমাত্র খেলার মাঠ এটি। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই উত্তর ধানমন্ডিতে অবস্থিত একটি উন্মুক্ত খেলার মাঠ হিসেবে পরিচিত তেঁতুলতলা মাঠ। কিন্তু এখানে বর্তমানে কলাবাগান থানার নিজস্ব একটি বহুতল ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাই এলাকাবাসী মাঠ রক্ষায় আন্দোলনে নেমেছে এবং মাঠ রক্ষায় সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনায় মানববন্ধনসহ বিভিন্ন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছে।

তেঁতুলতলা মাঠটি কলাবাগানের শিশুদের খেলাধুলা করার অন্যতম স্থান, অনেকের জন্যই একমাত্র স্থানও বটে। কলাবাগানের প্রবীণ অনেক ব্যক্তিরই জীবনের সুদীর্ঘ সময় এ মাঠে খেলাধুলা করে কেটেছে। এ মাঠের সঙ্গে এলাকাবাসীর স্মৃতি ও আবেগ জড়িত, রয়েছে অনেক ইতিহাস। এ মাঠে খেলাধুলার পাশাপাশি ঈদের জামাত এবং এলাকার মৃত ব্যক্তিদের জানাজা হয়। পাশাপাশি প্রতি বছর বিভিন্ন উৎসবে সবার অংশগ্রহণে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। সত্তরের দশক থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মহল মাঠটি দখল করার চেষ্টা করলেও এলাকাবাসী তা প্রতিহত করে। এ দীর্ঘ ৫০ বছরে যারা মাঠটি রক্ষায় এগিয়ে এসেছিল, কম-বেশি তাদের প্রত্যেককে নানা হয়রানির শিকারও হতে হয়েছে।

এই হলো তেঁতুলতলা মাঠের ইতিহাস আর পটভূমি। এ বাস্তবতায় শোনা গেছে ঢাকার কলাবাগান এলাকার তেঁতুলতলা মাঠে থানা নির্মাণ করা হবে, কাঁটাতারের বেড়া পড়েছে মাঠের চারপাশ ঘিরে। আরো চাউর হয়েছে মাঠে খেলতে চাওয়ার মারাত্মক অপরাধে কারা জানি কান ধরে উঠবস করিয়েছে কোমলমতি শিশুদের। সত্যিই তো, কী জঘন্য অপরাধ। এই অল্প বয়সে মাঠে খেলাধুলা করতে চায় শিশুরা! এ কী কলির কাল, কান ধরে উঠবস করা ছেলেরা বুঝে গেছে এই অল্প বয়সে খেলতে চাওয়াটা এক মস্ত বড় পাপ। তাই তারা বিনা প্রশ্নে কান ধরে উঠবস করে বলতে বাধ্য হয়েছে, ‘পাপ হয়েছে আমাদের, আমরা আর খেলব না। আমরা আর কখনই খেলার কথা মুখেও আনব না।’

সবাই একথা শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। যাক, অবশেষে জাতি এক মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা পেল। নগরের খেলতে চাওয়া শিশুরা তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে, এটাই চরম প্রাপ্তি। এদিকে এই নতুন মন্ত্রে দীক্ষিত শিশুরা তাদের প্রকৃতি, পৃথিবীকে ভুলে গিয়ে মুঠোফোন আর ট্যাবলেটের পরাবাস্তব জগতে গিয়ে মনের দুঃখ, ক্লান্তি আর বিষণ্নতা কাটানোর উপায় খুঁজতে মগ্ন হলো। মুঠোফোনের এ জগৎ বড়ই অদ্ভুত। এ জগতে তাদের খেলায় উৎপাত করার কেউ নেই। দুই হাত দিয়ে কানের কোমল লতি স্পর্শ করে জমিনের নিচে নেমে উপরের আকাশের শূন্যতার দিকে অপলক চেয়ে ধীরলয়ে ওঠার সময় অপমানবোধের গ্লানি নিয়ে বেঁচে থাকার লজ্জাবোধের যন্ত্রণাও নেই স্মার্ট ডিভাইসের এ রঙিন জগতে...।

এই যে কোমলপ্রাণ আমাদের আদরের তুলতুলে শিশুরা আর পেঁজা তুলোয় ভাসতে থাকা তাদের স্বপ্নের শৈশব—কী দারুণ মুগ্ধতা-জাগানিয়া সময়। প্রাণ-প্রকৃতির সান্নিধ্যে, খেলার মাঠের দাপাদাপিতে, বন্ধুতা পাতানোর আনন্দে পৃথিবীকে ভালোবাসার সময়। এরই মাঝে খেলার মাঠ শৈশবের জমিনের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুক্তো। অথচ আমাদের শিশুদের ইট-পাথরের কংক্রিটের খাঁচায় বন্দি করে দিয়ে আমরা উন্নয়ন আর সুখ খুঁজে ফিরছি। নগরে আমরা শিশুদের সুযোগ করে দিতে পারিনি খেলাধুলা করার কিংবা সবুজের পরশ মেখে বেড়ে ওঠার। এ ব্যর্থতার দায়ভার আমরা কীভাবে লুকোই।

তেঁতুলতলা মাঠ! হয়তো কোনো কালে এখানে তেঁতুল গাছ ছিল, আজ সেই তেঁতুল গাছ নেই, তেঁতুল পাতার চাদরে মাখা ভালোবাসাও নেই এর প্রাণহীন শহরে। যে মাঠ নিয়ে এত কথকতা, আপনি যদি শিশুদের প্রাণপ্রিয় এ মাঠ দেখার পরিকল্পনা করেন, তবে বলছি পরিকল্পনাটি অত্যন্ত হূদয়বিদারক। ‘খেলার মাঠ’ শব্দযুগল শুনেই যে হূদয় আন্দোলিত স্থানের কথা আপনি ভাবছেন, আদতে সেটা একটি ধূলিমলিন স্থান, সবুজের কোনো চিহ্নও সেখানে আপনি পাবেন না। এটাকে আপনার আদরের সন্তানের খেলার জায়গা ভাবতে গিয়ে আপনি বিস্ময়ে আঁতকে উঠবেন। কোনো উন্নত দেশের অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকা জায়গাও এর চেয়ে সুন্দর হয়। অথচ কী বিস্ময়কর বিষয়, এই ধূলিময় মাঠে একটু খেলার আকুতি জানিয়ে আমাদের প্রাণের শিশুদেরও রাজপথে নামতে হয়।

আমরা নির্বাক হয়ে অপেক্ষা করছি, আমাদের শিশুরা আসক্ত হবে স্মার্টফোনে, না-হয় রঙিন নেশার মাদকে, গুণ্ডা নয়তো সন্ত্রাসী হবে। আর না-হয় হবে অবসাদগ্রস্ত-বিষণ্ন, তাদের কেউ হয়তো ছাদ থেকে পৃথিবী স্পর্শ করার লোভে আত্মাহুতি দেবে, কেউবা অচেতন রশিতে ঝুলে রইবে। কেউবা হবে কিশোর গ্যাংয়ের নায়ক, আহারে আমাদের প্রাণের শিশুর ভবিষ্যতের মালা আমরা কী নিদারুণ যত্নেই না প্রাণপণে গেঁথে চলেছি; এ কী প্রাণসংহারী মালা! মহাদুর্যোগের ঘণ্টাধ্বনি কি আমরা শুনতে পাই?

আমাদের শিশুরা জানে না, নগর সাজানোর পরিকল্পনায় দুই থেকে তিন হাজার মানুষের জন্য ন্যূনতম একটা খেলার মাঠ তৈরি করতে হয়, যার আয়তন এক একরের (তিন বিঘা) মতো হওয়ার কথা। আমাদের তেঁতুলতলা মাঠ টেনেটুনে এক বিঘার মতোও হয় না; যার ধূলিমলিন দীনহীন রূপের কথা না-হয় ভুলেই যাই। আমাদের অতি ঘন এলাকা কলাবাগানে ৩০ হাজারের মতো মানুষের বসবাস, সেখানে কয়েক হাজার হতভাগ্য শিশুর বসবাস। প্রতি ৫ হাজার মানুষের জন্য একটি খেলার মাঠ দেয়া হলেও এ এলাকায় ছয়টি খেলার মাঠ থাকার কথা, আকার-আয়তনে যা ৬ থেকে ১০ একর হওয়ার কথা। এসব নগর সাজানোর বইয়ের কথা আমাদের কোমলমতি শিশুরা জানে না, যেমন জানে না আমাদের প্রাণের রাষ্ট্র। সেইসব স্বপ্নের নগরের কথা আপাতত বাদ থাকুক, বাস্তবতার জমিনে আমাদের তেঁতুলতলা মাঠের আশপাশের শিশুদের প্রাণের দাবি, তারকাঁটার বেড়ার অর্গল খুলে দেয়া হোক। এই ধূলিমলিন মাঠেই তারা মেতে উঠুক খেলাধুলার উদ্দাম আনন্দের ঝরনাধারায়।

আর তা যদি না হয়, রাষ্ট্র যদি এ শিশুদের জন্য উপযুক্ত পরিমাণ খেলার জায়গা না তৈরি করতে পারে, তবে সেজন্যও পরিকল্পনার সমাধান আছে। একটা নগরে তো থানাও প্রয়োজন, থানার জন্য পর্যাপ্ত জায়গাও প্রয়োজন। আর খেলাধুলাবিহীন দৈহিক ও মানসিকভাবে দুর্বল, পঙ্গু, বিপর্যস্ত, পথহারা, দিগ্ভ্রান্ত প্রজন্মের জন্য এ এলাকায় একটি থানা কখনই পর্যাপ্ত হবে না। এ এলাকাতেই প্রয়োজন হবে মাদকাসক্ত, সন্ত্রাসী, অপরাধী ও বিপথগামীদের জন্য অনেক থানা। রাষ্ট্রকে এ আয়োজনের প্রস্তুতিও এখন থেকেই নিতে হবে।

আমরা ফিরে যাই তেঁতুলতলা মাঠের দাবি নিয়ে রাজপথে দাঁড়ানো আমাদের আদরের শিশুসন্তানদের ব্যানারের মুক্তোর মতো জ্বলজ্বলে হরফে লেখা দাবিগুলোর দিকে—খেলার জন্য মাঠ চাই, এই তেঁতুলতলা মাঠ আমাদের প্রাণের দাবি-সমগ্র কলাবাগানবাসীর দাবি, তেঁতুলতলা মাঠ আমাদের নির্লোভ নিঃস্বার্থ দাবি, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের জন্য একটি নির্মল সুস্থ প্রয়াস, মানসিক বুদ্ধিবৃত্তি ও শারীরিক বিকাশ অর্জনে একটি কঠিন লড়াই, তেঁতুলতলা মাঠ আমাদের যৌক্তিক, মানবিক ও নিঃস্বার্থ দাবি, আমাদের প্রাণ থাকতে ভূমিদস্যুরা তেঁতুলতলা মাঠ ছিনিয়ে নিতে পারবে না, একটি মাঠের খোলা আকাশ-ঘটায় শিশুর বৃদ্ধি বিকাশ, খেলার জন্য মাঠ চাই-তেঁতুলতলার দাবি তাই।

আমাদের বলিষ্ঠ ও আন্তরিক দাবি ঢাকাসহ বাংলাদেশের সব দখলকৃত, বদ্ধ ও সাধারণের জন্য আটকে রাখা খেলার মাঠগুলো খুলে দিতেই হবে। আর সব এলাকায় শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য এখনই পরিকল্পনা করে পর্যাপ্তসংখ্যক খেলার মাঠ তৈরি করতে হবে। তা না হলে এ শিশুদের কাছে আমরা কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারব না।

আমাদের প্রিয় রাষ্ট্র কি সোনার হরফে লেখা কলাবাগানের তেঁতুলতলার শিশুদের প্রাণের আবেগের হরফগুলো পড়তে পারছে? তেঁতুলতলাবাসীর মতোই আমাদের সবার প্রত্যাশা আবার আমাদের তেঁতুলতলা মাঠ তারুণ্যে সবুজ হয়ে উঠবে। পাশাপাশি আমাদের সোনার বাংলার সব খেলার মাঠ দখলমুক্ত হয়ে শিশু-কিশোর-তরুণদের কলকাকলি আর প্রাণের উচ্ছ্বাসে মুখরিত হয়ে উঠবে।

  • অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান: নগর পরিকল্পনাবিদ, নির্বাহী সভাপতি, ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি); অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়



  এ বিভাগের অন্যান্য