www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধু টানেল

স্ক্যানার বসাতে ভূমি নিয়ে জটিলতায় প্রকল্প কর্তৃপক্ষ


 এগ্রিবার্তা ডেস্ক    ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, বুধবার, ৭:১১   ডেইরী বিভাগ


চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু টানেলের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রকল্পটি উদ্বোধন করতে চায় সরকার। তবে নতুন করে টানেলের প্রবেশমুখে স্ক্যানার বসানোর সিদ্ধান্ত হওয়ায় তা বাস্তবায়নে জমি নিয়ে কিছু জটিলতায় পড়েছে টানেল কর্তৃপক্ষ। ফলে সময়মতো বাণিজ্যিক যান চলাচল নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষায়িত একাধিক স্ক্যানার বসানোর মতো প্রয়োজনীয় ভূমির জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) দ্বারস্থ হবে বলে জানিয়েছে টানেল কর্তৃপক্ষ। সেখানে জমি পাওয়া না গেলে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব বিষয় নিয়েই মূলত জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।


বিশ্বের যেসব দেশে এ ধরনের টানেল ব্যবহার হয়, সেখানে সাধারণত স্ক্যানার বসানো হয় না। এজন্য প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও প্রকল্প উন্নয়ন পরিকল্পনায় (ডিপিপি) নিরাপত্তা নিশ্চিতে স্ক্যানারের উল্লেখ ছিল না। সেভাবেই কাজ শুরু হয় ও এগিয়ে যেতে থাকে। নির্মাণকাজ যখন প্রায় শেষ তখন টানেলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে স্ক্যানার স্থাপনে আগ্রহ দেখায় সরকার। সে অনুযায়ী টানেলের উভয় প্রবেশমুখে স্ক্যানার বসানোর তোড়জোড় শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে চীন বা ইউরোপ থেকে স্ক্যানার কেনার কথা রয়েছে। তবে এসব স্ক্যানার স্থাপনের জায়গা নিয়ে বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ)। কারণ প্রথম পরিকল্পনায় স্ক্যানার না থাকায়, টানেলের প্রবেশমুখে পর্যাপ্ত জমি না থাকায় এগুলো বসানোর স্থান নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। কোথায় ও কীভাবে স্ক্যানার বসিয়ে সংকট নিরসন করা যায় তা নিয়ে প্রকল্প এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করা সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে বৈঠকের চিন্তাভাবনা করছে বিবিএ।

জানা গিয়েছে, শুরুতে উভয় পাশে ১০টি স্ক্যানার বসানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এসব স্ক্যানার স্থাপনে খরচ হবে প্রায় ২৫০-৩০০ কোটি টাকারও বেশি। ব্যয় বাড়াতে ডিপিপি সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়। সম্প্রতি ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এখন দেশীয় অর্থায়নে এসব স্ক্যানার বসাতে চায় বিবিএ।

এছাড়া টানেল স্থাপনে যে জমি প্রয়োজন তা প্রাথমিকভাবে সিডিএর কাছ থেকে চায় বিবিএ। সরকারি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা হিসেবে সিডিএর কাছে জমি পাওয়া না গেলে বিকল্প চিন্তা হিসেবে বেসরকারি খাত থেকে ভূমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে স্ক্যানার স্থাপন করা হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণের ঝুঁকি রয়েছে। কারণ ভূমি অধিগ্রহণ করা বেশ সময়সাপেক্ষ কাজ। এতে টানেলের বাণিজ্যিক ব্যবহার উন্মুক্ত করতে আরো সময় লাগতে পারে। ফলে গোটা বিষয়টি নিয়ে নতুন সংকটের মধ্যে পড়েছে টানেল কর্তৃপক্ষ।

এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, টানেলের নিরাপত্তা ইস্যুতে এর অভ্যন্তর দিয়ে কোনো ধরনের গ্যাসচালিত যানবাহন চলাচল করতে পারবে না। নিরাপত্তার স্বার্থে নিষিদ্ধ রাখা হবে দুই চাকার যানবাহন চলাচলও। বসবে অত্যাধুনিক ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা। যেকোনো দুর্ঘটনা থেকে উদ্ধারের জন্য প্রস্তুত থাকবে আধুনিক যন্ত্রপাতি, সার্বক্ষণিক অক্সিজেন সুবিধা, আলো ইত্যাদি।

তবে এসবের পরও যানবাহনের মাধ্যমে বা অন্য কোনোভাবে কেউ যেন বিস্ফোরক দ্রব্যসহ ঝুঁকিপূর্ণ কিছু নিয়ে টানেলে প্রবেশ করতে না পারে সেটি নিশ্চিতে বসানো হবে স্ক্যানার। টানেলের টোল প্লাজা শুরুতে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা অংশে রাখার কথা ছিল। কিন্তু যানজট এড়াতে টোল প্লাজা করা হচ্ছে আনোয়ারা অংশে। ফলে টোল প্লাজায় প্রবেশের আগেই স্ক্যানারগুলো স্থাপন করতে চায় বিবিএ।

বিবিএ জমির প্রত্যাশা করলেও সিডিএ কর্তৃপক্ষ বলছে, টানেলের স্ক্যানার স্থাপনে ছেড়ে দেয়ার মতো কোনো ভূমি নেই। টানেলকে ঘিরে সিডিএর নানামুখী অবকাঠামো নির্মাণ পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রকল্পের ডিপিপি তৈরি ও প্রি-ডিপিপি প্রস্তুত করা হয়েছে। আউটার রিং রোডসহ বিভিন্ন সড়কের মুখ টানেলমুখী হওয়ায় পাঁচটি ডেডিকেটেড ইউলুপ নির্মাণেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভূমির প্রয়োজন। ফলে টানেলের জন্য প্রবেশমুখে স্ক্যানার বসাতে জমি দেয়ার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে টানেলে প্রবেশের আগেই স্ক্যানার স্থাপন ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই বলে মনে করা হচ্ছে।

এখন পর্যন্ত টানেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভূমির বিষয়ে কোনো প্রস্তাব পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, টানেলে নিরবচ্ছিন্ন যানবাহন চলাচল নিশ্চিত করতে প্রবেশমুখের আগে নানামুখী আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরুর পথে। এ অবস্থায় স্ক্যানার বসাতে বড় আকারের ভূমির প্রয়োজন হলে টানেলের প্রবেশমুখের পরিবর্তে বিকল্প স্থান নির্বাচন করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। সেতু কর্তৃপক্ষ চাইলে এ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

সেতু কর্তৃপক্ষের একটি সূত্র বলছে, ৩১ আগস্ট পর্যন্ত টানেল প্রকল্পের ভৌত কাজ শেষ হয়েছে ৯০ দশমিক ৫০ শতাংশ। এছাড়া প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৭৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ করতে মাসভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানো হয়। সব মিলিয়ে দ্রুত কাজ এগিয়ে নেয়া হচ্ছিল। এখন সেখানে স্ক্যানার বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়ায় বেশকিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে। যার কারণে যানবাহন চলাচলে টানেল খুলে দিতে আরো কিছুটা বিলম্ব হতে পারে। বিশেষ করে সিডিএ জমি না দিতে পারলে তখন বাইরে থেকে ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে। ভূমি পাওয়া গেলে তারপর স্ক্যানার বসানোর কাজ শুরু করতে হবে। সেটি সময়সাপেক্ষ হতে পারে।

তবে যথাসময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করার বিষয়ে আশা প্রকাশ করেছেন বঙ্গবন্ধু টানেলের প্রকল্প পরিচালক হারুনুর রশীদ চৌধুরী। তিনি বলেন, টানেলের জন্য স্ক্যানার খুবই গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। মূল ডিপিপিতে স্ক্যানার না থাকলেও আমরা পরে এটি যুক্ত করেছি। টানেলের মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজ শেষ হলেও এখন টেকনিক্যাল কাজগুলোর কাজ চলমান রয়েছে। যথাসময়ে প্রকল্পটির কাজ শেষ করতে আমরা কাজ করছি।

এ-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনায় দেখা গিয়েছে, টানেলের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে সর্বমোট ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ সড়কের নির্মাণকাজ চলমান। উভয় টানেলের মধ্যে অগ্নি সহনশীল বোর্ড স্থাপনের কাজ এবং ওপেন কাট এরিয়ায় রেইন শেল্টার স্থাপনের কাজ চলমান। দুটি টিউবের তিনটি সংযোগ পথের কাজও চলছে। ক্রস প্যাসেজ-১-এর কাজ ৯৯ শতাংশ, ক্রস প্যাসেজ-২-এর ৮৪টি হোল ড্রিলিংয়ের কাজ এবং গার্ড ফ্রিজিংয়ের কাজ শেষে এক্সেভেশনের কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি ক্রস প্যাসেজ-৩-এর কাজ শেষ হয়েছে ৯৯ শতাংশ। সবচেয়ে জটিল ক্রস প্যাসেজের কাজ শেষের দিকে থাকায় সম্পূর্ণ টানেল যান চলাচলের জন্য প্রস্তুত করতে আর কোনো সংশয় থাকছে না বলে মনে করছেন প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।

টানেলের উপপ্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম আজাদ জানান, টানেলের জন্য স্ক্যানার বসাতে বেশকিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। স্ক্যানার বসাতে জমি নিয়ে কিছুটা সংকট রয়েছে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারি অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে স্ক্যানার বসাতে ভৌত কাজের পরিধি কম হওয়ায় সিদ্ধান্ত নেয়া ও জমি পাওয়া গেলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্থাপন কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।




  এ বিভাগের অন্যান্য