www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

খাদ্যশস্য উৎপাদনের তথ্যে ব্যবধান ৪০ লাখ টন


 এগ্রিবার্তা ডেস্ক    ১৭ মে ২০২২, মঙ্গলবার, ৯:৩৯   কৃষি অর্থনীতি  বিভাগ


কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের পাশাপাশি ভোক্তাদের সুরক্ষায় প্রয়োজন কৃষিপণ্য উৎপাদনের সঠিক তথ্য। উৎপাদন কম হলে দ্রুত আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া এবং বেশি হলে আমদানি বন্ধ কিংবা শুল্কারোপের প্রয়োজন হয়। তবে দেশে সরকারি প্রধান দুটি প্রতিষ্ঠানের খাদ্যশস্য উৎপাদনের তথ্যে দেখা গিয়েছে বড় ধরনের বৈসাদৃশ্য। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের খাদ্যশস্য উৎপাদনের তথ্যে ব্যবধান রয়েছে ৪০ লাখ টনের বেশি।
 
দেশের খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) সভায় খাদ্যশস্যের উৎপাদন-সংক্রান্ত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। সভায় বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে উৎপাদনের তথ্যে গরমিল ছাড়াও নীতিসহায়তার বিষয়ে আলোচনা হয়। বিবিএস বলছে, গত অর্থবছর খাদ্যশস্য (চাল, গম ও ভুট্টা) উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ২৮ লাখ ৯ হাজার টন। তবে কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত অর্থবছর মোট খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ৬৮ লাখ ২৯ হাজার টন। সে হিসাবে খাদ্যশস্য উৎপাদন নিয়ে সরকারি এ দুই সংস্থার তথ্যে ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৪০ লাখ ২০ হাজার টন।
বিবিএসের হিসাবে ভুট্টা উৎপাদন ৪১ লাখ ১৬ হাজার টন হলেও কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে তা ৫৬ লাখ ৯৩ হাজার টন। অর্থাৎ ভুট্টা উৎপাদনে পার্থক্য প্রায় ১৫ লাখ ৭৭ হাজার টন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যে মোট চাল উৎপাদন ৩ কোটি ৯৮ লাখ ৩৭ হাজার টন হলেও বিবিএসের তথ্যে তা ৩ কোটি ৭৬ লাখ ৮ হাজার টন। দুই সংস্থার চাল উৎপাদনের তথ্যে পার্থক্য প্রায় ২২ লাখ ২৯ হাজার টন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে গম উৎপাদন ১২ লাখ ৯৯ হাজার টন হলেও বিবিএসের তথ্যে তা ১০ লাখ ৮৫ হাজার টন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সঠিক তথ্য না থাকার কারণে নীতিপরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। ফলে মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন খাদ্যশস্য, বিশেষ করে চালের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। কৃষি মন্ত্রণালয়কে প্রাথমিক তথ্য সরবরাহ করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)। বিশ্লেষকদের মতে, এক্ষেত্রে তাদের আরো সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। এছাড়া তথ্য জরিপের ক্ষেত্রে দুটি সংস্থার মধ্যে আরো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও স্যাটেলাইটের সহযোগিতা নিতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে পর্যবেক্ষক হিসেবে রেখে তথ্যের মান যাচাই করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএইর মহাপরিচালক মো. বেনজীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, কৃষিপণ্য বিশেষ করে দানাদার খাদ্যশস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে দুটি সংস্থার মধ্যে তথ্যগত পার্থক্য রয়েছে। সেটি আরো কমিয়ে আনার জন্য আমরা আধুনিক প্রযুক্তি ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণাদির সহায়তা নিচ্ছি। এছাড়া কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। এজন্য প্রযুক্তি বিষয়ে বিবিএসের সঙ্গে সার্বক্ষণিক বৈঠক করা হচ্ছে। আগামীতে এ পার্থক্য কমে আসবে বলে প্রত্যাশা করছি।
বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে আউশ চাল উৎপাদন হয়েছে ৩২ লাখ ৮৫ হাজার টন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, একই বছর আউশ চাল উৎপাদন হয়েছে ৩৬ লাখ ৪৫ হাজার টন। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩৪ লাখ ৮৪ হাজার টন আউশ উৎপাদন হবে বলে কৃষি মন্ত্রণালয় লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে বিবিএসের প্রাক্কলন হচ্ছে চলতি অর্থবছরে আউশ উৎপাদন হবে ৩০ লাখ টন। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে আমনের প্রকৃত উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৪৪ লাখ ৩৮ হাজার টন। যদিও একই বছরে আমন চাল উৎপাদন ১ কোটি ৫৬ লাখ ১১ হাজার টন ছিল বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এছাড়া চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ কোটি ৫০ লাখ ৪৬ হাজার টন আমন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
এদিকে বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে বোরোর প্রকৃত উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৯৮ লাখ ৮৫ হাজার টন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, একই বছর বোরো চাল উৎপাদন হয়েছে ২ কোটি ৫ লাখ ৮১ হাজার টন। এছাড়া চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে ২ কোটি ৯ লাখ ৫১ হাজার টন বোরো উৎপাদন হবে বলে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে মন্ত্রণালয়।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. এম আসাদুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা যে হিসাব দেন সেটা সঠিকভাবে পরিমাপ করে দেন না। তারা সবসময় বাস্তবতার চেয়ে বেশি জমিতে বেশি ফলন হয়েছে, এমন তথ্যই দেন। তবে বিবিএস অনেকটা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য নিয়ে হিসাব দেয়। তাই বিবিএস যে তথ্য দেয় সেটিই বেশি গ্রহণযোগ্য। তবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য নিলে প্রকৃত উৎপাদনের চেয়ে কিছুটা কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই প্রকৃত তথ্য পেতে হলে কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিবিএসকে যৌথভাবে হিসাব করতে হবে।
দুই সংস্থার উৎপাদন তথ্যের ব্যবধান অনেক বেশি উল্লেখ করে তিনি বলেন, তথ্যে এত বেশি গরমিল থাকলে সঠিক নীতিপরিকল্পনা গ্রহণ করা যায় না। এর আগে বিআইডিএসও একটা সার্ভে করেছিল। সেখানেও দেখা গিয়েছে, সরকার যতটা উৎপাদনের কথা বলে, প্রকৃত উৎপাদন ততটা নয়। চাহিদা স্থির থাকে। তবে উৎপাদনের তথ্যে গরমিল থাকার কারণে সরবরাহ ঠিক থাকে না। তখনই বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়।



  এ বিভাগের অন্যান্য