www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

লোকসান কাটাতে রাকাবের পরিশোধিত মূলধন বাড়াবে সরকার


 এগ্রিবার্তা ডেস্ক    ১১ মে ২০২২, বুধবার, ৯:৫৭   কৃষি অর্থনীতি  বিভাগ


বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের (বিকেবি) রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের শাখাগুলো নিয়ে ১৯৮৭ সালে গঠন করা হয় রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)। লক্ষ্য ছিল, কৃষি খাতে অর্থায়নের মাধ্যমে ওই অঞ্চলের ১৬টি জেলার উন্নয়ন। সেই লক্ষ্য কম-বেশি কিছুটা পূরণ হলেও ৩৪ বছরের অধিকাংশ সময়ই লোকসানে বছর পার করেছে ব্যাংকটি। সম্প্রতি রাকাবকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন ৮২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

সূত্র জানায়, বেশ কিছুদিন থেকেই পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর অনুরোধ করে আসছিল রাকাব কর্তৃপক্ষ। এবার সে অনুরোধে সাড়া দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সম্প্রতি মূলধন বাড়ানোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে অর্থ বিভাগকে চিঠি দিয়েছে। অর্থ বিভাগও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করছে।

অর্থ বিভাগে পাঠানো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের চিঠিতে বলা হয়, ব্যাংকটির রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের শাখাগুলোয় কৃষি ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক কাঠামো সুদৃঢ়করণ এবং সার্বিকভাবে রাকাবের ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে লাভজনক ব্যাংকে উন্নীত করার লক্ষ্যে গৃহীত পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য পরিশোধিত মূলধন ৮২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার সুপারিশ করা হচ্ছে। এজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধও জানানো হয়।

এ বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে অনিয়ম-দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও আঞ্চলিক প্রভাবের অভিযোগ রয়েছে রাকাবের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনে এসবের সত্যতাও পাওয়া গেছে। এছাড়া খেলাপি ঋণ বেশি হওয়ার কারণে ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার পর অধিকাংশ সময় লোকসান গুনছে। তবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এসব বিষয়ে সংস্কার আনার কথা জানিয়েছে। সেই সঙ্গে ব্যাংকটিকে লাভজনক করার বিভিন্ন কার্যক্রমের একটি হিসেবে পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর অনুরোধ করে আসছিল রাকাব। তাদের অনুরোধের ভিত্তিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ অর্থ প্রতিষ্ঠান বিভাগ পাঠিয়েছে।

অর্থ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সুপারিশটি তারা বেশ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছে। খুব শিগগির এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে। তবে খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকটির বিরুদ্ধে যেসব অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোয় সংস্কার আনতে হবে। একই সঙ্গে মূলধন বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংকটির ওপর তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাকাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল মান্নান বণিক বার্তাকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকটি লোকসানে রয়েছে। তার অন্যতম কারণ হচ্ছে ব্যাংকটি চরম তহবিল সংকটে ভুগছে। আমানতের বিপরীতে ব্যাংকের ঋণ বিতরণের হার প্রায় ১০০ শতাংশ, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মের বাইরে। কিন্তু এ ঋণগুলো কৃষকদের স্বল্প সুদে দেয়া হয়েছে। এছাড়া প্রাকৃতিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বিভিন্ন সময়ে সরকারের নির্দেশে কৃষকদের প্রায় ৮১৫ কোটি টাকার সুদ মওকুফও করা হয়েছে। এর বিপরীতে সরকারের কাছ থেকে তেমন কোনো ভর্তুকি পাওয়া যায়নি।

এ কারণে তহবিল সংকট আরো তীব্র হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাই পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। যদি বাড়তি মূলধন পাই, তাহলে আমরা আমানতের বিপরীতে ঋণ বিতরণের যে অসমতা রয়েছে সেটা কমিয়ে আনতে পারব। পাশাপাশি ব্যাংক কর্তৃপক্ষও আমানত বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এরই মধ্যে সব ব্যাংক অনলাইনে চলে গেছে কিন্তু রাকাবে অনলাইন ব্যাংকিং না থাকার কারণে ভালো ভালো গ্রাহক অন্য ব্যাংকে চলে গেছে। তাই রাকাবও গত ২৩ মার্চ মোবাইল অ্যাপস ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং উদ্বোধন করেছে। অনলাইন ব্যাংকিং চালুর পর আমরা গ্রাহকদের বেশ সাড়া পাচ্ছি। আমরা যদি বাড়তি পরিশোধিত মূলধন পাই একই সঙ্গে আমরা যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করেছি, তাতে আশা করছি অল্প কিছুদিনের মধ্যে রাকাব ঘুরে দাঁড়াবে।

এদিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকটিকে ১৯৯২-৯৩ সাল থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বিভিন্ন সময়ে প্রভিশন ঘাটতি বাবদ ৪১৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকা দিয়েছে সরকার। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে রাকাবকে সুদ ভর্তুকি বাবদ ২৯৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। এদিকে ব্যাংকের অটোমেশন বাস্তবায়নের জন্য ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সরকার মূলধন পুনর্গঠন বাবদ ৮০ কোটি টাকা দিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর শেষে রাকাবের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৬ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৯ দশমিক ২৯ শতাংশ বা ১ হাজার ২১২ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ। পাশাপাশি ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি রয়েছে ১ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা।

ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, রাকাবের মোট ৩৮৩টি শাখা রয়েছে। এর মধ্যে শহরে রয়েছে ৫০টি, পল্লী শাখা ৩৩৩টি। এসব শাখার মধ্যে ১৫১টি লোকসানে রয়েছে। সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা লাভ করে ব্যাংকটি। এরপর টানা চার বছর লোকসান গুনছে রাকাব। সর্বশেষে গত ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫৮১ কোটি ৪১ লাখ টাকা আয় করে ব্যাংকটি। এর বিপরীতে ব্যয় হয় ৫৮৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা। ফলে লোকসান গুনতে হয় ৩ কোটি ১০ লাখ টাকা।

এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন বাড়ানো হচ্ছে সেটা ভালো। তবে সংস্থাটির পরিচালনা জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ঋণও দেয়া হচ্ছে নিয়ম-কানুন ভেঙে। আবার অর্থ আদায়ে আইনি কাঠামোও বেশ দুর্বল। তাই ব্যাংকটির খেলপি ঋণ বেশি। এসব নিয়ন্ত্রণে ব্যাংকটির ওপর তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন। এছাড়া ব্যাংকটি যে মডেলে চলছে, এটাও টেকসই নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।




  এ বিভাগের অন্যান্য