www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

শিল্প হারে বিদ্যুৎ বিল

প্রণোদনার ঋণ নিয়ে বিপাকে যশোরের রেণু পোনা হ্যাচারি


 এগ্রিবার্তা ডেস্ক    ৪ এপ্রিল ২০২২, সোমবার, ১:২৪   মৎস্য  বিভাগ


কৃষির পরিবর্তে শিল্প হারে বিদ্যুৎ বিল, পোনার দাম কমে যাওয়া এবং খাদ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে চরম সংকটে পড়েছেন যশোরের রেণু পোনা হ্যাচারি মালিকরা। ফলে সরকারের প্রণোদনা ঋণ নিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন তারা। ঋণের মেয়াদকাল শেষ হওয়ার কারণে এখন তাদের নিয়মিত ঋণের সুদ টানতে হচ্ছে।

হ্যাচারি মালিকরা জানিয়েছেন, আগে হ্যাচারি খাতের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হতো কৃষি রেটে। এতে উৎপাদন খরচ অপেক্ষাকৃত কমে আসত। ২০১২ সাল থেকে কৃষির পরিবর্তে বিদ্যুৎ বিল শিল্প খাত হারে নেয়া শুরু হয়। হ্যাচারি উদ্যোক্তারা জানান, কৃষি থেকে শিল্প হারে যাওয়ার ফলে রেণু পোনার উৎপাদন খরচ প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। রেণু পোনা উৎপাদনকারী আব্দুল আলিম বলেন, আগে কৃষি খাত হিসেবে প্রতি ইউনিট ৫ টাকা করে বিদ্যুৎ বিল দিতে হতো। এখন শিল্প হার হিসেবে দিতে হয় ইউনিটপ্রতি ৮ টাকা। যশোর জেলা মত্স্য হ্যাচারি মালিক সমিতির সভাপতি ও ফাতিমা হ্যাচারির স্বত্বাধিকারী ফিরোজ খান জানান, কৃষি হার অনুসারে তার হ্যাচারিতে বিদ্যুৎ বিল আসত ৩০-৩৫ হাজার টাকা। বর্তমানে বিল দিতে হয় শিল্প রেটে। এ রেটে গত মাসে দিতে হয়েছে ৪৫ হাজার টাকা। গ্রীষ্মকালে রেণু পোনা উৎপাদন মৌসুমে এ বিল ৫৫-৬০ হাজার টাকায় গিয়ে দাঁড়াবে। তিনি বলেন, বারবার আমরা দাবি করেছি বিদ্যুৎ বিল কৃষি হারে করা হোক। সেটি কার্যকর হচ্ছে না। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় আমরা মারাত্মক চাপে পড়েছি। এতে করোনাকালে সরকারের প্রণোদনা ঋণ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন হ্যাচারি উদ্যোক্তারা। করোনার প্রভাবে যশোরে ২০২১ সালে ৩৪টি মত্স্য হ্যাচারি বন্ধ হয়ে যায়। ওই বছর উৎপাদনে যেতে না পারায় রেণু পোনা খাতের উদ্যোক্তাদের প্রায় ৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। জেলা মত্স্য হ্যাচারি মালিক সমিতির সভাপতি ফিরোজ খান জানান, তিনি করোনাকালে সরকারের প্রণোদনার ঋণ নেন ১৪ লাখ টাকা। যার সুদ ছিল ৪ শতাংশ হারে। মেয়াদ ছিল এক বছর। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় এখন সেটি নিয়মিত ঋণের সুদ দিতে হচ্ছে। এভাবে তাদের রেণু পোনা খাতের অর্ধেক উদ্যোক্তাই বিপাকে পড়েছেন।

শুধু বিদ্যুৎ বিল এবং প্রণোদনা হিসেবে নেয়া ঋণ পরিশোধ নয়, হ্যাচারি মালিকদের সংকট তীব্রতর করেছে খাদ্যের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি রেণু পোনার দাম কমে যাওয়া। সব মিলিয়ে চরম বিপর্যয়ে রয়েছেন রেণু পোনা খাতের ব্যবসায়ীরা। হ্যাচারি মালিক আব্দুল আউয়াল বলেন, করোনা সংকটের পর পুনরায় উৎপাদনে গেলেও আমরা বিদ্যুৎ বিল ও পোনার হরমোন ইনজেকশন পিজি নিয়ে উদ্বিগ্ন। এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে দ্বিগুণ। মাছের হরমোন ইনজেকশন পিজি আগে প্রতি পিস ছিল ৮ টাকা, সেখানে এখন কিনতে হচ্ছে ৪০ টাকায়।

একই এলাকার মাছ চাষী অহিদুল্লাহ লুলু বলেন, করোনার প্রভাবে রেণু পোনা উৎপাদন বন্ধ থাকার পর এখন আমাদের কাছে তেমন টাকা নেই। যে কারণে সবাই ভালোভাবে উৎপাদন করতে পারছে না। তার পরও যেহেতু এ পেশায় আছি, সে কারণে আমাদের পোনা উৎপাদন করতে হচ্ছে। তবে সব মিলিয়ে এ খাতের ব্যবসায়ীরা ভালো নেই।

জেলা হ্যাচারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান গোলদার জানান, সবসময় আমাদের প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে রেণু পোনা উৎপাদন করতে হয়। প্রচণ্ড গরমে ব্যাহত হয় রেণু পোনা উৎপাদন। তিন বছর আগে পোনার খাদ্য ডিফিডের দাম ছিল ২৮ টাকা কেজি, এখন সেটি কিনতে হচ্ছে ৮০ টাকায়। রাইস পলিস, ভুট্টা, সয়াবিন, খৈল, সরিষাসহ ওষুধের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে। অথচ আবার পোনার দাম কমেছে। আগে মৃগেল, রুই, কাতলা, সিলভার কার্পের কেজি ছিল ৬ হাজার টাকা, বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে মাত্র আড়াই হাজার টাকায়। অন্যান্য পোনার দামও কমেছে।

এ বিষয়ে যশোর জেলা মত্স্য কর্মকর্তা মো. ফিরোজ আহমেদ বলেন, করোনাকাল কাটিয়ে চলতি বছর যশোরের রেণু পোনা উদ্যোক্তারা তাদের কার্যক্রম শুরু করেছেন। আশা করছি এবার ভালোভাবে পোনা উৎপাদন হবে। আমরা হ্যাচারি মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। তাদের সার্বিক সহযোগিতা দিচ্ছি। এবার রেণু পোনা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দেড় লাখ কেজি। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত রেণু পোনা উৎপাদনের ভরা মৌসুম। দেশের মোট চাহিদার ৬০ শতাংশ রেণু পোনা যশোর থেকে সরবরাহ করা হয়। চাঁচড়া মত্স্যপল্লীর ৩৪টি হ্যাচারিতে গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার কেজি রেণু উত্পন্ন হয়।

জেলা মত্স্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ৩৪টি হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন হয়। এর মধ্যে কার্প জাতীয় রেণু পোনা উৎপাদন হয় ৬৪ দশমিক ৮৬ টন। জেলায় রেণু পোনার চাহিদা ১৫ দশমিক ২৩ টন। উদ্বৃত্ত ৪৯ দশমিক ৬৩ টন দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। তেলাপিয়া পোনা ১০১ দশমিক ৪০ মিলিয়ন উৎপাদন হচ্ছে। জেলায় চাহিদা রয়েছে ৯৮ দশমিক ৮৫ টন। তেলাপিয়ার উদ্বৃত্ত ৬ দশমিক ৫৫ টন। পাঙ্গাশ রেণু উৎপাদন ৩ দশমিক ৬২ টন এবং শিং-মাগুর, পাবদা, গুলসা রেণু উৎপাদন শূন্য দশমিক ৮৫ টন।

যশোরে মোট ৫১টি বাঁওড় রয়েছে। যার আয়তন ১৮ হাজার ৮৪ হেক্টর। মূলত এসব বাঁওড় থেকে মাছ উৎপাদন হচ্ছে। এখানকার উৎপাদিত মাছ দেশের অর্ধেক চাহিদা মিটিয়ে থাকে। যশোরের হ্যাচারিগুলো রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প, বিগহেড, থাই সরপুঁটি, মিরর কার্প, জাপানি, চিতল, আইড়, তেলাপিয়া, মনোসেক্স তেলাপিয়া, শিং, কৈ, থাই কৈ, পাঙ্গাশ প্রভৃতি মাছের পোনা উৎপাদন করে থাকে। হ্যাচারির পাশাপাশি যশোরে পাঁচ-ছয় হাজার নার্সারি রয়েছে। জেলার দুই লাখ লোক মাছ উৎপাদন, চাষ এবং এ-সংশ্লিষ্ট পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে।




  এ বিভাগের অন্যান্য