www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

বরিশালে খালে প্রভাবশালীদের বাঁধ, হাজার একর জমি অনাবাদি


 এগ্রিবার্তা ডেস্ক    ১১ সেপ্টেম্বর ২০২২, রবিবার, ১২:০৯   কৃষি প্রতিষ্ঠান বিভাগ


‘আগে জমিতে আমন ও ইরি ফসল হইত। গোলায় ধান ভরা থাকত। সারা বছর নিচিন্তায় থাকতাম খাবার নিয়ে। এখন সেই জমি আছে ঠিকই তবে কোনো ফসলই আর ঘরে উঠছে না। বর্ষায় জলাবদ্ধতা আর বাকি সময় পানির অভাবে মোগো দুই গ্রামের হাজার একর জমি এখন থাকছে অনাবাদি’—এমন আক্ষেপ করে বলেন বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের আন্ধারমানিক ইউনিয়নের আজিমপুর গ্রামের কৃষক মাহবুব আলম মিঞা। একই কথা আজিমপুর ও ভংগা গ্রামের সব কৃষকের। এ দুই গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালে ১০ বছর আগে প্রভাবশালীরা বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ করে দেয়ার পর থেকে তাদের এ দশা হয়েছে, যা দেখার কেউ নেই।

সরজমিন মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার আন্ধারমানিক ইউনিয়নের আজিমপুর ও ভংগা গ্রামে গিয়ে কৃষকের সঙ্গে কথা বলে তাদের দুর্দশার চিত্র দেখা যায়। স্থানীয় কৃষক বলেন, কালাবদর নদী থেকে শুরু হয়ে মুলাদীর নয়াভাংগুলি নদীতে গিয়ে সংযোগ স্থাপন করা এ খাল দিয়ে মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার পাতারহাট বন্দর, হিজলার কাউরিয়া বন্দর ও মুলাদী বন্দরের মধ্যে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল। যুগ যুগ ধরে খালটি দিয়ে এ অঞ্চলের ব্যবসা বাণিজ্য চলে এলেও ২০১১ সালে আজিমপুর গ্রামের প্রয়াত এক প্রভাবশালী ব্যক্তির যোগসাজশে স্থানীয় কয়েকজন খালটিতে বাঁধ দেন। তখন তারা এলাকায় প্রচার করেন খালের দুই পাড় ভেঙে এটি নদী হয়ে যাবে। তাই এটি এখনই আটকাতে হবে। তখন এ দুই গ্রামের অসহায় কৃষক স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের কাছে গেলেও তিনি ওই প্রভাবশালীদের নিবৃত্ত করতে পারেননি।

বর্তমানে আন্ধারমানিক ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মন্নান বেপারী, ৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি রশিদ মোল্লা ও সাধারণ সম্পাদক নান্নু খাঁসহ ১০-১২ জন এই খালে মাছ চাষ করছেন।

আজিমপুর গ্রামের কৃষক আব্দুস ছালাম বেপারী বলেন, দুই ফসলি জমি আমার গত ১০ বছর অনাবাদি পড়ে আছে। কার কাছে গেলে যে এ সমস্যার সমাধান পাব সেই হিসাবই মেলাতে পারছি না। আমার আজিমপুর গ্রামের কালাফারের বিলে দুই একর জমি রয়েছে। ওই জমি থেকে যে ধান আসত তা দিয়ে আমার কোনো মতে সংসার চলে যেত। এখন চাল কিনে খেতে হচ্ছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের এ কষ্টের কথা শোনারও কেউ নেই।

অন্য কৃষক ইউনুস সরদার বলেন, চাষাবাদের আশা ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা করে সংসার চালাই। আগে যেখানে জমির ফসলের ওপরই সব চলছে আমার। ক্ষমতার কাছে আজ আমরা অসহায়। খালে পানি প্রবাহের জন্য এ বাঁধ অপসারণ না করলে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে। তিনি বাঁধ অপসারণে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

আজিমপুর ও ভংগা গ্রামে একসময় ১৫টি ইরির ব্লক ছিল, যা এখন বন্ধ রয়েছে। এ ব্লক মালিকরা বলেন, দুই গ্রামে প্রায় এক হাজার একর জমি রয়েছে যা সম্পূর্ণ অনাবাদি। খালের পানি চলাচল করতে না পারায় বর্ষায় ওই জমিতে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। ফলে আমন ধান রোপণ হয়ে ওঠে না। আর শুকনো মৌসুমে খালের বাঁধের জন্য পানির অভাবে সেচের ব্যবস্থা না থাকায় বোরো ধান রোপণ করতে পারছেন না কৃষক। ফলে দুই গ্রামের ১ হাজার একর জমি বছরজুড়েই থাকছে অনাবাদি।

এক সময়ের ব্লক মালিক মাহবুব আলম বলেন, গ্রামের কৃষকের প্রায় ৩০ একর জমি নিয়ে আমার ব্লক ছিল। ডিজেলচালিত মেশিনে খাল থেকে পানি তুলে সেচের ব্যবস্থা করতাম। খালে বাঁধ দেয়ার পর থেকে আমাদের ব্লক বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আমরা যেমন পথে বসেছি, তেমনি কৃষকও রয়েছেন মহাবিপাকে।

জেলার শ্রেষ্ঠ পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক স্কুলশিক্ষক হাসান মাহমুদ সাইদ বলেন, বরাবরই এ বাঁধের বিরোধিতা করে আসছিলাম। প্রভাবশালীদের তখন বাধা দিতে পানিনি। ওরা সংঘবদ্ধভাবে এলাকায় জবরদস্তিমূলক খালে বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছে।

আমরা এখন জমিতে ফসল ফলাতে পারছি না। এ বিষয়ে বেশ ক’বার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছি কোনো প্রতিকার পাইনি। তারা শুধু বলেন দেখব, দেখছি। এখন খালটি উন্মুক্ত করে দেয়া হলে কৃষক বাঁচবে। পাশাপাশি তিন উপজেলার ব্যবসা বাণিজ্যের পুরনো রুটটি সচল হবে।

স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, খালে বাঁধ দেয়ায় কারো সর্বনাশ হয়েছে আবার কারো পৌষ মাস। কারণ প্রভাবশালীদের অনেকে ওই খালে মাছ চাষ করে ভালো আয়-রোজগার করছেন। যে কারণে এলাকার সাধারণ মানুষ খালের বাধ অপসারণের বিষয়ে কথা বলতে নারাজ। বছরখানেক আগে খাল উদ্ধারে স্থানীয় শতাধিক কৃষক স্বাক্ষর করে একটি আবেদন দিয়েছিলেন উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর। কোনো প্রতিকার না পেয়ে তারা এখন হতাশ।

এ বিষয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন খোকন খান বলেন, ২০১১ সালে খালে বাঁধটি দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কিছু করার নেই। আমি পানি নামার জন্য যে কয়টি কালভার্ট লাগবে তা করে দেব। পানি উন্নয়ন বোর্ড যদি তাদের খালের বাঁধ অপসারণের ব্যবস্থা করে আমার কোনো সমস্যা নেই। এটি খুলে দিলে কৃষকের উপকারই হবে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত মন্নান বেপারী বলেন, বাঁধ দেয়ার খালটি পড়ে আছে। আমরা এলাকার কয়েকজন মিলে মাছ চাষ করে আসছি। বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্যের জানা আছে বলে তিনি এ বিষয়ে নিউজ না করার অনুরোধ করেন।

মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নূরুননবী বলেন, সরকারি খালে কেউ বাঁধ দিতে পারে না। এটা বেআইনি। খালের বাঁধ অপসারণের দাবিতে কৃষকদের আগের করা আবেদনের বিষয়ে বলেন সেটি আমাকে কেউ বলেনি বা দেখায়নি। খালটি উদ্ধারে শিগগিরই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বরিশাল পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসেন বলেন, খালটি পাউবোর কিনা তা আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখব যদি পাউবোর খাল হয় তাহলে সরেজমিন পরিদর্শন করে বাঁধ কেটে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে।




  এ বিভাগের অন্যান্য