www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

কৃষিজমি সুরক্ষায় নিবিড় গ্রামীণ বসতি


 এগ্রিবার্তা ডেস্ক    ৪ এপ্রিল ২০২২, সোমবার, ১:২২   সম্পাদকীয় বিভাগ


সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বেশকিছু অঞ্চলের গ্রামীণ এলাকার ড্রোন ইমেজ ও ভিডিও পর্যালোচনা শেষে একটা পুরনো শঙ্কা আরো গাঢ় হতে শুরু করল। দেশের গ্রামীণ এলাকার ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন হচ্ছে দ্রুততার সঙ্গে। রাস্তাঘাটের নেটওয়ার্ক যেমন বাড়ছে তার চেয়ে দ্রুত হারে বাড়ছে নতুন নতুন পাকা, সেমি-পাকা ঘরবাড়ি ও বসতি এলাকার সম্প্রসারণ। গ্রাম-গঞ্জ, হাট-বাজার, উপজেলা সদর ইত্যাদি এলাকায় যত্রতত্র পাকা বাড়িঘর-অবকাঠামো গড়ে উঠছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে প্রতিনিয়ত যেখানে সেখানে বাড়িঘর, শিল্প-কলকারখানা তৈরি হচ্ছে বটে, কিন্তু প্রয়োজনীয় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পানি সরবরাহ, ড্রেনেজ ইত্যাদির সুষ্ঠু ব্যবস্থা থাকছে না। উপজেলা সদর ও তার আশপাশের এলাকায় এ রূপান্তরের হার সবচেয়ে বেশি। ক্রমে অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে ওঠা এসব এলাকা নাগরিক সুবিধাহীন নগরের চরিত্র ধারণ করছে। তাই এখনই গ্রামীণ এলাকার পরিকল্পিত উন্নয়নে মনোযোগ দেয়া দরকার।

শুধু তা-ই নয়, প্রতিনিয়ত মূল্যবান কৃষিভূমি, জলাশয়, বনভূমি, পাহাড়সহ প্রাকৃতিক সংবেদনশীল এলাকা উন্নয়নের কবলে পড়ে সংকুচিত হচ্ছে। গ্রামীণ এলাকায় গুছিয়ে নিবিড় বসতি গড়ে তোলা গেলে ভবিষ্যতের অনেক সম্ভাব্য সমস্যা এখনই সমাধান করা যাবে। এক্ষেত্রে অধিগ্রহণ করে উন্নয়নের পরিবর্তে ভূমির পুনর্বিন্যাস (Land Readjustment) মডেল হতে পারে ভালো সমাধান। এমন বাস্তবতায় তিনটি বিষয় পরিষ্কার করা খুব প্রয়োজন। প্রথমত, গ্রামীণ এ রূপান্তরে পরিকল্পিত উদ্যোগ ও তার প্রয়োগ কতটা জরুরি? দ্বিতীয়ত, কী ধরনের উদ্যোগ এখানে সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে? তৃতীয়ত, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের কাজের জন্য কতটা প্রস্তুত আছে?

পরিকল্পিত গ্রামীণ বসতি উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষিজমির সুরক্ষার জন্য অধ্যাপক সেলিম রশিদ প্রায় দুই দশক আগে থেকে কম্প্যাক্ট হাউজিং গড়ে তোলার ব্যাপারে তাগিদ দিয়েছিলেন। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুসারে, গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে জনপ্রতি চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমতে কমতে এক-চতুর্থাংশে নেমে এসেছে। বর্তমানে জনপ্রতি চাষযোগ্য জমির পরিমাণ মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৪৮ হেক্টর। বছরে বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং কৃষিজমি হ্রাসের দুটি বিপরীত ধারা চলমান থাকলে দ্রুতই আমরা খাদ্যনিরাপত্তার হুমকিতে পড়ে যাব। তাই গ্রামীণ এলাকায় অকৃষিজ ভূমি ব্যবহার ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ভূমি ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ আনা প্রয়োজন।

জাতীয় গৃহায়ন নীতিমালা ২০১৬

বাংলাদেশ সরকারের ২০১৬ সালের ‘জাতীয় গৃহায়ন নীতিমালা’ গ্রামীণ এলাকায় মৌলিক সেবা ও অবকাঠামোসহ নিবিড় আবাসন তৈরির জন্য জোর দিয়েছে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য জরুরি ও জনকল্যাণকর প্রয়োজন ছাড়া জনগণকে বাস্তুচ্যুত করা যাবে না। অপরিহার্য ক্ষেত্রে অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে তাদের সার্বিক পুনর্বাসন পরিকল্পনা গ্রহণ করে বাস্তবায়ন করা হবে। এছাড়া কৃষিজমির ওপর বাড়ি-ঘর নির্মাণের প্রবণতা নিরুৎসাহিত করা হবে। গ্রামাঞ্চলে পরিকল্পিত নিবিড় আবাসন সৃষ্টির উৎসাহ ও নির্দেশনা দেয়া হবে। বিদ্যমান ও নতুন বসতিগুলোর মৌলিক সেবা অবকাঠামোগুলো যথা পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যসম্মত নিষ্কাশন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, রাস্তা ইত্যাদি এবং মৌলিক সামাজিক সুবিধাদি যেমন বিদ্যালয়, খেলার মাঠ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ইত্যাদি পরিকল্পিত ও সমন্বিতভাবে গড়ে তোলা হবে।

কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন

সারা দেশের ভূমির অপচয় রোধ করে তার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার ‘কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন’ শিরোনামে একটি আইনের খসড়া ২০১৫ সালে প্রস্তুত করা হলেও এখনো তা অনুমোদন করা হয়নি। খসড়ায় বলা হয়েছে, গ্রাম বা শহর নির্বিশেষে বাংলাদেশের সব জমির জন্য ভূমি জোনিং করতে হবে। ভূমির বৈশিষ্ট্য, বর্তমান ব্যবহার এবং গুণাগুণ বিশ্লেষণ করে জোনিং ম্যাপ প্রস্তুত করতে হবে। এ জোনিং ম্যাপকে পরিকল্পনা হাতিয়ার (প্ল্যানিং টুল) হিসেবে বিবেচনা করে ভূমি ব্যবস্থাপনা করবে। জোনিং ম্যাপে চিহ্নিত ভূমি ব্যবহারের শ্রেণীর ব্যত্যয় বা পরিবর্তন করা যাবে না। জনবহুল এ ছোট্ট দেশে ভূমির সুষ্ঠু ও সর্বোত্তম ব্যবহারের স্বার্থে এ আইনের অনুমোদন ও প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি।

অধিগ্রহণ করে উন্নয়নের অভিজ্ঞতা

শহরে পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গড়ে তুলতে ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। পরে রাস্তাঘাট ও অন্যান্য অবকাঠামো ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করে বাজারে প্লট বিক্রি করা হয়। বিভিন্ন শহরে ন্যাশনাল হাউজিং অথরিটি অথবা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলো এলাকা অধিগ্রহণ করে সেখানে প্লটিং করে উত্তরা, ধানমন্ডি বা গুলশানের মতো পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা তৈরি করে। এ পদ্ধতিতে উন্নয়নের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল ও একসঙ্গে অনেক অর্থের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তাছাড়া আবাসন প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের পুরো বিষয়টি অমানবিক হিসেবে ধরা হয়। কারণ একটা এলাকায় দীর্ঘদিন থেকে বসবাসরত মানুষকে ভিটাবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে উন্নয়ন প্রকল্প তৈরির মাধ্যমে অন্য মানুষের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করার বিষয়টি অমানবিক হিসেবে দেখা হয়।

বর্তমানে সংশোধিত ‘স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন ২০১৭’ অনুসারে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বাজারদরের তিন গুণ ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। ফলে অধিগ্রহণ করে উন্নয়ন প্রক্রিয়ার ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। আবার প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে প্লটের দামও অনেক বেড়ে যায়। তাহলে উপায় কী? এক্ষেত্রে জমির প্রকৃত মালিকরা নিজস্ব উদ্যোগে পুনর্বিন্যাস করে পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা তৈরি করতে পারে।

ভূমির পুনর্বিন্যাস ও নিবিড় আবাসন

প্রথমত, গ্রামীণ এলাকায় অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ‘পরিকল্পিত নিবিড় আবাসন’ গড়ে তুলতে রাজি আছে এমন জমির মালিকদের সংগঠিত করতে হবে। অংশগ্রহণকারী জমির মালিকদের নিয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটি বা দল তৈরি করা হবে। যেখানে জমির মালিক, স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সরকারি সংস্থা—যেমন উপজেলা পরিষদ, স্থানীয় সরকার বা অন্য কোনো একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করবে। মালিকরা তাদের জমির মালিকানা সাময়িকভাবে ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে হস্তান্তর করবে এবং সব জমিকে একত্রীকরণ করা হবে।

তারপর সেখানে রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ, খেলার মাঠ, পার্ক, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সামাজিক ও নাগরিক পরিষেবাসহ আবাসনের পরিকল্পনা করা হবে। এখানে জমি প্রদানকারী মালিকদের জন্য ৫০ শতাংশ সমপরিমাণ প্লট, ৩০ শতাংশে রাস্তাঘাট, সামাজিক ও নাগরিক অবকাঠামো এবং বাকি ২০ শতাংশ জমি সংরক্ষণ করা হবে। শতাংশের যে হিসাবটি এখানে দেয়া হলো, প্রেক্ষাপট বিচারে তার পরিবর্তন হতে পারে। এখানে সংরক্ষিত জমি/প্লট/ফ্লোর স্পেস বিক্রি করে প্রকল্প ব্যয় মেটানো হবে। জমির মালিকরা যে পরিমাণ জমি দিয়ে এ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেছেন সে অনুপাতে প্লট/জমি পাবেন।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ তাদের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপে ভূমি পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়া অনুসরণ করে উন্নয়নের বিষয়ে বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। ড্যাপের রিপোর্টে এ-সংক্রান্ত একটি নাতিদীর্ঘ প্রক্রিয়াও বিবৃত করা হয়েছে।

এ প্রক্রিয়া অনুসরণে কী লাভ?

গ্রামীণ এলাকায় পরিকল্পিত আবাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। বসতিগুলো ক্লাস্টার হয়ে গড়ে উঠলে সহজে সেখানে বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ, রাস্তাঘাট, স্যানিটেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা কম খরচে সরবরাহ করা যাবে। ভালো শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যাবে। ক্লাস্টার বসতি হলে সেখানে সহজে অনেক ধরনের সুযোগ-সুবিধার যৌথভাবে ব্যবস্থা করা যাবে, যা এককভাবে সম্ভব হয় না। যেমন নিরাপত্তা, সড়কবাতি, কেনাকাটা, বিনোদনের ব্যবস্থা ইত্যাদি। পরিকল্পিতভাবে বসবাসের জন্য সুযোগ-সুবিধা পেলে অনেকেই এখানে আসতে উৎসাহিত হবে। সর্বোপরি, ভূমির অপচয় কমে আসবে।

আমাদের চ্যালেঞ্জ বর্তমানে যে বসতবাড়িগুলো তৈরি হচ্ছে সেখানে প্রধান সমস্যা এখানে কোনো ধরনের নাগরিক পরিসর থাকছে না। অর্থাৎ সামাজিক ও নাগরিক সুবিধা যেমন স্কুল-কলেজ, খেলার মাঠ, পার্ক, স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি অবকাঠামো ছাড়াই বসতবাড়িগুলো সম্প্রসারিত হচ্ছে। একটা বাড়ি থেকে চারটা বাড়ি, চারটা বাড়ি থেকে ১৬টা বাড়ি হচ্ছে। ফলে চাষাবাদের জমি কমে যাচ্ছে। আবার এসব বসতিতে সামাজিক ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা অনুপস্থিত। সবাইকে যদি গঠনমূলকভাবে সংগঠিত করা যায় তাহলে বিষয়টি ফলপ্রসূ হবে।

এ পদ্ধতির আওতায় তাদের কাছ থেকে কিছু পরিমাণ জমি উন্নয়নের জন্য নেয়া হবে রাস্তাঘাট, গণপরিসর, স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো তৈরির জন্য। কিছু এলাকা সংরক্ষিত থাকবে। কারণ তাদের বাজার-সদাই করতে হবে। হাট-বাজার, শপিং কমপ্লেক্স লাগবে। তখন ওই সংরক্ষিত জমিটা অর্থনৈতিক কাজে ব্যবহার করা হবে। এ জমি বিক্রি করে মার্কেট নির্মাণ ইত্যাদি প্রকল্পের ব্যয় মেটানো যাবে। ব্যয়ের পুরোটাই যে এখান থেকে মিটে যাবে তা নয় বরং এটা নির্ভর করে প্রকল্প নকশা কীভাবে করা হবে তার ওপর। এর সঙ্গে সরকারিভাবে আসতে পারে অর্থ ও অনুদান। যদি সরকারি অর্থ বা অনুদান কোনোটাই না হয় তাহলে ওই অর্থের পুরোটাই ব্যয় করবে জমির মালিকরা। এখানে কিন্তু খরচের বিষয়টি ভাবলে চলবে না। বরং দিন শেষে সবাই চমত্কার প্রতিবেশী পাবে। যেখানে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নাগরিক সুবিধাসম্পন্ন অবকাঠামো ও পরিষেবা প্রাপ্তির সুবিধা রয়েছে।

বিশ্বব্যাপী উন্নয়নে ভূমির পুনর্বিন্যাস

এ পদ্ধতি কিন্তু নিছক কোনো ধারণা নয়। পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকায় এ পদ্ধতিতে উন্নয়ন প্রক্রিয়া বিশেষ লক্ষণীয়। চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, কোরিয়ায় উন্নয়নে এ পদ্ধতির ব্যাপক প্রয়োগ করতে দেখা যায়। বিশেষ করে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মডেল অনেক বেশি কার্যকরভাবে জমির পুনর্বিন্যাসে সফল হয়েছে। কোথাও সরকারি অর্থের অনুদান থাকে, কোথাও থাকে না। কোথাও একেবারেই ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে করা হয়। আমাদের দেশেও সীমিত পরিসরে এ পদ্ধতি প্রয়োগ হয়েছে।

আমাদের দেশেও শহরের কাছাকাছি এলাকাগুলোয় কিছু মানুষ একসঙ্গে জমি কিনে নিজেরাই রাস্তাঘাট ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করে প্লট বিভাজন করে উন্নয়ন করতে দেখা যায়। এছাড়া শহরগুলোয় একই প্লটে অ্যাপার্টমেন্ট করে ফ্ল্যাট ভাগাভাগি করা অনেক বেশি প্রচলিত। কিন্তু আমি বলছি গ্রামীণ এলাকাগুলোর জন্য। যেখানে মানুষকে সংগঠিত করার জন্য সরকারি একটা প্রতিষ্ঠান লাগবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, জমির মালিকদের অংশগ্রহণে ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সংগঠন তৈরি করে যৌথ সিদ্ধান্তে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়।

কারা শামিল হবে এমন উদ্যোগে?

গ্রামের সব পরিবার এ ধরনের আবাসনে আসার জন্য উৎসাহিত হবে না। কিন্তু মাঠ জরিপে দেখা গেছে, গ্রামের তিন ধরনের মানুষ এ গ্রামীণ আবাসনে আসবে। প্রথমত, কিছু জমির মালিকরা বা পরিবার উন্নত ও নিরাপদ জীবন যাপনের জন্য এ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করবেন। দ্বিতীয়ত, বর্তমানে কৃষি খাত সংকুচিত হচ্ছে, তার স্থলে অকৃষিজ খাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, ব্যবসা, নির্মাণ খাত, পরিবহন খাতে কাজের সুযোগ বাড়ছে। এ রকম অকৃষিকাজে জড়িত পরিবার এখানে এসে থাকতে চাইবে। তৃতীয়ত, গ্রামের অনেক মানুষ এখন মধ্যপ্রাচ্যসহ বিদেশে কাজ করে কিন্তু তাদের পরিবার গ্রামে থাকে। এ পরিবারগুলো বসবাসের জন্য এমন একটি কমিউনিটি চাইবে, যেটা নিরাপদ এবং যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান আছে। মনে রাখতে হবে, আমাদের জিডিপিতে কৃষি খাতের অংশগ্রহণ মাত্র ১৫ শতাংশ। এদিকে ৪০ শতাংশ লোক এখনো কৃষিকাজে যুক্ত। তবে একটা বড় অংশ এখন অকৃষির দিকে চলে গেছে।

প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ও সক্ষমতা

আমাদের এখন গ্রামীণ এলাকার দিকে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। কৃষিজমি, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ও ভূমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে গ্রামীণ এলাকাও পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। অনেকেই বিষয়টি নিয়ে কথা বলছে, কিন্তু এটা বাস্তবায়নে যোগ্য প্রতিষ্ঠান কী হতে পারে? আমি বলব যোগ্য প্রতিষ্ঠান হচ্ছে উপজেলা পরিষদ। কিন্তু তাদের কী সে সক্ষমতা আছে? উত্তর হচ্ছে না। কারণ এ ধরনের কাজে দক্ষ কারিগরি লোক দরকার। উপজেলায় প্রকৌশলী আছেন। সেখান একজন পরিকল্পনাবিদকে যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে কাজগুলো করা যেতে পারে। তবে উদ্যোগটা সরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন উপজেলা পরিষদকে নিতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানসহ বাকিরা তাদের সহযোগিতা করবেন। কারণ এদের নেতৃত্ব ছাড়া এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।

এলোমেলোভাবে যেভাবে গ্রামীণ বসতি সম্প্রসারিত হচ্ছে তাকে গুছিয়ে পরিকল্পিত গ্রামীণ নিবিড় বসতি গড়ে তোলার এখনই সময়। কিন্তু সে উন্নয়ন হতে হবে গ্রামীণ ঐতিহ্য প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ বিষয়ে পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি, সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদরা সময়মতো তাদের দায়িত্ব পালন করতে না পারলে টেকসই উন্নয়ন থেকে দেশ বঞ্চিত হবে। খেয়াল রাখতে হবে, উচ্চ প্রবৃদ্ধির পেছনে দৌড়াতে গিয়ে যেন পরিবেশ ও প্রকৃতিকে কোনোভাবে বিসর্জন দিয়ে না ফেলি। বরং প্রচেষ্টা থাকতে হবে পরিবেশকে টেকসইভাবে সংরক্ষণের মধ্য দিয়েই দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করার।

  • ড. আকতার মাহমুদ: নগর পরিকল্পনাবিদ; শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)



  এ বিভাগের অন্যান্য