www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

কৃষকের আত্মহত্যা: বাংলাদেশে অভিনাথ-রবি মারানডির বিষপান


 রুহিনা ফেরদৌস    ২৯ মার্চ ২০২২, মঙ্গলবার, ৯:১৪   সম্পাদকীয় বিভাগ


ইউটিউবে ‘ইন্ডিয়ান ফারমার্স সুইসাইড’ লিখে সার্চ দিলে গুজরাটের ধুনিয়ার ওপর নির্মিত ৪ মিনিট ১২ সেকেন্ডের একটা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র চলে আসে। তাতে দেখা যায় আট-নয় বছরের ছোট কিশোরী মেয়েটি স্কুলে না গিয়ে লুকিয়ে তার বাবাকে অনুসরণ করছে। বাবা কোথায় যাচ্ছে? মাঠে গিয়ে ক্ষেতের কাজ করছে তো? রোজ রোজ মেয়েটি তার বাবাকে এভাবে লুকিয়ে চোখে চোখে রাখে। বাড়িতে লম্বা মোটা দড়ি দেখে সে তাও লুকিয়ে ফেলে। মেয়েটির ভয় বাবা তার আত্মহত্যা না করে বসে।

গুজরাটের ধুনিয়াসহ অন্যান্য অঞ্চলের টানা খরার জন্য বছরের পর বছর ফসলহানির ফলে কৃষকরা ঋণে জর্জরিত হয়ে উপায় না পেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। ঋণ আর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভারতের কৃষকরা এ পরিণতি বরণ করছেন কয়েক দশক ধরে। ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর পরিসংখ্যান তথ্য অনুসারে, শুধু ২০১৯ সালেই দেশটিতে ৪২ হাজার ৪৮০ জন কৃষক ও দিনমজুর আত্মহত্যা করেছেন। ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আত্মহত্যা করেছেন তিন লাখ কৃষক।

গত বৃহস্পতিবার (২৪ মার্চ) বাংলাদেশের রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার নিমঘটু গ্রামের সাঁওতাল কৃষক অভিনাথ মারানডি ও তার চাচাতো ভাই রবি মারানডি বিষপান করে আত্মহত্যা করেন। পরিবারের দাবি, ধানখেতে সেচের পানি না পেয়ে দুই ভাই বিষপান করেন। দিনের পর দিন অভিনাথ মারানডি ও রবি সেচের পানির জন্য অপারেটরের দ্বারস্থ হলেও ফসল রক্ষার জন্য পানি দেয়া হয়নি তাদের।

ঘটনার পর অভিনাথ মারানডির মা সোহাগী সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘১২ দিন ঘুরেও যখন ফসল রক্ষার জন্য অভিনাথ পানি পাননি, তখন তিনি অপারেটরকে বলেন, পানি না দিলে আমি কিন্তু বিষ খেয়ে মরে যাব’ (সূত্র: প্রথম আলো)। বিষপানেই মৃত্যু হয়েছে অভিনাথের। হ্যাঁ, শেষমেশ পরিস্থিতি তাকে বিষপানের দিকেই ঠেলে দিয়েছে। একজন কৃষক কতটা নিরুপায় হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন, বোধকরি তা বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

টানা ফসলহানি, সেচের পানির দুষ্প্রাপ্যতা, ফসল তোলার পর ন্যায্যমূল্য না পাওয়া—সেখানেও মিলার-মধ্যস্বত্বভোগীদের রাজত্ব, দেশে সবকিছুর দাম বাড়ে, ধানের দাম বাড়ে না—এমন কোণঠাসা পরিস্থিতিতে ক্রমে দেয়ালে পিঠ ঠেকতে ঠেকতে এক চুল জায়গাও আর বাকি নেই এসব দরিদ্র কৃষকের।

তাই আশঙ্কা জাগে অচিরেই কি ভারতের কৃষকদের সঙ্গে আমাদের কৃষকদের আত্মহত্যার পরিসংখ্যান গণনায় বসতে হবে? হতেও পারে যদি আমরা এখন থেকে উদ্ভূত পরিস্থিতির দিকে নজর না দিই। আমাদের দরিদ্র কৃষকরা আত্মহত্যা কেন করছেন—এ রোগটি খুঁজে বের না করি।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ, দেশের দক্ষিণাঞ্চল যেমন লবণাক্ততায় আক্রান্ত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে। তেমনি বরেণ্য অঞ্চলে পানির সংকট তৈরি হয়েছে কৃষিতে ব্যবহারের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি বেশি বেশি উত্তোলনের কারণে। রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের জের ধরে নিয়মিত বৃষ্টিপাতের অভাবও। যেমনটা ভারতের মহারাষ্ট্রের কৃষকরা হয় টানা খরা নতুবা অসময়ে বৃষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ভারতের বেশির ভাগ কৃষকই ফসলহানিতে চরম ঋণগ্রস্ত হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন। তাছাড়া ত্রুটিপূর্ণ চাষের ধরন, চাষের খরচের ক্রমাগত বৃদ্ধি, ঋণের প্রকৃতি ও অপ্রচলিত জায়গা থেকে ঋণগ্রহণের বিষয়গুলোও রয়েছে সেখানে।

আমাদের বরেন্দ্র অঞ্চল রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১২৪টি উপজেলা নিয়ে। গবেষকরা বলছেন, কৃষিতে ব্যবহারের জন্য বরেন্দ্র এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি বেশি উত্তোলন করায় পানির স্তর গড়ে প্রায় দুই ফুট নেমে যাচ্ছে। পানির সংকট তৈরি হয়েছে। তাছাড়া কিছু এলাকায় পানির স্তর এতটাই নেমে গেছে যে গভীর নলকূপ ব্যবহার করেও ভূগর্ভস্থ পানি মিলছে না। পানির দুষ্প্রাপ্যতায় বিভিন্ন এলাকায় ফসলের আবাদ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি পানি নিয়ে সংঘাত-মারামারিও করতে হয়েছে সেখানের মানুষদের। পানি না পেয়ে এলাকা ছাড়ছেও অনেকে।

১৯৮৫ সাল থেকে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) এ অঞ্চলে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার শুরু করে। কিন্তু ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে সরকার নীতিগতভাবে কৃষিকাজের জন্য আর ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর থেকে বিএমডিএ নতুন করে আর নলকূপ বসাচ্ছে না। তবে ব্যক্তিমালিকানায় গভীর নলকূপ এখনো বসানো হচ্ছে। এজন্য উপজেলা সেচ কমিটির অনুমতি নেয়ার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের (আইবিএস) গবেষণা অনুসারে, ১৯৮০ সালে পানির স্তর মাত্র ৩৯ ফুট নিচে ছিল। ২০১৬ সালে ১১৮ ফুট নিচে নেমে গেছে। এ এলাকায় ১০০ থেকে ১৫০ ফুট নিচে পাতলা একটা পানির স্তর পাওয়া যাচ্ছে। এ পানি হস্তচালিত বা গভীর নলকূপে উঠছে না।

গ্রীষ্ম মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির সংকট বেশি দেখা দেয়। অভিযোগ রয়েছে, এমন সময়ে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নলকূপ অপারেটররা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সেচের পানির জন্য দিনের পর দিন ঘোরাতে থাকেন; যার জের ধরেই হয়তো অভিনাথ ও রবি মারানডিকে জীবন দিতে হলো।

কৃষিকাজের জন্য দরিদ্র কৃষকের প্রয়োজনীয় পানি না পাওয়ার বিষয়টিতে কর্তৃপক্ষের যথাযথ নজরদারি প্রয়োজন। কেননা প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদে উঠে এসেছে গভীর নলকূপ অপারেটরদের কারসাজিতে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর ক্ষুদ্র কৃষকরা শুধু সেচের ন্যায্য পানি থেকেই বঞ্চিত হচ্ছেন না, ঘন ঘন ফসলের ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এভাবে কৃষকরা এমন এক মরণফাঁদে ঢুকে পড়ছেন যে একসময় আর পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে না পেরে বাধ্য হয় নিজের জমি বিক্রি করে দিতে বা অন্যের কাছে জমি লিজ দিতে হচ্ছে তাদের। কৃষিজমি হারিয়ে কৃষিকাজ ছেড়ে দিনমজুরে পরিণত হচ্ছেন কৃষকরা। অনেক ক্ষেত্রে নলকূপ অপারেটররা, যাদের অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাব আছে তারা এ জমিগুলো কিনে নিচ্ছেন।

তাহলে আমাদের দেশের এ অঞ্চলের কৃষকরাও কি ভারতের গুজরাট, কর্ণাটকের কৃষকদের মতো অদৃশ্য ফাঁদে পড়তে যাচ্ছেন?

এ অঞ্চলের পানি সংকটের সুযোগ নিয়ে নলকূপ অপারেটররা কি কৃষকদের শোষণ করছেন? শোষণ ও হয়রানির প্রতিবাদেই কি অভিনাথ মারানডি (৩৬) ও বরি মারানডি (২৭) বিষপান করলেন? কিংবা পানি দেয়ার ক্ষেত্রেও কি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে বৈষম্য করা হচ্ছে? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা জরুরি।

সেচের পানি সুষ্ঠু বিতরণের জন্য বিএমডিএ কৃষকদের স্মার্টকার্ড দিয়েছে। স্মার্টকার্ডে টাকা রিচার্জ করে নলকূপের ঘরে রাখা মেশিনে কার্ড পাঞ্চ করলে তাদের জমিতে পানি যাওয়ার কথা। কিন্তু কৃষকরা কেন দিনের পর দিন ভোগান্তিতে পড়ছেন?

রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষুদ্র কৃষকরা সারা বছরের খাবারের জন্য বোরো ধান আবাদ করেন। বোরো আবাদে অন্য যেকোনো ফসলের চেয়ে সেচের দরকার হয় বেশি। সেচের পানি নিয়ে এমন পীড়ন চলতে থাকলে অচিরেই আবার কোনো দরিদ্র ও বঞ্চিত কৃষক যে আত্মহননের পথ বেছে নেবেন না, তার নিশ্চয়তা কী?

তথ্য বলছে, সরকারের বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে ১৬ হাজার গভীর নলকূপ পরিচালনার জন্য অপারেটর নিয়োগ করে নলকূপগুলো থেকে বছরে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে। তাহলে কি নিয়োগকৃত অপারেটরা কৃষকদের পানি দেয়ার বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের উপায় তৈরি করছেন! যেমনটা ভারতের মহাজনরা করে চলেছেন ঋণ দেয়ার বিনিময়ে?

পানি না পেয়ে দরিদ্র কৃষক ফসলহানির ধাক্কা কতটা সামলাতে পারবেন? একটা সময় তারা বাধ্য হবেন ঋণগ্রহণে। ঋণের বোঝা, অতিরিক্ত সুদের বোঝা সামলাতে শেষমেশ হয় জমি বিক্রি করে পেশা বদল করবেন, না-হয় অভিনাথ ও রবির মতো আত্মহননের পথ বেছে নিতে হবে।

  • রুহিনা ফেরদৌস
  • সাংবাদিক



  এ বিভাগের অন্যান্য