www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

মানমাত্রার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ভারী ধাতুর উপস্থিতি

ঢাকায় সবচেয়ে দূষিত কেরানীগঞ্জের কৃষিজমি


 এগ্রিবার্তা ডেস্ক    ১৮ এপ্রিল ২০২২, সোমবার, ৩:৪৬   প্রাণিসম্পদ বিভাগ


ঢাকায় নগরায়ণ বেড়েছে দ্রুতগতিতে। পাল্লা দিয়ে হয়েছে শিল্পায়নও। তবে নগরায়ণ আর শিল্পায়নের এমন ব্যাপ্তির সঙ্গে পরিবেশদূষণ রোধের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়নি। ফলে এরই মধ্যে দূষণ মাত্রা ছাড়িয়েছে ঢাকার মাটিতেও। ঢাকার কৃষিজমিতে মিলছে মানমাত্রার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ভারী ধাতু। স্থানভেদে সবচেয়ে বেশি দূষিত হয়েছে কেরানীগঞ্জের জমি। কৃষিজমিতে পাওয়া এসব ভারী ধাতু উৎপাদিত কৃষিজ ফসলের মাধ্যমে মানবদেহে পৌঁছায়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

‘এনরিচমেন্ট, সোর্সেস অ্যান্ড ইকোলজিক্যাল রিস্ক ম্যাপিং অব হেভি মেটালস ইন এগ্রিকালচারাল সয়েলস অব ঢাকা ডিস্ট্রিক্ট এমপ্লয়িং এসওএম, পিএমএফ অ্যান্ড জিআইএস মেথড’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। পরিবেশে রাসায়নিকের প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা জার্নাল কেমোস্ফিয়ারে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। যৌথভাবে এ গবেষণা করেছেন জাপানের কিয়ুশু ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব টোকিও, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ গবেষক।

গবেষণা সমীক্ষায় পরিবেশগত ঝুঁকি এবং ভারী ধাতুর উৎস ভাগের মূল্যায়নের জন্য ঢাকার কৃষিজমি থেকে ৫৪টি মাটির নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। এতে ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা (জিআইএস) থেকে প্রাপ্ত উপাত্তও ব্যবহার করা হয়। সমীক্ষায় প্রাপ্ত ফলে দেখা গেছে, যেসব উৎস থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে তার ৯০ শতাংশেরও বেশি নমুনায় উচ্চমাত্রার ক্রোমিয়াম ও ক্যাডমিয়াম পাওয়া গেছে। ৭৩ শতাংশ মাটির নমুনায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি রয়েছে, যাকে মাঝারি মাত্রার দূষণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

গবেষণায় ঢাকা জেলার বিভিন্ন স্থানের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। মোট ৫৪টি স্থানের মাটির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। নমুনার মধ্যে কিছু মাটি ছিল ধামরাই উপজেলার। মূলত গ্রামীণ এলাকা থেকেই মাটির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এছাড়া ঢাকা মেট্রোপলিটন, সাভার ও কেরানীগঞ্জ উপজেলা, নবাবগঞ্জ উপজেলা থেকেও নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। ভূ-উপরিস্থিত দূষণ এড়াতে নমুনা সংগ্রহ করা হয় মাটির ৫-১০ সেন্টিমিটার নিচ থেকে।


এতে গবেষকরা দেখতে পান, ঢাকার বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ভূপৃষ্ঠের পানি প্রধানত ঢাকার উত্তর-পূর্ব অংশে সেচের জন্য ব্যবহার হয়। অন্যদিকে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শত শত বছর ধরে ধলেশ্বরী ও ইছামতী নদী থেকে সেচের পানি ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব জমিতে মূলত ধান ও শিম চাষ করা হয়। শীতকালে এ জমিগুলোয় শিম উৎপাদিত হয়। গবেষণার আওতাধীন এলাকা ও এর আশপাশের আংশিক প্লাবনভূমি বিভিন্ন শিল্প এলাকার দখলে রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ইপিজেড, ইটভাটা, ট্যানারি, টেক্সটাইল ও রাসায়নিক শিল্প-কারখানা। এসব কারখানার বিভিন্ন দূষিত বর্জ্যের কারণে ধলেশ্বরী, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বংশীসহ ঢাকার চারপাশের নদীর দূষণ হয়েছে। সংযুক্ত এসব নদী শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে মেঘনা নদীর দিকে প্রবাহিত হয়। মেঘনা থেকে এ প্রবাহ গিয়ে মিলিত হয় বঙ্গোপসাগরের মোহনায়। প্রায় প্রতি বছরই বর্ষাকালে এসব এলাকা প্লাবিত হয়। ফলে দূষিত হয়ে পড়ে কৃষিজমি। ভূ-প্রকৃতিগতভাবে অঞ্চলটি মধুপুর ট্র্যাক্ট নামে পরিচিত, যার চারপাশের মাটি উচ্চফলনশীল বেলে দো-আঁশ মাটিতে পরিপূর্ণ।

কৃষিজমিতে পাওয়া ভারী ধাতুর সম্ভাব্য কয়েকটি উৎসের কথা সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে কৃষিতে ব্যবহূত রাসায়নিক, নর্দমার পানিতে উপস্থিত ক্ষতিকর বর্জ্য, শিল্প-কারখানার দূষণ ও ট্যানারি। প্রায় ৭৫ শতাংশ মাটির নমুনায় মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। আর ২০ শতাংশ মাটিতে মাঝারি থেকে যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ ধাতুর উপস্থিতি রয়েছে। কৃষিজমিতে আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ, ক্রোমিয়াম, কার্বন মনোক্সাইড, নিকেল, কপার, জিঙ্ক, আর্সেনিক, লেড, ক্যাডমিয়ামের মতো ক্ষতিকর ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

বিষয়টি নিয়ে গবেষক দলের সদস্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মাদ আমির হোসেইন ভূঁইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, গবেষণার লক্ষ্য ছিল নগরায়ণের ফলে কৃষিভূমিতে যে দূষণ হচ্ছে তা পরিমাপ করা। এছাড়া কোথায়, কী মাত্রায় দূষণ হয়েছে—তারও একটি ম্যাপিং করা। ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে যদি চিহ্নিত করা যায়, কোন কোন মাধ্যম থেকে এ দূষণ সৃষ্টি হচ্ছে, তাহলে দূষণ ব্যবস্থাপনা করা সহজ হবে। কৃষিজমিতে দূষণের ফলে বিভিন্ন ক্ষতিকর ধাতুর অবস্থান প্রায় অক্ষুণ্ন থাকে। এজন্যই নমুনার জন্য মাটিকে বেছে নেয়া হয়েছে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বংশী বা অন্য নদ-নদী থেকে বর্ষাকালে কৃষিজমি প্লাবিত হয়ে যায়। ফলে বিভিন্নভাবে দূষিত পানি আবার কৃষিজমিতে যায়। কৃষিজমিও দূষিত হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, গবেষণায় কেরানীগঞ্জের মাটিতে অতিরিক্ত মাত্রায় ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম ও কিছু ধাতব কপার পাওয়া গেছে। এখানে ক্যাডমিয়াম এসেছে কৃষিজমিতে সার ব্যবহারের ফলে। এছাড়া ঢাকার যে স্যুয়ারেজ লাইনগুলো রয়েছে সেগুলো বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদের সঙ্গে সংযুক্ত। এগুলোর মিলিত স্রোতধারা বুড়িগঙ্গা হয়ে নিচের দিকে প্রবাহিত হয়, যার একসময় গন্তব্য হয় কৃষিজমি। গবেষণায় একটি ম্যাপিং করা হয়েছে, তাতে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে কোন এলাকার মাটি পরিবেশগতভাবে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। সেক্ষেত্রে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হলো কেরানীগঞ্জ, আর মধ্যম মানের দূষণ পাওয়া গেছে ধামরাইয়ের কৃষিজমিতে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের কিছু কৃষিজমিতেও মানমাত্রার তুলনায় ঝুঁকিপূর্ণ ভারী ধাতুর উপস্থিতি মিলেছে।

কৃষিজমি দূষণের সর্বনিম্ন হারও বাস্তুতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর বলে গবেষণায় বলা হয়েছে। এ দূষণ পরিবেশগতভাবে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বলে সমীক্ষায় বলা হয়েছে। পরিবেশগত ঝুঁকিপূর্ণ এসব ভারী ধাতুর অবস্থান বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার দক্ষিণাংশ কেরানীগঞ্জ উপজেলার মাটিতে সবচেয়ে বেশি ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। কৃষিজমিতে এসব ভারী ধাতুর উপস্থিতির অবস্থানের ওপর একটি মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানভেদে দূষণের উৎস কমাতে উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে এসব কৃষিজমিতে এলাকাভিত্তিক দূষণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পরিবেশগত সুরক্ষাও অর্জন করা যায়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, নদীর দূষণ সাধারণত দুভাবে হয়ে থাকে। একটি কৃষিতে রাসায়নিকের ব্যবহারের মাধ্যমে আর অন্যটি শিল্প-কারখানার দূষণের মাধ্যমে। নদী দূষিত হয়ে পড়লে সেই এলাকার মাটিও দূষিত হয়। আর মাটি দূষণের মাধ্যমে একটি প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। একটি নদীকে দূষণের মাধ্যমে নষ্ট করার মানে হলো একটি প্রজন্মকে ক্ষতিগ্রস্ত করে গড়ে তোলা।

তিনি আরো বলেন, কৃষিজমির ইকোসিস্টেম একবার নষ্ট হলে সেটি ঠিক হতে আশি বছর লাগে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মাধ্যমে যদি নদীদূষণ হয়ে থাকে, প্রয়োজনে তাদের প্রণোদনা দিয়ে হলেও নদীর দূষণ কমাতে হবে। নদী বাঁচাতে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এজন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। নদী রক্ষায় সরকারের বাজেট বাড়ানোর বিকল্প নেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেরানীগঞ্জে ছোট-বড় পাঁচ হাজারেরও বেশি গার্মেন্টস কারখানা ছাড়াও রয়েছে শতাধিক ওয়াশিং কারখানা। ওয়াশিং প্ল্যান্ট মালিক সমিতির তথ্য বলছে, প্রতিদিন ২৪ থেকে ৩০ লাখ লিটার বর্জ্য পানি সরাসরি অপরিশোধিত অবস্থায় গিয়ে পড়ে বুড়িগঙ্গায়। পাশেই শ্যামপুর শিল্প এলাকার শতাধিক প্রিন্টিং অ্যান্ড নিট-ডায়িং কারখানা থেকে প্রতিদিন বের হয় ৩০ হাজার ঘনমিটারেরও বেশি অপরিশোধিত তরল বর্জ্য, যা সরাসরি মিশছে নদীটিতে। এর সঙ্গে প্রতিনিয়ত ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ভারী ধাতু যাচ্ছে পানিতে। দূষণ রোধে হাজারীবাগের ট্যানারি কারখানাগুলো হেমায়েতপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে গিয়ে এ শিল্প নতুন করে দূষিত করছে ধলেশ্বরী নদীকে। কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণ করা হলেও তা সঠিকভাবে পরিশোধন করতে পারছে না। আর এসব দূষণ থেকেই কৃষিজমিও দূষিত হচ্ছে।

ঢাকার কৃষিজমি দূষণের আরেকটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ইটভাটা। ঢাকার চারপাশে চার থেকে পাঁচ হাজার ইটভাটা রয়েছে। ইট তৈরিতে পোড়ানো হয় কাঠ, কয়লা, কাঠের গুঁড়ো ও ফার্নেস অয়েল। এমনকি বাতিল হওয়া টায়ারও। আবার এক লাখ ইট পোড়াতে প্রায় ২০ টন কয়লার দরকার হয়। এসব ইটভাটার চিমনি থেকে বের হওয়া কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে যাচ্ছে বাতাসে। অতিরিক্ত কাঠ ও কয়লা পোড়ানোর ফলে নির্গত হচ্ছে ধূলিকণা, পার্টিকুলেট কার্বন, কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ও নাইট্রোজেন অক্সাইড, যা বায়ুমণ্ডল দূষিত করছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ঢাকায় বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে ৫৪ শতাংশ ইটভাটা থেকে হয়, যা দূষিত করে চলেছে ঢাকার কৃষিজমিও।

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট হাসপাতালের এপিডেমিওলজি বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে এসব ভারী ধাতু মানুষের শরীরে প্রবেশ করে বিভিন্ন রকমের প্রভাব ফেলে। প্রথমত, এসবের কারণে ত্বকের বিভিন্ন রোগ হতে পারে। পরবর্তী পর্যায়ে কিডনি, ফুসফুস ও মস্তিষ্ক মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এছাড়া এসব ধাতু মানবদেহে ক্যান্সারের মতো রোগও সৃষ্টি করতে পারে।




  এ বিভাগের অন্যান্য