www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

রফতানি বৈচিত্র্যের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতির বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা


 শেখ বশির উদ্দীন    ৬ জুলাই ২০২২, বুধবার, ৯:১০   সম্পাদকীয় বিভাগ


রফতানিতে ৫০ বিলিয়ন ডলারের অর্জন দেশের জন্য অবশ্যই একটি মাইলফলক। কৃষিজাত পাটপণ্য দিয়ে রফতানি খাতের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এখন সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে বস্ত্র ও পোশাক শিল্প। এ শিল্পের হাত ধরে দেশে অনেক ধরনের শিল্পপণ্য উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে দেশের অর্থনীতিতে এ শিল্পের ভূমিকার ব্যাপ্তিও অনেক বেশি। ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিল্পটি উদ্যোক্তা গড়ে তোলার পরের ধাপে একই উদ্যোক্তার বিনিয়োগের ক্ষেত্র আরো বিকশিত করেছে। আমাদের দেশেও সে রকম চিত্র এখন দেখা যাচ্ছে।

এদিকে পাটপণ্য দিয়ে যে রফতানির অগ্রযাত্রার শুরু সেটি কয়েক বছর ধরেই একটা স্থির অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। তেমন একটা এগোতে পারছে না। কারণ আমরা গতানুগতিক পণ্যের বাইরে বের হতে পারছি না। এটি একমাত্র শিল্প খাত, যেটির কাঁচামাল একেবারেই অভ্যন্তরীণ। যৌক্তিকভাবেও আমাদের উৎপাদনশীলতা আমরা একেবারেই বাড়াতে পারিনি। কৃষি থেকে শুরু করে পাট ও পাটজাত পণ্যের ভোক্তা পর্যন্ত যে সুযোগ বাজারে রয়েছে, সেখানে অনেকগুলো ডট আছে। এ ডটগুলোর সংযোগ ঘটানো হয়নি সঠিকভাবে। ফলে খাতের প্রকৃত সম্ভাবনা বিকশিত হয়নি। খাতটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বিকশিত হওয়া প্রয়োজন।

পাট কৃষিজাত পণ্যের একটি শিল্প। এ খাতে আমাদের দেশের ঐতিহ্য অনেক পুরনো। এ খাতের সম্ভাবনা এখন নির্ভর করছে আপনি কী পণ্য ব্যবহার করছেন তার ওপর। পাট প্রাথমিকভাবে র্যাপিং উপকরণ হিসেবেই ব্যবহার হয়। আমি একটি পণ্যকে দুভাবে দেখি, একটি ফিজিক্যাল প্রপার্টি, আরেকটি অ্যাসথেটিক প্রপার্টি। আমার কাছে মনে হয়, এ মুহূর্তে পাট বস্তার মাধ্যমে র্যাপিং ম্যাটেরিয়াল হিসেবে ভ্যালু ক্রিয়েট করে। আর কার্পেট বোনার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। এর সম্ভাবনা যদি বিবেচনা করা হয়, তাহলে দেখা যাচ্ছে আমাদের দেশ থেকে পাটের রফতানি সর্বোচ্চ ১ বিলিয়ন ডলারের মতো। জিডিপির প্রেক্ষাপটে ভাবলে এর অবদান খুব বেশি না। এখন জিডিপিতে অবদান খুব বেশি না হলেও ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাচ্ছে, এটা আমাদের জিডিপির বড় একটা অংশ জুড়ে ছিল। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে চা ও পাট এই দুটোই আমাদের রফতানি বাণিজ্যের সিংহভাগ দখল করেছিল। আমাদের আমদানি ব্যয় মেটাতে এ দুই পণ্যের ওপর খুব নির্ভর করতে হতো। যদি বলেন, এ খাতের ১০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা আছে কিনা, আমি বলব নেই। আমার মনে হয় না যে খুব নিকট ভবিষ্যতেও ১০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা আছে। কিন্তু বর্তমান ১ বিলিয়ন ডলারের শিল্পটি অংশীজন বিচারে ব্রড বেইজ। কারণ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষিপণ্যটির মূল্য সংযোজন সক্ষমতা ব্যাপক। একজন কৃষক থেকে শুরু করে শিল্পপতি পর্যন্ত ইকোনমিক ফ্রিকোয়েন্সি অনেক বড় ও গভীর। সেই প্রেক্ষাপটে কাজ করার জন্য পাট খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পণ্য। এ মুহূর্তে সরকারি মালিকানাধীন পাটকলগুলোর রূপান্তরের বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে। ব্যক্তি খাতের পাটকলগুলো আরো বেশি সম্মুখসারিতে অবস্থান নিচ্ছে। আকিজ গ্রুপের প্রেক্ষাপটে গ্রুপের মৌলিক ভিত্তিই ছিল পাট। এখন দেশের পাট খাতের অন্যতম বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান আমাদের। এ খাতের উন্নয়ন সম্ভাবনার মাত্রা অনেক বেশি ওপরে। পাট শিল্পকেও সঠিক সৃজনশীলতার মাধ্যমে এগিয়ে আসতে হবে। ভবিষ্যতে প্রচলিত রফতানি পণ্যের পাশাপাশি পাটের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে রফতানি আরো অনেক দূর এগিয়ে যাবে, এমন প্রত্যাশা করছি।

এদিকে সিরামিকের সম্ভাবনাও অনেক বড়। বিশেষ করে তৈজসপত্রে। ২০১২ সালে যাত্রা শুরু হয় আকিজ সিরামিকসের। টাইলস, স্যানিটারিওয়্যারের পর এখন টেবিলওয়্যারের মতো উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্যের উৎপাদন শুরু করেছে আকিজ সিরামিকস। সিরামিক পণ্য বিশেষ করে পোরসেলিনের তৈজসপত্র, টেবিলওয়্যার উৎপাদনের জন্য যে ধরনের কাঁচামাল লাগে, আর পোরসেলিনের টাইলসের ক্ষেত্রে কাঁচামাল একই। তফাতটা হচ্ছে পিওরিটি বা বিশুদ্ধতা। বিশুদ্ধতার মাত্রাটা অনেক বেশি উন্নত। কাঁচামালগুলো খনিজ, আমাদের দেশে এ ধরনের খনিজ কিছু আছে, তবে খুবই সামান্য। কিন্তু বিভিন্ন পরিবেশগত দিক বিবেচনায় এগুলো উত্তোলনে সরকারের বিধিনিষেধ রয়েছে। আমার মনে হয় এখন সেই বিধিনিষেধ শিথিল করা যেতে পারে। কারণ এ পণ্যের কাঁচামালের জন্য আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়।

আন্তর্জাতিক বাজারে সিরামিকের বাণিজ্য খেয়াল করলে দেখা যাবে সেটা হয়তো ৪০ হাজার কোটি টাকার। বাংলাদেশ থেকে এ শিল্পের যেভাবে বিকাশ হয়েছে, তাজমা সিরামিকস প্রথম কোম্পানি পাকিস্তান আমলের। এরপর পিপলস সিরামিক এসেছে, মুন্নু সিরামিক এসেছে, শাইনপুকুর, ফার, প্যারাগনসহ আরো অনেকে। একটা বিপ্লব এসেছে এ শিল্পে। আন্তর্জাতিক বাজার যদি ৪০ হাজার কোটি টাকার হয়ে থাকে, সেখানে আমাদের বাজার যদি ৪০০ কোটি টাকার হয়ে থাকে, তাহলে এটা পরিষ্কার যে এখানে বিপুল সম্ভাবনা আছে। ব্যবসার পরিকল্পনা যদি সঠিকভাবে করা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে বিপণনযোগ্যতা যদি থেকে থাকে, আমার মনে হয় আমরা যেভাবে ভালো একজন কাস্টমার খুঁজি, তেমনি ভালো কাস্টমারও কিন্তু ভালো একজন সরবরাহকারী খোঁজে। এটা দ্বিপক্ষীয় একটা বিষয়। আস্থা সৃষ্টি করতে পারলে কাস্টমার নিজেই ভালো সরবরাহকারী বানিয়ে নেয়। ফলে আমি মনে করি সিরামিক পণ্যের রফতানি সম্ভাবনা ব্যাপক। ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশে উৎপাদিত তৈজসপত্রের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এবং বর্তমানে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকার রফতানি করছে। তবে চাহিদা পূরণে এটি যথেষ্ট নয়, এখানে আমাদের সক্ষমতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং আমরা সামনের ১০-১৫ বছরে রফতানি বাজারে বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ বৃদ্ধির সুযোগ দেখতে পাচ্ছি।

দেশে শিল্পোদ্যোক্তারা বিনিয়োগের অনেক ক্ষেত্র নিয়ে আশাবাদী। তারা সম্ভাবনা অনুধাবন করেই আশাবাদী হন। তবে নানা প্রতিবন্ধকতায় নিরুৎসাহিতও হন। বিশেষ করে জ্বালানি নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে আমি যদি গ্যাস সংযোগের বিষয়টি উদাহরণ হিসেবে বলি, সেখানে দেখা যাচ্ছে যে কাজটি সাতদিনের সেই কাজটিই সম্পন্ন হতে বছর গড়িয়ে যাচ্ছে।

এদিকে কর্মী বাহিনীর বেতন নিয়ে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা সেই চাপ মোকাবেলা করেই এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রতিবন্ধকতার প্রভাব ইতিবাচক কোনো কিছু নিয়ে আসছে না। একজন উদ্যোক্তা সবসময়ই তার পুঁজির সুরক্ষা চান। সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনার বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। আমি মনে করি রফতানিকে ঘিরে বৈচিত্র্যকরণের ভাবনার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতির বৈচিত্র্য। আর এক্ষেত্রে অনেক গভীরে চিন্তাভাবনা করার সুযোগ রয়েছে। রফতানির বৈচিত্র্যের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতির বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা। আমাদের অনেক পণ্য আমদানি করতে হয়। সেই পণ্যগুলো স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদনের বিষয়ে ভাবতে হবে। আবার রফতানির ক্ষেত্রেও দেখতে হবে কোন খাতে আমাদের রিটেনশন ভালো। নিট রফতানি বাড়ছে কিনা সে বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।




  এ বিভাগের অন্যান্য