www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

কৃষি উৎপাদনে পরিসংখ্যানে বস্তুনিষ্ঠতার গুরুত্ব


 আবু হেনা ইকবাল আহমেদ    ২৯ মার্চ ২০২২, মঙ্গলবার, ৯:১২   সম্পাদকীয় বিভাগ


কোনো বড় ঘটনা বা বছর শেষে পত্রপত্রিকা, ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় অথবা সভা-সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে লেখা-পড়া-বলায় কমবেশি তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন বক্তব্যকে বস্তুনিষ্ঠ করে তোলে। বিজ্ঞানচর্চা বা বাস্তব জীবনেও তথ্য-উপাত্তের ব্যবহার অজস্র। পরিসংখ্যানের এসব বিষয়-আশয় তাই সমসাময়িক জীবনযাত্রার অনুষঙ্গ। এর যে কী অমিত শক্তি, তার প্রামাণ্য দলিল ইতিহাসের মোড় ঘোরানো ১৯৭০-এর নির্বাচনের ঐতিহাসিক পোস্টার—‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন?’

তত্ত্বানুসারে পরিসংখ্যান এমন এক গাণিতিক বিজ্ঞান, যা মূলত উপাত্ত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা ও উপস্থাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত। মৌলিক বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, মানবিক এবং আরো নানা শাখায় এর বহুমাত্রিক ব্যবহার প্রচুর। উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তা থেকে তথ্যসমৃদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরিসংখ্যানের ভূমিকা অপরিহার্য। যেকোনো ধরনের গবেষণা ও উপস্থাপনের জন্য পরিসংখ্যানের মৌলিক জ্ঞান থাকা আবশ্যক। তবে জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে পরিসংখ্যানের অপব্যবহারও হয় যত্রতত্র।

বাস্তবতার নিরিখে বর্তমান বিশ্বে পরিসংখ্যান এমন একটি স্বীকৃত বিজ্ঞান, যার ওপর ভিত্তি করে দেশ, জাতি, করপোরেট বিশ্বের যত সব ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। পরিসংখ্যানহীন যেকোনো তথ্য-উপাত্ত, বিশ্লেষণ এমনকি সিদ্ধান্তও এখন একেবারেই অচল। পরিসংখ্যানের প্রচুর ব্যবহার রয়েছে আধুনিক কৃষির অঙ্গনেও। যদিও আমাদের খেটে খাওয়া আপামর কৃষক এর খুব একটা তোয়াক্কা করেন না। তারা নিজের চাহিদা মেটাতে বা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন ফসল উৎপাদনে। রাতদিন খাটেন নিজস্ব ভাবনা থেকে।

অধিকাংশ কৃষকই জমিতে বীজ, সার, বালাইনাশক ও সেচের পানি প্রভৃতির জোগান দেন অনুমানের ওপর নির্ভর করে। অনেকটা গৃহিণীর রান্নায় লবণ-মসলা ব্যবহারের অনুরূপ, আন্দাজে ভর করে। বণিকের মতো কাঁটা ধরে নিক্তিতে মেপে মেপে নয়। ভাবনায় আসে না তারা নির্দিষ্ট পরিমাণে বীজ, সার ও সেচের পানি কেনেন গুনে গুনে টাকা খরচ করে। কিন্তু ব্যবহারকালে তার সঠিক পরিমাণ আমলে নেন না। কিন্তু তাদেরই উৎপাদিত ওই পণ্য বিক্রয়কালে এর ওপর আরো কিছু ফাউ বা উপরি দেন, খুশি মনে। বেশি দিয়ে হাত ঝাড়া দিয়ে দায়মুক্ত হন। অনেকটা সেরের ওপর সোয়া সের প্রদান। এখনো গ্রামাঞ্চলের হাটবাজারে, আড়তে বা ফড়িয়াদের কাছে ধান-চাল-আলু প্রভৃতি বিক্রয়কালে ৮০ সের/কিলো পণ্যের দামে দিতে হয় ৮৫ সের/কিলো বা তার চেয়ে বেশি পণ্য। সনাতন কথা—কাঁচামাল শুকিয়ে কমে, পরিবহনে ঘাটতি আছে, আরো কত সব। উল্লেখ্য, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৫৫ থেকে ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত সাঁওতাল বিদ্রোহের বড় একটি কারণ জোরপূর্বক কৃষিপণ্যের ফাউ বা উপরি নেয়ার সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া।

প্রাণীর দুটি চোখ থাকাই স্বাভাবিক। এর জের ফের একচোখা জীব দানব ও ত্রিনয়ন দেবতাতুল্য। দুচোখা মানুষের একচোখা দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বাভাবিক ধরা হয় না। কৃষিতেও পরিসংখ্যানের নজির ভূরি ভূরি। একফসলি, দোফসলি বা তেফসলি জমি কিংবা এক পশলা বৃষ্টি। খনার বচন, ‘ষোল চাষে মূলা/ তার অর্ধেক তুলা/ তার অর্ধেক ধান/ বিনা চাষে পান’ ইত্যাদি।

তবে পরিসংখ্যান ও অনুমানের মাঝে ফারাক অনেক। পরিসংখ্যানের পেছনে বিজ্ঞানসম্মত উপাত্ত নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকে। আর অনুমানে থাকে পুরুষানুক্রমে অর্জিত সংস্কার ও ধ্যান ধারণা। যাতে বিজ্ঞানের আলোর চেয়ে অন্ধ-তমসার কুহেলিকাই বেশি। আধুনিক কৃষি পরিসংখ্যানভিত্তিক, থাকে বিজ্ঞানসম্মত তথ্য-উপাত্ত। কিন্তু অনেক কৃষকই অনুমানের ওপর ভরসা করে মাঠে নামেন। আদিকালের খনাই এখনো বাংলার অধিকাংশ কৃষকের কাছে তথ্যবিজ্ঞানী এবং শেষ ভরসা।

খরা-বন্যার উপাত্ত ও পরিসংখ্যান মাথায় রেখে কৃষক মাঠে ফসল ফলান না। যদিও আগাম খরা বা বন্যার পূর্বাভাস সরকারিভাবে গণমাধ্যমে জানানো হয়। কিন্তু খুব কমই তা মানা হয় বা মানা যায়। সরকারি তথ্য এখনো বিবিসির খবর বা চায়ের কাপে ধোঁয়া ওঠার মতো জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। এর পেছনে নানা কারণ ও বাধা রয়েছে, যার অনুসন্ধান ও সমাধানের সুযোগ আছে। তবে কৃষকের এমন মনোভাবের পেছনে যুক্তি—মৌসুম চলে গেলে, ফসল না হলে, পেটে দেবে কী বা সংসার চলবে কী করে ইত্যাদি। তাই দোদুল্যমান কথার ওপর আস্থা রাখার চেয়ে নিজের বুঝে ঠকে, বাকিটা নিয়তির ওপর ছেড়ে দিয়ে তারা মাঠে নামেন। ওরা মৌসুমের ট্রেন ফেল করতে চান না। আসন না পাওয়া যাক, ঝুলে বা ছাদে চড়ার ঝুঁকিতে তারা অভ্যস্ত ও প্রস্তুত। রবীন্দ্রনাথের সে গানের মতো—‘যেতে যেতে একলা পথে/ নিবেছে মোর বাতি।/ ঝড় এসেছে, ওরে, এবার/ ঝড়কে পেলেম সাথী।’

পরিসংখ্যাননির্ভর উন্নত বিশ্বের কৃষি এগিয়ে যাচ্ছে চালে ও চলনে সুনির্দিষ্ট রীতিনীতিতে। তারা খাবারও খায় ভেবেচিন্তে, মাত্রানুসারে। আমাদের কৃষক জমিতে পা ফেলেন অনুমানের ওপর ভরসা করে। তাই কখনো পচা শামুকে পা কাটে, কাঁটা বিঁধে, কখনোবা সাপের ছোবলে প্রাণ হারান। অনেক সময় অনুমাননির্ভর ফলানো ফসল মাঠেই মারা যায়। পুষ্টি ও ক্যালরির চেয়ে খাবারে প্রাধান্য রাখে মুখের স্বাদ আর পেট ভরানোর মানসিকতা। ইদানীং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির হাওয়া আমাদের কৃষির পালেও দোলা দিতে শুরু করেছে। তবে এর গতি এখনো বেশ মন্থর।

আমাদের কৃষকরা ফসল আবাদে দেখেন কাছের জন কী করে। তা দেখে তিনিও রোপণ করেন ধান, আলু; বপন করেন পাট, সবজির বীজ। এতে বাজার চাহিদা বা পরিসংখ্যান তেমন প্রাধান্য পায় না। আশায় বুক বেঁধে ফসল ফলানো শেষে অবিবেচনার কারণে বাজারে কৃষিপণ্য উৎপাদন খরচের চেয়ে কম মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য হন। যাকে বলে পানির দামে বেচা। ধরা হয় না শ্রমের ঘাম, হালের দাম প্রভৃতি। ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামাও ভালো’—এ প্রবাদ বাক্যই তখন ভরসা। কখনো বাজারে বা জমিতে থেকেই বিনষ্ট হয় শ্রম-ঘামে উৎপাদিত ফসল। অবিক্রীত সবজি পশুকে খাইয়ে, পাটের স্তূপে আগুন জ্বালিয়ে মনের জ্বালা মেটানোর নজির কম নয়। সাথিরা দর্শক হয়ে তা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। আর বলাবলি করে কপাল পোড়া, নসিবে নাই, আরো কত কী।

আমাদের মাঠের সঙ্গে দপ্তর, পরিদপ্তর, অধিদপ্তর এমনকি মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে অমিল ব্যাপক। তার নজির সঠিক পরিসংখ্যানের ওপর আমল না দেয়া পরিকল্পনার পরীকল্পনায় থেকে যাওয়া। একটি নমুনার হিসাব বিভিন্ন দপ্তরের পাওয়া তথ্য থেকে মেলানো সোজা আঙুলে ঘি তোলার মতো কঠিন। কখনো তা শঙ্কাজাগানিয়া। কৃষি পরিসংখ্যানও এর ব্যতিক্রম নয়। মাঠে ফসল উৎপাদনে কৃষকদের সঙ্গে কৃষি পরিসংখ্যান, খাদ্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে ব্যবধান চোখে পড়ার মতো।

যেমন বিদ্যমান সেচযন্ত্র বা সেচাধীন জমির পরিসংখ্যান মাঠের সঙ্গে বিএডিসি, বিএমডিএ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি, ডিএই, পরিসংখ্যান অধিদপ্তরে উপাত্তে মিল পাওয়া দুষ্কর। দ্বন্দ্ব ও ধন্ধ দেখা দেয়; কোনোটা উপাত্তনির্ভর, কোনোটা আন্দাজে ভর করা। তা খালের পানির পরিমাপ গড় করে মাঝখানে গিয়ে ডোবার গল্পের মতো। শেষ অবস্থা দাঁড়ায়, ‘বারোয়ারি ঘর, আল্লাহ রক্ষা কর।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) কৃষি পরিসংখ্যানে জমির হিসাব দেয় একরে; ফলন দেখায় কিলোগ্রামে এবং উৎপাদন টনে। উপজেলা পর্যায়ে তাদের মাঠের জনবল সীমিত। মাঠ পর্যায়ে ফলনের হিসাব নিরূপণ করা হয় গুচ্ছাকারে, বৃত্তাকার পদ্ধতিতে শস্য কর্তনের মাধ্যমে। নমুনা সুনির্দিষ্ট।

পক্ষান্তরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সে জমির হিসাব দেয় যথাক্রমে হেক্টরে; ফলন ও উৎপাদন উল্লেখ করে টনে। প্রতি ইউনিয়ন গড়ে তিনটি ব্লকে বিভক্ত। প্রতি ব্লকের জন্য একজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা। যদিও অধিক জনবল সঠিক তথ্য প্রদানের নিশ্চয়তা দেয় না। ফলনের হিসাব নিরূপণ করা হতো জমিতে নির্দিষ্ট বর্গমিটারে শস্য কর্তনের মাধ্যমে। ইদানীং বৃত্তাকার পদ্ধতিতে শস্য কর্তন প্রথা প্রবর্তন করা হয়েছে। নমুনার পরিমাণ বহুমাত্রিক।

আবাদি জমি, প্রতি একর/হেক্টরে ফলন ও উৎপাদনের বিষয়ে দুটি নির্ভরযোগ্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পার্থক্য আগের চেয়ে অনেক কমে এলেও বর্তমান পার্থক্যও নেহাত কম নয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বোরো ধানের আবাদি জমির তুলনামূলক পরিসংখ্যানের চেয়ে বিবিএসের জমি ৯ হাজার ৯৭৩ হেক্টর অধিক। পক্ষান্তরে ফলন পার্থক্য বিবিএসের চেয়ে ডিএইর হেক্টরপ্রতি শূন্য দশমিক ১২ টন এবং উৎপাদন পার্থক্য ৫ লাখ ৩৬ হাজার ৪০০ টনের অধিক। সঠিক নীতিনির্ধারণে এর প্রভাব ও কার্যকারিতায় জটিলতা সহজে অনুমেয়।

সঠিক তথ্য-উপাত্ত দিয়ে অনুমানের বেড়াজাল থেকে কৃষি পরিসংখ্যানকে বের করে আনা আবশ্যক। নির্ভরযোগ্য ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়নে এবং দিগ্দর্শনের জন্য যা অপরিহার্য। সুষ্ঠু পরিসংখ্যানই নিরসন করতে পারে ফসল উৎপাদন, আমদানি কিংবা রফতানিসহ বহু কাজের বিদ্যমান বিভ্রান্তি বা বিব্রতকর পরিস্থিতি। কৃষক থেকে রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত এখনো রয়েছে পরিসংখ্যানের ওপর আস্থার শঙ্কা ও সংকট। এর দ্রুত অবসান ঘটানো প্রয়োজন।

আস্থানির্ভর পরিসংখ্যান যেমন রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ে ভিত্তিরূপে ব্যবহার জরুরি, তেমনি সাধারণ কৃষকের কাছেও খনার বচনের মতো গুরুত্ববহ। বস্তুনিষ্ঠ কৃষি পরিসংখ্যান যেন দেশের এবং কৃষকের জন্য খনার বচনের উপমায় সমহারে নিত্যপালনীয় ও পাথেয় হয়ে ওঠে। হয়ে উঠুক আরো নির্মোহ ও অমোঘ। সেটাই প্রত্যাশা।

  • আবু হেনা ইকবাল আহমেদ: কৃষিবিদ; সাবেক পরিচালক
  • বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, কৃষি মন্ত্রণালয়



  এ বিভাগের অন্যান্য