www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

জিডিপির আকারের সূত্র ধরে বাজেটের আকার বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক


 এগ্রিবার্তা ডেস্ক    ১৫ মে ২০২২, রবিবার, ১:১৭   সম্পাদকীয় বিভাগ


দেশের জিডিপির আকার বা পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। একই সঙ্গে বছর থেকে বছরে এর প্রবৃদ্ধির হারও মোটামুটি স্থিতিশীল বা ঊর্ধ্বগামী। অর্থনীতির জন্য এটা নিঃসন্দেহে স্বস্তি বা প্রশান্তির বিষয়। কিন্তু বাস্তবে এর প্রভাব দৃশ্যমান না হলে জিডিপির প্রাক্কলন বা হিসাবায়ন এবং খাতওয়ারি অংশায়ন ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাও অস্বাভাবিক নয়। একটি উদাহরণ দিই। যেমন জিডিপিতে কৃষির উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। কৃষি খাতে ১০-১২ বছর ধরে তেমন বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়নি, যা আগে হয়েছে। গত সাত-আট বছর দেশের অর্থনীতির জন্য প্রকৃতি ছিল অনেকটাই অনুকূল। এমনকি করোনার সময় কৃষক খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হননি। ফলে জিডিপিতে কৃষির অবদান অব্যাহত রয়েছে বা বেড়েছে। নিজস্ব সক্ষমতায় কৃষি জিডিপিতে অবদান রেখে চললেও গুরুত্ব বিবেচনায় কৃষির সমস্যা মোকাবেলা বা সুরক্ষার ব্যাপারে বাজেটে সেভাবে মনোযোগ বা বরাদ্দ বাড়ছে না। জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় অঞ্চলে বেড়িবাঁধ ভেঙে, হাওর অঞ্চলে ভঙ্গুর বাঁধ ভেঙে, সীমান্ত নদী বা পাহাড়ি ঢলে হঠাৎ বন্যায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলে উঠতি ফসল অসম্ভব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া থেকে নিরাপদ থাকার ব্যাপারে বাজেটে বরাদ্দ এবং সে বরাদ্দ কার্যকর বাস্তবায়নের সুফল মিলছে না, হাওর কিংবা উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ভেঙে লাখ লাখ একর জমি তলিয়ে যাচ্ছে এবং ফল ও ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, কৃষিতে ভর্তুকি বাড়বে। এটা নতুন কোনো কথা নয়। এ ভর্তুকি পরিশোধ, প্রদান ও আসল প্রাপকের কাছে পৌঁছানোটা নিশ্চিত করা যায়নি। মাঠ থেকে কথা উঠে আসছে ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী, এমনকি প্রণোদনার অর্থ ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষি খামারিদের কাছে তেমন পৌঁছেনি। কৃষক নিজস্ব বিদ্যাবুদ্ধি দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। অর্থাভাবে তারা মত্স্য চাষ, পশুপালন, শস্য-সবজি সংরক্ষণসহ অনেক কিছুতে করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ততা কাটিয়ে উঠতে পারছেন না; ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না; বন্যা, প্লাবনে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ বা জমি উদ্ধারে অগ্রগতি নেই। জিডিপিতে কৃষির অবদান টেকসই করতে কার্যকর বিনিয়োগ প্রয়োজন।

মোট জিডিপির অর্থ হিসাব কষে লোকসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে মোদ্দাকথায় মাথাপিছু আয়ের হিসাব হয়। সেটা এখন ২ হাজার ৮২৪ ডলার। প্রান্তিক চাষী, সাধারণ মানুষ, মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত যারা করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের ভাগেও ওই পরিমাণ অর্থ দেখানো হচ্ছে। অথচ জিডিপি বা উন্নয়নের সুফল সব জায়গায় সমানভাবে দৃশ্যগত হচ্ছে না, দলমত নির্বিশেষে সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না। ফলে কারো কারো অর্থবিত্ত, ধনসম্পদ বেড়েছে ঠিকই, সবার হয়নি। কারো কারো মধ্যে অস্বাভাবিক আয়-ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া অর্থকে ভাগ করে দেখানো হচ্ছে সবার মাথাপিছু আয় বেড়েছে। আসলে তো সবার বাড়েনি। জিডিপির হিসাবায়নের মধ্যে, জিডিপিকে বড় করে দেখানোর মধ্যে এ প্রশ্নগুলো আসছে যে জিডিপি আয় উন্নয়ন পরিসংখ্যানে আছে, বাস্তবে এর তেমন প্রতিফলন নেই। জিডিপির আকার দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যয় বা বাজেটের আকারও ক্রমান্বয়ে বেড়েই যাচ্ছে। জিডিপি বৃদ্ধিটাকে কেউই অযৌক্তিক মনে করবে না, যদি এটি সবার মধ্যে পরিব্যাপ্ত হয়, যদি প্রশ্ন না ওঠে কোন খরচ কীভাবে বাড়িয়ে সম্পদ ও সেবা সৃষ্টির মাধ্যমে বা ব্যতিরেকে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ঘটছে।

দু-এক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে বাজেট ঘাটতি বেশ বাড়ছে। করোনাকালে অর্থনীতির অসুস্থতার কারণে রেভিনিউ আয় কমে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে এটা ঘটছে। আয় কমে গেলেও ব্যয়ের বাজেটের আকার বহাল তবিয়তে বড় থাকায় ঘাটতি বাড়ছে। তা মেকআপ করতে কঠিন শর্তের ঋণ বাড়ছে। মেগা প্রকল্পে বড় ব্যয় ঠিকই করে যেতে হচ্ছে, উপায় নেই। অর্থনীতিতে এ ব্যয়ের উপযোগিতা বা রিটার্ন আসাটা বারবার বিলম্বিত হচ্ছে। সম্পদ ও সেবা সৃষ্টি না হয়েও এর বিপরীতে কৃচ্ছ্র, ব্যয়সংকোচন, বড় ব্যয়ে ব্যয়সাশ্রয়ী না হওয়ায় ঋণের অর্থটাও জিডিপিতে হিসাবায়িত হচ্ছে কিনা এ সংশয় তৈরি হচ্ছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক ভর্তুকি, বিনিয়োগে আকাশচুম্বী প্রণোদনা দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ আজ উদ্বৃত্ত এবং আমদানীকৃত জ্বালানি বিতরণ ও ব্যবহারে সমন্বয় সাধনে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কঠিন শর্তের আমদানি এবং উচ্চ সুবিধা ছাড় ও প্রণোদনায় উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুতের হিসাব জিডিপি মোটাতাজাকরণে আদৌ কোনো ভূমিকা রাখছে কিনা, এর গণজ্ঞাপন সংশয়-সন্দেহ নিরসনে সহায়ক হবে।

জিডিপির সঠিক হিসাবায়ন বা প্রক্ষেপণ ব্যতিরেকে বাজেট তৈরি করলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বিপত্তি ঘটে। সম্প্রতি সম্পদ কমিটির সভায় ২০২১-২২ অর্থবছরে জিডিপির অংশ হিসেবে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ। সেখানে ভিত্তি বছর ধরা হয়েছে ২০০৫-০৬। অথচ ২০২২-২৩-এর বাজেট জিডিপির অংশ হিসেবে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। সেখানে ভিত্তি বছর ধরা হয়েছে ২০১৫-১৬ অর্থবছর। পাশাপাশি সদ্য দুটি অর্থবছরের বাজেটে দুই ধরনের ভিত্তি বছরের মধ্যেই জিডিপি প্রক্ষেপণের শুভংকরের ভূত আছে কিনা তা স্পষ্ট করলে সংশয় কাটবে সবারই।

জিডিপি হিসাবায়নে সর্বশেষ ভিত্তি বছর ছিল ২০০৫-০৬। ২০১০-১১-এর দিকে নীতিনির্ধারকরা সংগত কারণেই জিডিপি হিসাবায়নে ভিত্তি বছর ঠিক করতে উদ্যোগী হন। এর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল সঠিকভাবে জিডিপিকে তুলে ধরা। এজন্য পাঁচটি কার্যকর প্রকল্প যেমন (১) ডাটা কনভারস, মেটা ডাটা প্রিপারেশন অ্যান্ড টাইম সিরিজ ডাটা কম্পাইলেশন, (২) সার্ভেইস অ্যান্ড স্টাডিস রিলেটিং টু জিডিপি রিবেসিং ২০১৫-১৬, (৩) ইমপ্রুভিং অব জিডিপি কম্পাইলেশন অ্যান্ড বিবেসিং অব ইনডিসেস প্রজেক্ট, (৪) ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর দ্য ডেভেলপমেন্ট অব স্ট্যাটেস্টিক ইমপ্লিমেন্টেশন সাপোর্ট (এনএসডিএস), (৫) মর্ডানাইজেশন অব ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টস স্ট্যাটিস্টিকস প্রজেক্ট নেয়া হলো। কিন্তু দেখা যাচ্ছে জিডিপি হিসাবায়ন ও প্রক্ষেপণ প্রক্রিয়াকে এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে যে তাতে অর্থনীতি তথা জিডিপিতে অনেকটা গরু মোটাতাজাকরণের মতো অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে বলে চিন্তা চৌবাচ্চা (থিংক ট্যাংক) থেকে শুরু করে অভিজ্ঞ-অনভিজ্ঞ সব মহলে। ধারণা জমছে ভিত্তি বছরের হিসাবায়ন পদ্ধতি ভিন্নভাবে প্রক্ষেপণের মাধ্যমে বোঝানো হচ্ছে জিডিপির তুলনায় সরকারের পরিচালনা ব্যয় কমানো হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে কি তাই?

সম্প্রতি একটি ধারণা দেয়া হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দুটো দেশের জিডিপি যোগ করলে বাংলাদেশের চেয়েও কম। কোনো অর্থনীতির আকারের সঙ্গে আরেকটা দেশের অর্থনীতির আকার যোগ করলে এবং তৃতীয় আরেক অর্থনীতির সঙ্গে তার তুল্যমূল্য করতে হলে দেখতে হবে স্ব স্ব অর্থনীতির অবয়ব ও চ্যালেঞ্জগুলো কী। এটা না দেখে দুই দেশের সম্মিলিত জিডিপি তৃতীয় দেশের চেয়ে কম বলাটা শাস্ত্রসম্মত ও সমীচীন হয় না। কেননা প্রতিটি অর্থনীতিই অবস্থান, কাল ও চ্যালেঞ্জভেদে আলাদা এবং অবশ্যই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। দুদিন আগে যে অর্থনীতি ছিল সুনামের, নানান কারণে তা এখন দুর্দশায় পড়তে পারে। তাই বলে তার চেয়ে অন্য অর্থনীতি এখন এমন ভালো আছে যে দুর্দশাগ্রস্ত অর্থনীতির মতো হবে না—এ আপ্তবাক্য উচ্চারণের জন্য জিডিপির এ ধরনের তুলনা যথার্থ নয়। সক্ষম অর্থনীতিটি সত্যি সত্যি বড় হয়েছে কিনা, টেকসই হবে কিনা, যে অপ-পদক্ষেপের কারণে আজ তাদের এই পরিণতি সে পথে উন্নয়নগামী অর্থনীতিটি সতর্ক আছে কিনা, তা তুলে ধরতে হবে। পরস্পরের উন্নয়নের সূচকগুলো অনুপুঙ্খ দৃষ্টিতে খতিয়ে দেখতে হবে।

এজন্যই প্রয়োজন জিডিপিকে উল্লেখ করে যখন বাজেট প্রক্ষেপণ বা দেখানো হয়, তখন যেন শাস্ত্রীয় অনুশাসন বা নিয়মের মাধ্যমে দেখানো হয়—এটা নিশ্চিত করতে হবে। নইলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। এখানে আরেকটা বিষয় উল্লেখ করা দরকার। এডিবি বা বিশ্বব্যাংক প্রায়ই সদস্য দেশের জিডিপির একটা প্রাক্কলন করে। এটিকে সদস্য দেশগুলো নিজেদের উন্নয়নের সার্টিফিকেশন তথা তৃপ্তি কিংবা হতাশার কারণ হিসেবে নেয়। ভালো করে যদি পরীক্ষা করে দেখা যায় তাহলে দেখা যাবে এডিবি বা বিশ্বব্যাংকের মতো বহুজাতিক সংস্থা তাদের সদস্য দেশের ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টকে সূত্র হিসেবে ব্যবহার করে। নিজে নিজে মনগড়াভাবে কিছু বলে না বলেই সদস্য দেশের ন্যাশনাল অ্যাকাউন্ট ইনফ্লেটেড হলে তাদের প্রাক্কলনও সঠিক হয় না। তাদের পূর্বাভাসে ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টেরই প্রতিফলন ঘটে। অনেক সময় সে কারণে তারা সেটি রিভাইজও করে। সুতরাং আমাদের তাকাতে হবে আমাদের দিকে। আমাদের হিসাবায়নটা ঠিক হচ্ছে কিনা, সেটা দেখতে হবে।

স্বাধীনতার আগে ১৯৭০ সালে নির্বাচনের সময় বঙ্গবন্ধু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—আমরা পূর্ব পাকিস্তানিরা ক্ষমতায় গেলে বা স্বায়ত্তশাসন পেলে আট আনা সের দরে চাল পাওয়া যাবে। সবাই সরল মনে তা বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু নানা কারণে (যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন, ’৭৩-এর অয়েল শক, ’৭৪ সালে বড় বড় বন্যা ও খাদ্য সরবরাহে বিশ্বরাজনীতি) মূল্যস্ফীতি বেড়ে গিয়েছিল বলেই চালের দাম বেড়েছিল। এ কথা কিন্তু রাজনৈতিক অর্থনীতির মারপ্যাঁচ অনুধাবনে অক্ষম সাধারণ মানুষ সহজেই বুঝতে পারেনি। আট আনা সের দরের চাল কেন ১০ টাকা—এ প্রশ্ন পরিব্যাপ্ত হলো। সে কারণে পাবলিক পারসেপশনকে স্পষ্ট রাখতে হবে। এ কারণে যে এ অর্থনীতি সবার অর্থনীতি, আমজনতার, কতিপয়ের হতে পারে। টোল, রাজস্ব তো মানুষই দেবে। তারাই সরকারি উপযোগ বা সেবা ভোগ করবে। কাজেই একটা প্রকল্পে সত্যিই কত খরচ হয়েছে, খরচটা কেন বেড়েছে, কী হচ্ছে—এসব প্রশ্ন ওঠে। এসব প্রশ্ন জাতীয় ঐক্য, আঞ্চলিক উন্নয়নের স্বার্থে খোলাসা হওয়া দরকার। পদ্মা সেতু হলে জিডিপি ২ শতাংশ বাড়বে, তা অর্থবহ করতে জিডিপির হিসাবায়নে তখন যাতে সমস্যা না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখার প্রয়োজনীয়তা আবশ্যক হবে। বলা হচ্ছে, পদ্মা সেতু নিজের টাকায় হচ্ছে। আসলে তা নয়। বিভিন্ন বাজেট সাপোর্ট ও কঠিন শর্তের ঋণ বাজেটে এনে বাজেটের টাকায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে। প্রকৃত প্রস্তাবে কঠিন শর্তের ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে। জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে জনগণ এটা জানবে—একটা বড় কাজ করতে গেলে এটা লাগবে। সে বোধ-বিশ্বাসকে টেকসই করতে প্রকল্পটি সময়মতো শেষ করার ব্যাপার, উপযোগিতার ব্যাপার, যৌক্তিকতার ব্যাপারগুলো তো জবাবদিহিতার আওতায় আনা আবশ্যক হবে। সুনির্দিষ্ট কোনো প্রকল্প শুধু কি প্রকল্পের জন্য বানানো হচ্ছে নাকি কার্যকরভাবে উপযোগিতা পাওয়ার জন্য বাস্তবায়নে এত টাকা ঢালা হচ্ছে, এ প্রশ্ন তো উঠবে। এ ধরনের প্রকল্প বা অনেক কিছু দিয়ে বাজেট হয়তো বড় হচ্ছে, সেখানে জবাবদিহিতা-সুশাসনের বিষয়টি স্পষ্ট না হলে আমজনতার মনে এ ব্যয়ের দায়দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই থাকবে।

এবার আসি প্রাক্কলিত বাজেট সম্পর্কে। গত দুই বছরে সবাই অভিমত প্রকাশ করেছিলেন, এবারো করছেন যে করোনাকালের বা করোনাবিধ্বস্ত অর্থনীতি থেকে উত্তরণের বাজেট বানানো হবে। করোনাকে কীভাবে মোকাবেলা করা হবে এবং এর জন্য কী কী করা হবে, সেই নীতিগত ব্যবস্থাপত্র বাজেটে রাখা দরকার। যেমন করোনার জন্য স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ একটু বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে কিন্তু তার সঠিক বাস্তবায়ন হয়েছে কিনা, সেদিকে নজর রাখতে হবে। শুধু বাড়িয়ে যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, না বাড়ালে চলমান প্রকল্পগুলো সময়মতো শেষ করা যাবে না। এ যুক্তি ঠিক আছে। কিন্তু বাড়ানোর জন্য তথ্যের বা অর্থের জোগান কীভাবে হবে, সে বিষয়টিও জনগণের কাছে পরিষ্কার করতে হবে। ঋণ করে ঘি খাওয়া বাস্তব অবস্থার পরিচায়ক নয়। মোটাদাগে ধার-কর্জ করার অর্থ বিনিয়োগ করে সেই বিনিয়োগের আয় বা উপকার যত তাড়াতাড়ি সবার আয় উপার্জনের সক্ষমতা বাড়াবে, জিডিপির সংখ্যাগত অবয়ব ততটা পুষ্টিকর অর্জন বলে বিবেচিত হবে। ধার-কর্যের টাকা কিংবা নিজস্ব অভ্যন্তরীণ আহরিত রাজস্ব যদি উন্নয়নের নামে ব্যয়কালে বেহাত হয়ে যায় বা ক্ষরণ ঘটে তাহলে তো জিডিপির সংখ্যাগত স্ফীতি বা স্বাস্থ্যকে সুস্থ বলা যাবে না।

অবস্থাদৃষ্টে আসন্ন বাজেটটি বিশেষ অবয়ব ও বাস্তবায়ানুগ আকারে বানানো যেতে পারে। তিন বছর মেয়াদি বাস্তবায়নযোগ্য বিদ্যমান বাজেট প্রণয়ন কাগজে-কলমে না রেখে একে বাস্তবায়নমুখীকরণে পদ্ধতি, প্রক্রিয়া ও জবাবদিহির সংস্কার করতে হবে। এখন এক বছরের বড় একটি বাজেট করে ব্যয় বাস্তবায়ন শুরু করা হয়। ওইদিকে রেভিনিউ আয় ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলো থেকে পাওনা টাকা আদায়ের ব্যবস্থা না থাকায় ঘাটতি পূরণে প্রচুর ঋণ করতে হয়, এটি প্রমিতকরণে কী করণীয় সেটি নিয়মিত পর্যালোচনা না করে বিনা জিজ্ঞাসাবাদে জবাবদিহিহীনভাবে সম্পূরক বাজেটে তা অনুমোদিত হয়। আগের আয়-ব্যয় দেখে বা তার ভিত্তিতে পরবর্তী বাজেট বানানোর সনাতন পথ-পদ্ধতি এড়িয়ে বা মাড়িয়ে যাওয়া হয়। সংশোধিত বাজেটে আয়-ব্যয়ের পরিমাণ কী দাঁড়িয়েছে তার ভিত্তিতেই বাজেট বৃদ্ধি হওয়ার পরিবর্তে গত বছর মূল বাজেটের একটা জুতসই বৃদ্ধি ধরে পরবর্তী বাজেট হচ্ছে, অর্থাৎ বাস্তবায়নের বিষয়টি ভালো করে না নিয়ে কেন হয়নি, কেন আসেনি, কেন ব্যবস্থা নেয়নি, সেটি না দেখে ক্রমান্বয়ে বাজেট বাড়ালে তা কার্যকর হয় না। এ কারণে একটা ত্রিবার্ষিক পরিকল্পনা নেয়া দরকার। করোনা-পরবর্তী বিধ্বস্ত অর্থনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে এক বছরের মেয়াদে বাজেট ঘোষণা ও বাস্তবায়ন তদারকযোগ্য এবং খুব একটা সুফলপ্রদায়ী হবে না। এমনকি নির্বাচনমুখী ভোটার তোষণ বাজেটও অর্থবহ প্রতিভাতকরণ কঠিন হবে।

গত দুই বছরে বিশেষ করে করোনাকালে এমনভাবে বাজেট প্রাক্কলন, প্রস্তাব ও পাস করা হয়েছে যে মনে করা হয়েছে করোনায় এ অর্থনীতিতে যেন কিছুই হয়নি; যেন এ অর্থনীতি খুব ভালো অবয়বে আছে। সব ঠিক আছে। চমত্কার চলছে অর্থনীতি। এ ধারণা প্রমাণ করার জন্য করোনা পূর্বকালের স্টাইলে ব্যয়ে বাজেট প্রক্ষেপণ অব্যাহত রয়েছে। আয় অনুযায়ী কৃচ্ছ্রসাধন, অপব্যয়-অপচয় ও দুর্নীতি রোধের দৃষ্টিতে বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনায় না আনায় অসামঞ্জস্য, সমন্বয়হীনতা, সামগ্রিক বিশৃঙ্খলা কিংবা নানা ধরনের কথাবার্তা সৃষ্টি ও মানুষের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। আশঙ্কা তৈরি হলে আস্থা না বাড়লে পরিস্থিতি মোটেই ভালো হবে না; উন্নয়ন টেকসই হতে আরো সময় লাগবে। সে সুবাদে অর্থনীতিতে সৃজিত রেজিলিয়েন্ট পাওয়ার হবে দুর্বল বা ক্ষতিগ্রস্ত। বিপুল ঋণ নেয়া হয়েছে, সেগুলো শোধ না করতে পারলে ধস নামতে পারে—এ ধারণাগুলো যদি পরিষ্কার করা না যায় তাহলে বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হবে। সুতরাং তিন বছর মেয়াদি বাজেট করা যুক্তিযুক্ত হবে। এমনিতে ২০০৭-০৮ থেকে একটা থ্রি ইয়ার্স রোলিং প্ল্যান নামে একটা সিস্টেম বিদ্যমান। তিন বছরের একটা প্রক্ষেপণ করা হয়ও। অর্থ বিভাগ থেকে একটা বইও বের করা হয়। মিডটার্ম রিভিউ করার একটা প্রবিধান আমাদের আইনের ভেতরেই আছে। সেই রিভিউ সিস্টেম কার্যকর রাখতে হবে এবং বাজেট প্রাক্কলনের সঙ্গে তা সংযুক্ত রাখাই হবে যুক্তিযুক্ত।

প্রকৃত প্রস্তাবে জিডিপি বাড়িয়ে দেখালে সবাই খরচের ব্যাপারে অনেক বেশি উদার হয়ে যায়। বিশ্বপরিসরে দেখানো যায় এ অর্থনীতি খুব ভালো অবস্থায়। তখন দাতারা আরো বেশি ঋণ দিতে আগ্রহী হয়, যদি প্রকৃত অবস্থাটা না দেখানো হয় তাহলে বিদেশী বিনিয়োগকারী ও দাতারা বিভ্রান্ত হয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো জনগণ। জনগণ দেখবে আমাদের অর্থনীতি বড় হচ্ছে। কাজেই সেখানে বেশি খরচ করলে অসুবিধা কী আছে, আমরা তো পাবই। কিন্তু যদি দেখা যায় এ উন্নয়নের দ্বারা সক্ষমতা প্রসারিত হয়নি, রোগ প্রতিরোধের অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়েনি, প্রতিষেধক প্রাপ্তির নিশ্চয়তা হয়নি, স্বাস্থ্যসেবা ও গুণগত শিক্ষালাভের সুযোগলাভ হয়নি, আমজনতা অকালমৃত্যুকে জয় করতে পারেনি, তার যথেষ্ট পুষ্টির ব্যবস্থা হয়নি, তারা পরস্পর চিন্তার আদান-প্রদান করতে বা শিখতে পারছে না, তাহলে হতাশ হবে।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য, রেমিট্যান্স, রফতানি, বিদেশী ঋণের টাকায় রিজার্ভ বেড়েছে। জনসাধারণের ধারণা, রিজার্ভ বাড়া মানে বোধ হয় সরকারের-দেশের বিরাট উন্নতি হয়েছে। এটা ঠিক রিজার্ভ কম থাকলে বহির্বাণিজ্যে দেশ ও অর্থনীতির গ্রহণ বা বিশ্বাসযোগ্যতা (ক্রেডিট ওয়ার্দিনেস) থাকে না, আমদানি বিল মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে, বিদেশীরা বিনিয়োগে আগ্রহী হন না। আবার সেই রিজার্ভ বেশি বাড়ার ফলে এ ধরনের একটা মানসিকতা তৈরি হয় যে চাইলে আমরা যা-তা কিনতে বা পেতে পারি; যা ইচ্ছা তাই খরচ করতে পারি। অন্য কোনো দেশকে ধার দিতে পারি। দেশ থেকে বিদেশে বিনিয়োগের সিলিং বাড়াতে বা অবারিত করে দিতে পারি। সেদিন পত্রিকায় দেখলাম গত তিন বছরে বেসরকারি খাতেও বিদেশী ঋণ বেড়েছে। এমনটা হলেও বিপজ্জনক। রিজার্ভ বেড়েছে এটা ঠিক আছে। আবার রিজার্ভ বেড়ে একটা পর্যায়ে স্থিতিশীল থাকাটাও আশঙ্কাজনক। দেখা যাচ্ছে রিজার্ভ আছে বলে কঠিন শর্তে ঋণও নেয়া হচ্ছে। এসব প্রবণতা মোটেই ইতিবাচক নয়। সুতরাং সব দিক বিবেচনা করে আগামী বাজেটগুলো (এক বাজেটে হবে না) প্রণয়ন করতে হবে। বাজেটটা বাস্তবভিত্তিক করতে হবে। বাস্তবায়নযোগ্য করতে হবে। এক্ষেত্রে তিন মাস অন্তর পর্যালোচনা করতে হবে। জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। তবেই বাজেট সত্যিকার অর্থে জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা জনগণের বাজেট হবে।

 

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সাবেক সচিব

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান




  এ বিভাগের অন্যান্য