www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

ড. মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন, ড. মো. কামরুল হাসান

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, সারের মূল্যবৃদ্ধি ও আমাদের করণীয়


 এগ্রিবার্তা ডেস্ক    ৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, বুধবার, ১১:১০   সম্পাদকীয় বিভাগ


কভিড-১৯-পরবর্তী বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংকট বিশেষ করে রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সারা বিশ্বে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজমান। দ্বৈত সংকটে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা। কারণ, ফসল উৎপাদন এখন রাসায়নিক সারনির্ভর। বিগত পাঁচ-ছয় দশকে বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে জমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার অব্যাহতভাবে বেড়েছে। তথ্যানুসারে ১৯৬১ সালে পৃথিবীব্যাপী রাসায়নিক সার ব্যবহার হতো ৫২ দশমিক ২৭ মিলিয়ন টন। কিন্তু ২০১৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১৫ দশমিক ৩২ মিলিয়ন টনে। বাংলাদেশেও গত ছয় দশকে অগ্রসর হয়েছে রাসায়নিক সারনির্ভর ফসল উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে। বৈশ্বিক ধারা এ দেশেও সমানভাবে প্রতিফলিত। যেমন ১৯৬২-৬৩ সালে দেশে শূন্য দশমিক ২০ লাখ টন রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয়, যা ২০২১-২২ অর্থবছরে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৫৭ দশমিক ৫ লাখ টনে। এর মধ্যে রয়েছে ২৬ লাখ টন ইউরিয়া, ৭ দশমিক ৫ লাখ টন টিএসপি, ৭ দশমিক ৫ লাখ টন এমওপি এবং ১৬ দশমিক ৫ লাখ টন ডিএপি। ব্যবহূত এ রাসায়নিক সারের প্রায় ৮০ ভাগ আমদানি করা। সচেতনতা ও রাজনৈতিক কারণে কিছু উন্নত দেশে এবং ক্রয় সংগতির অভাবের কারণে অনেক অনুন্নত দেশে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কম। আবার উচ্চ ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ সচল রাখতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার মাত্রা বেড়েছে।

বাজার অর্থনীতির বিশ্বে রাসায়নিক সারের চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধির সুযোগে কিছু কিছু দেশ এসব রাসায়নিক সার উৎপাদনের জন্য বড় বড় শিল্প স্থাপন করেছে এবং অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন মিটিয়ে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। রাশিয়া, চীন, কানাডা, ইউক্রেন, বেলারুশ, মরক্কো, ভারত, সৌদি আরব, ওমান, বেলজিয়াম, ইরান, মিসর প্রভৃতি দেশ মোট রাসায়নিক সারের সিংহভাগ উৎপাদন করে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, ২০২১ সালে রাশিয়া ছিল বিশ্বে নাইট্রোজেন সারের শীর্ষ রফতানিকারক এবং পটাশ ও ফসফরাস উভয় সারের দ্বিতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী। আবার রাশিয়া ও প্রতিবেশী মিত্র রাষ্ট্র বেলারুশ যৌথভাবে বিশ্বের মোট পটাশ সারের ৩৭-৪০ ভাগ রফতানি করে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আমেরিকা এবং তার মিত্ররা রাশিয়ার ওপর প্রত্যক্ষ ও মিত্রদের ওপর পরোক্ষ অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপ করে। ফলে সুযোগ থাকলেও রাশিয়া সার বিক্রয় করতে পারছে না। এ অবস্থায় রাসায়নিক সারের দাম বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। আবার যেহেতু ডলার একমাত্র বিনিময় মাধ্যম, সেজন্য রাশিয়া ও তার মিত্রদের ওপর বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতায় ডলার সরবরাহও স্বাভাবিক নয়। বৈশ্বিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার অসংগতির কারণে সারসহ অন্যান্য পণ্যের মূল্যেও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে।

রাসায়নিক সারের মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা প্রথম দেখা যায় ২০২০-এর জুন-জুলাই থেকে টিএসপি সার দিয়ে। এরপর অন্য সারগুলোর দামও বাড়তে থাকে এবং ফেব্রুয়ারি ২০২২ নাগাদ ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সারের দাম অনেকটা বৃদ্ধি পায়। সারের এমন মূল্যবৃদ্ধি ২০০৮ সালেও হয়েছিল এবং সে সময়ও বিশ্বব্যাপী খাদ্য ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। এবারও এর পুনরাবৃত্তি ঘটায় গোটা পৃথিবীর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর এক ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি এবং ইউরোপে নাইট্রোজেনভিত্তিক সারের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ অ্যামোনিয়া উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দেয়ায় সার্বিকভাবে রাসায়নিক সার উৎপাদনের সংকট তীব্রতর হয়েছে। অন্যদিকে রাসায়নিক সারে আরেক রফতানিকারক দেশ চীনও সার রফতানি বন্ধ রেখেছে। এমন চতুর্মুখী সংকটে বিশ্বব্যাপী কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা কিছুটা সংকটাপন্ন এবং বাংলাদেশও এ সংকটের শিকার। রাসায়নিক সারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে অভ্যন্তরীণ সার ব্যবস্থাপনা ব্যয় গত দুই বছরে কয়েক গুণ বেড়েছে।

বাংলাদেশ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা তথা মার্কিন ডলারের বিনিময়ে নিজস্ব চাহিদার প্রায় ৮০ ভাগ রাসায়নিক সার আমদানি করে। দেশে সার আমদানি বাবদ বর্তমান দামে ব্যয় হয় বছরে প্রায় ১৯ হাজার কোটি ডলার। এ বিপুল পরিমাণ মুদ্রা সাশ্রয় কৌশল, পন্থা বের করা দরকার। প্রাকৃতিক জৈব উৎসই এর উপযুক্ত পন্থা। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে দেশে প্রতি বছর ১৮০-২০০ মিলিয়ন টন জৈব কাঁচামাল পাওয়া সম্ভব, যা থেকে ৫০-৫৫ মিলিয়ন টন (১০-১২ শতাংশ আর্দ্রতা ভিত্তিতে) জৈব সার উৎপাদন করা সম্ভব। উৎপাদিত ১ টন জৈব সার তথা গোবর, কেঁচো সার, মুরগির বিষ্টা, আবর্জনা/কিচেন মার্কেট কম্পোস্ট প্রভৃতি মূল্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায় ১২০-১৫০ ডলার মূল্যের বিভিন্ন রাসায়নিক পুষ্টি উপাদান ও অণুজীব পাওয়া সম্ভব। বর্তমানে দেশে জৈব সার খাতে যে সম্ভাব্য সুযোগ আছে, তা পূর্ণ কাজে লাগাতে পারলে বছরে প্রায় এক মিলিয়ন টন করে ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপি সার পাওয়া সম্ভব। এছাড়া আরো ১২-১৪টি অণুপুষ্টি পাওয়া যাবে, যার সম্মিলিত মূল্য প্রায় ৫০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ বর্তমান সম্পদে কিছু কাঠামো ও কৌশলগত পরিবর্তন করে এ বিপুল পরিমাণ ডলার সাশ্রয় করা যাবে।

এটা সবার জানা, কৃষি উপকরণের মূল্য কৃষকের নাগালের মধ্যে রাখার জন্য বিপুল ভর্তুকি দেয়া হয়, যাতে কৃষি উৎপাদন সচল থাকে। সরকার উৎপাদন, আমদানি, সরবরাহ ও খুচরা পর্যায় পর্যন্ত সর্বস্তরে ভর্তুকি প্রদান করে আসছে। বৈশ্বিক সংকটে রাসায়নিক সারের দাম ঠিক রাখতে ভর্তুকির টাকার পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত অর্থবছরে এর পরিমাণ ২৮ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। উল্লেখ্য, সরকার রাসায়নিক সারে গত ১০ বছরে প্রায় ৮২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ খাতে ৩০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ক্রমাগত ভর্তুকি বৃদ্ধি দেশের জন্য অবহনযোগ্য বোঝা হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। যার প্রতিফলন দেখা যায় সারের বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামলাতে ইউরিয়া সারের খুচরা মূল্য কেজিপ্রতি ১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১ টাকা করা হয়েছে। এতে দেশে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং মোট উৎপাদনও কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি এ আশঙ্কা আরো তীব্র করেছে। অতিরিক্ত মূল্যে সার কেনার ফলে ডলারে খরচ মেটাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও চাপ বাড়ছে।

বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা টেকসই করতে জমিতে রাসায়সিক সার প্রয়োগের বিকল্প জৈব সার প্রয়োগকে উৎসাহিত বা বাধ্য করার কৌশল নেয়া যেতে পারে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে এক টন জৈব সার থেকে ১২০-১৫০ ডলার মূল্যমান প্রাকৃতিক পণ্য স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে সহজে তৈরি ও প্রয়োগ সম্ভব। পাশাপাশি জৈব সার ব্যবহারে পরিবেশের অনুকূল উপযোগ মূল্যায়ন করলে তার মূল্য ডলারে আরো বাড়বে। সেজন্য জৈব সারের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ বিশেষ করে পরিবহনে ভর্তুকি প্রচলন করা যেতে পারে। তা ক্রমবর্ধমান ভর্তুকি থেকে কিছু বরাদ্দ করা যেতে পারে।

পৃথিবীর অনেক দেশ জৈব সারে কৌশলগত প্রণোদনা দিচ্ছে। যেমন দক্ষিণ কোরিয়া সরাসরি জৈব সারে ভর্তুকি দিচ্ছে। পাশাপাশি রাসায়নিক সারের দাম বাড়িয়ে এর ব্যবহার নিরৎসাহিত করা হচ্ছে, আবার অনেক দেশ রাসায়নিক সারে বিদ্যমান সাবসিডি কমিয়ে এর ব্যবহার নিরৎসাহিত করা হচ্ছে। চীন গ্রিন এগ্রিকালচার বাস্তবায়নে ভর্তুকি দিচ্ছে। ভুটান তো অনেক আগেই সে ব্যবস্থা নিয়েছে। বাংলাদেশ জৈব সারের প্রাচুর্যপূর্ণ উৎসগুলো চিহ্নিত এবং তা জৈব সারে রপান্তর করে কৃষি জমিতে ব্যবহার করার কৌশল নিতে পারে। সেজন্য প্রথমেই জৈব সারের বার্ষিক চাহিদা নিরূপণ করতে হবে। সব জমিতে আপাতত জৈব সার দেয়ার দরকার নেই। এখন শুধু উঁচু, মাঝারি উঁচু ও মাঝারি নিচু জমি, যা মোট ফসলি জমির ৭৫ ভাগ, এরূপ ৬ দশমিক ৩ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে হেক্টর প্রতি ১০ টন (১০-১২ শতাংশ আর্দ্রতা) জৈব সার প্রয়োগ করলে বছরে মোট ৬০-৬৫ মিলিয়ন টন জৈব সারের প্রয়োজন হয়। দেশে বর্তমান কাঁচামালের বিদ্যমান সংস্থান অনুযায়ী ৬০-৭০ ভাগ জমির জৈব সারের চাহিদা মেটানো সম্ভব। এ মুহূূূূর্তে দেশে ৫৭ দশমিক ৭ লাখ টন রাসায়নিক সারের চাহিদা নির্ধারিত আছে। জাতীয় পর্যায়ে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, ২৫ ভাগ রাসায়নিক সারের চাহিদা জৈব উৎস থেকে প্রয়োগ করা হবে, তবে সেজন্য প্রায় ১০ মিলিয়ন টন জৈব সারের প্রয়োজন হবে। সে লক্ষ্য পূরণে কৃষক কর্তৃক সুলভ মূল্যে সারপ্রাপ্তির জন্য উৎপাদন, সরবরাহ, বিপণনে যে ভর্তুকি দেয়া হয় সেখান খেকে ১০০০ কোটি টাকাসহ মোট ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা জৈব সার খাতে খরচ করা হয় তাতে একদিকে যেমন ২৫ ভাগ রাসায়নিক সার কম ব্যবহার হবে, অন্যদিকে জমিতে তিন-চারটি পুষ্টি উপাদানের পরিবর্তে ১৭টি পুষ্টি উপাদান প্রয়োগ সম্ভব হবে। ফলে মাটির অণুজীবীয় কার্যাবলি বৃদ্ধিসহ জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়বে। জমির উৎপাদিকা শক্তিও বাড়বে এবং একসময় রাসায়নিক সারের ব্যবহারও কমতে থাকবে। তবে একসঙ্গে এক বছরে এত বিপুল পরিমাণ জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহারের সক্ষমতা রাতারাতি হবে না। এ প্রক্রিয়াটিকে উৎসাহিত করার জন্য কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন। পাশাপাশি জৈব সার উৎপাদন, সরবরাহ ও ব্যবহারবিষয়ক একটি সুষম কাঠামো তৈরি করা দরকার। ফলে আমাদের কৃষিজমির হারানো স্বাস্থ্য ফিরে আসবে। প্রক্রিয়াটিকে কৃষিবাজেটের ভর্তুকির আওতায় এনে জমিতে প্রয়োগ নিশ্চিত করার কৌশল অবলম্বন জরুরি।

জৈব সারের প্রণোদনা বাস্তবায়নে বৃহৎ, মাঝারি ও ক্ষুদ্র সব শ্রেণীর উদ্যোক্তার সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। সে উদ্দেশ্যে উৎপাদন পর্যায়ে যেমন মিউনিসিপ্যালিটি (জৈব কাঁচামালের বৃহৎ উৎসস্থল) কর্তৃক বিনামূল্যে জৈব-বর্জ্য সরবরাহ, ইকুইিট ফান্ড, নগদ, কর মওকুফ, উৎপাদন প্লান্ট তৈরিতে সহজ লিজ ইত্যাদি ও বিপণনে প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে। তাছাড়া কৃষি ব্লক পর্যায়ে চাষীর বাড়িতে বা স্বউদ্যোগী তরুণদের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জৈব সার প্লান্ট স্থাপন করে কেঁচো সার, কম্পোস্ট সার তৈরি এবং প্রতি টন সার উৎপাদনে কারিগরি সহায়তা ও প্রণোদনা প্রদান করা যেতে পারে। তরুণদের উদ্বুদ্ধ করার সময় গ্রামীণ পর্যায়ে ১০ গরুর খামার কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। প্রতি ব্লকে ২০-২৫ জন উদ্যোক্তা তৈরি করে তাদের উৎপাদন ও পরিবহনে ভর্তুকি দেয়া যেতে পারে। জৈব সার নিয়ে নেতিবাচক ধারণা আছে যে এর কার্যকারিতা বিলম্ব হয়। গবেষণার মাধ্যমে এর উন্নয়ন সম্ভব। আগে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রয়োজনের তুলনায় জৈব সারের কাঁচামাল কম, তবে প্রণোদনার আওতায় আনা হলে কাঁচামালের জোগান আরো বেড়ে যাবে। কারণ পশুপালন, মত্স্য চাষ, আগাছা বা সামুদ্রিক শৈবাল সংগ্রহে নতুন নতুন উদ্যোক্তা আসবে। এটি একটি ক্ষুদ্র শিল্পে পরিণত হবে।

দেশের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো, ক্রমহ্রাসমান কৃষি জমিতে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য একটি টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে খাদ্য হবে নিরাপদ ও পুষ্টিকর এবং কৃষির উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষক তার পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করবেন। টেকসই কৃষি হলো এমন একটি চর্চা অনুসরণ করা, যা বর্তমান প্রজন্মের চাহিদা পূরণ করার সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাহিদার বিষয়টিও নিশ্চিত করবে। টেকসই কৃষির পরিমাপকের সূচক হলো; ভূমির উৎপাদনশীলতা, লাভ, সহনশীলতা, মাটির স্বাস্থ্য, পানির ব্যবহার, সার ও কীটনাশক দূষণের ঝুঁকি, জীব-বৈচিত্র্য, কর্মপরিবেশ, খাদ্যনিরাপত্তা ও ভূমির অধিকার। জলবায়ু পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার অঞ্চলভিত্তিক ফসল বিন্যাস প্রবর্তন, জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণ সর্বোপরি উৎপাদনশীলতা সচল রাখা। টেকসই কৃষি বাস্তবায়নে বাস্তুসংস্থানিক কৃষি বা পরিবেশগত চাষবাস গ্রহণের পথে হাঁটতে হবে, বিশ্বব্যাপী এ বার্তাই গবেষক ও নীতি-নির্ধারকরা দিচ্ছেন।

পৃথিবীতে অনেক দেশ আপত্কালীন সময়কে পরিবেশগত চাষাবাদের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছে। কিউবা সমসাময়িককালের একটি চমত্কার উদাহরণ। দেশটিতে আমেরিকার অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের অংশ হিসেবে রাসায়নিক সার সরবরাহে নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করলে, সে দেশের জনগণ প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারনির্ভর কৃষিকে আঁকড়ে ধরে এবং কৃষি উৎপাদন সুস্থায়ী করে। প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক, কিউবার রাজনৈতিক ব্যবস্থা বাংলাদেশে নেই। ফলে বাংলাদেশে তা সম্ভব নয়। বিজ্ঞরা বলছেন সম্ভব, বাংলাদেশও বিভিন্ন সময় আপত্কালীন সুযোগকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করেছে। এ দেশের কৃষক তলাবিহীন ঝুড়ির দেশকে প্রাচুর্যপূর্ণ খাদ্য উৎপাদনের দেশে রূপান্তর করেছে। পাঁচ বছর আগে ভারতীয় গরু আমদানিতে নানা জটিলতা ও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের নীতি সহায়তার মাধ্যমে মানুষ এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে সক্ষম হয়েছে। তেমনি দুর্যোগ মোকাবেলায় ঈর্ষণীয় সক্ষমতা অর্জন করেছে। যেমন ’৯১ সালে জলোচ্ছ্বাসে যেখানে ৩ লাখ মানুষের দুঃখজনক প্রাণহানি হয়েছে, সাম্প্রতিক আমপান বা আইলায় প্রাকৃতিক ক্ষতি হলেও জানমালের তেমন ক্ষতি হয়নি। এটিই বাংলাদেশর মানুষের বৈশিষ্ট্য। আগেই বলেছি, বৈশ্বিক নানা টানাপড়েন থাকবেই এবং বারবার বর্তমান অস্থিরতার মুখে পড়তে হবেই। বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে সাম্প্রতিক সময়ে যে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে তা টেকসই করার জন্য উপযুক্ত পন্থা অবলম্বন এখন সময়ের দাবি। বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও রাসায়নিক সারের মূল্যবৃদ্ধি এবং অস্থিতিশীল সরবরাহের মোকাবেলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। জৈব সারের উৎপাদন এবং পরিবহনে প্রয়োজনীয় প্রণোদনা ও ভর্তুকি টেকসই কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে, পাশাপাশি ব্যাপক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে পারে। রাসায়নিক সারের আমদানিনির্ভরতা পর্যায়ক্রমে কমিয়ে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানোর মধ্যেই টেকসই কৃষির মূলমন্ত্র নিহিত।

  • ড. মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন: জৈব কৃষি গবেষক
  • ড. মো. কামরুল হাসান: কৃষি অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর

 




  এ বিভাগের অন্যান্য