www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

ড. মো. রুহুল আমীন

এবারের বর্ষাকালীন তীব্র উষ্ণতা কৃষিতে মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে


 এগ্রিবার্তা ডেস্ক    ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, বৃহস্পতিবার, ৮:২০   সম্পাদকীয় বিভাগ


শেষ হয়েছে বর্ষা। প্রতিবছর বর্ষায় প্রতিবেশ বৃষ্টিজলে সিক্ত থাকে এবং নদী, খাল, বিল, পুকুর, হাওর, বাঁওড় প্রভৃতি থাকে জলে পরিপূর্ণ। কিন্তু এ বছরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বৃষ্টি হয়নি, ছিল প্রচণ্ড খরতাপ—যদিও এখন একটু বৃষ্টি হচ্ছে। ৪০ বছরের ইতিহাসে এবার বর্ষাকালে সর্বনিম্ন বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এটা কৃষির জন্য অশনিসংকেত।

বর্ষাকালে আমাদের দেশে কৃষিতাত্ত্বিক ফসল হিসেবে মাঠে প্রধানত দেখা যায় আউশ ধান, পাট ও আমন ধানের বীজতলা। উদ্যানতাত্ত্বিক সবজি ফসলের মধ্যে রয়েছে লাউ, মিষ্টিকুমড়া, কাঁকরোল, করলা, ঢেঁড়স, পটল, চিচিঙ্গা, ঝিঙে, ডাঁটা, বিভিন্ন ধরনের কচু, লালশাক, পুঁইশাক, পাটশাক, মুলা, বরবটি ইত্যাদি। উদ্যানতাত্ত্বিক ফল হিসেবে কাঁঠাল, আনারস, কলা, ড্রাগন, লেবু, বাতাবি লেবু প্রভৃতি দৃশ্যমান। মাত্রাতিরিক্ত উষ্ণতা ও বৃষ্টিহীনতা এসব ফসলের পরিমাণগত এবং গুণগত ফলন মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি ঘটে, ফলে গাছের কার্বন ও নাইট্রোজেন অনুপাত বেড়ে যায়। এ অবস্থায় গাছের নাইট্রোজেনঘটিত ক্ষারীয় প্রতিরোধী ক্ষমতা হ্রাস পায়। ফলে উদ্ভিদভোজী পোকা খাদ্যগ্রহণে উৎসাহী হয় এবং সংক্রমণ বৃদ্ধি ঘটে। গবেষণা তথ্য থেকে জানা যায়, গাছে নাইট্রোজেনের পরিমাণ শতকরা ১০-৩০ ভাগ কমে গেলে পোকার খাদ্য গ্রহণ শতকরা ৪০ ভাগ বৃদ্ধি হয়েছে।

আমাদের দেশে আউশ এবং আমন ধান মোটামুটি বৃষ্টিনির্ভর ফসল। কৃষি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে আউশ ধান চাষের অধীন জমির পরিমাণ ১ দশমিক ১৫ মিলিয়ন হেক্টর এবং আমন ধানের অধীনে ৫ দশমিক ৬২ মিলিয়ন হেক্টর। বার্ষিক মোট আউশ এবং আমন ধান উৎপাদনের পরিমাণ যথাক্রমে ২ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন টন এবং ১৪ দশমিক শূন্য ৫ মিলিয়ন টন। এ বছর মাত্রাতিরিক্ত উষ্ণতা ও বৃষ্টিহীনতার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফলনপ্রাপ্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ। অতিরিক্ত উষ্ণতা ও খরাজনিত কারণে আউশ ধানের পরাগায়ন ব্যাহত হওয়া, রোগ ও পোকার সংক্রমণ বৃদ্ধি এবং শরীরতাত্ত্বিক ও জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতার কারণে সঠিকভাবে দানা গঠন হয় না এবং বীজের ফলন ও গুণগত মান বজায় থাকে না। প্রতি এক ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ধানের ফলন শতকরা ৬ দশমিক ২ ভাগ হ্রাস পায়। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ধান বীজের সুপ্তাবস্থা ঘটে এবং অঙ্কুরোদগম ব্যাহত হয়, অঙ্কুরোদগম হলেও চারা গাছ সমতালে ও সোজাভাবে বেড়ে উঠতে পারে না। ধানের চারার সঠিক বৃদ্ধির উপযোগী তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর ঊর্ধ্বমুখী তাপমাত্রা চারার বৃদ্ধি মারাত্মক ক্ষতি করে।

ধান গাছের কোষ বিভাজনের কাম্য তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কোষের বৃদ্ধি ঘটে। তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে চারার বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়। তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে ধান গাছে নতুন পাতার উত্গমন হতে সময় লাগে পাঁচদিন, তাপমাত্রা ২৫ সেলসিয়াস হলে সময় লাগে চারদিন। যদি তাপমাত্রা ৩০ ডিগি সেলসিয়াসের বেশি হয়, তাহলে পাতার গঠন থেমে যায়, সেই সঙ্গে চারার কুশি উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়। প্রলম্বিত অতিরিক্ত উষ্ণতার কারণে ধানের দানা খর্বাকার হয়ে ফলন ও গুণগত মান কমে যায়। ধান গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির উপযোগী তাপমাত্রা ১৮-৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর অধিক তাপমাত্রায় গাছের বৃদ্ধি থমকে যায় এবং গাছ খর্বাকৃতি হয়। দানা গঠনের সময় অতিরিক্ত উষ্ণতা বিদ্যমান থাকলে উৎসেচক ক্রিয়া (এনজাইমেটিক অ্যাকটিভিটি) হ্রাস পায় এবং শ্বসনকার্য প্রতিবন্ধকতার দরুন দানার আকার, আকৃতি ও বর্ণ স্বাভাবিক হয় না। পরিণামে ফলন ও বাজারমূল্য কমে যায় এবং মিলিংয়ের উপযোগিতা হ্রাস পায়।

খরার প্রভাবে ড্রাগন গাছের কাণ্ডের বৃদ্ধি কমে যায়, গাছে ক্লোরোফিলের পরিমাণ হ্রাস পায় এবং ফলের আকার অস্বাভাবিক ছোট হয়। কুমড়া জাতীয় ফসলের খেতে কাম্য আর্দ্রতার চেয়ে শতকরা ২৫ ভাগ পানি হ্রাস পেলে ৫২ ভাগ ফলন কমে যায়। আর্দ্রতা হ্রাসের কারণে কুমড়া জাতীয় ফলে প্রোলিন, ফেনল ও রিডিউসিং সুগারের মাত্রা উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটে। পক্ষান্তরে ফলের ভেতর রস ও ক্লোরোফিলের স্বাভাবিক মাত্রা এবং সর্বোপরি ফলন কমে যায়। সেচনির্ভর ফসল যেমন ঢেঁড়স, মরিচ, বরবটি, ডাঁটা ইত্যাদির বৃদ্ধি এবং ফলন খরার প্রভাবে বহুলাংশে বিঘ্নিত হয়। প্রলম্বিত খরায় গাছের ভাইরাস বহনকারী পোকা যেমন সাদা মাছি, থ্রিপস ও জাবপোকার প্রাদুর্ভাব, বায়োটাইপ উদ্দীপন এবং গাছে ভাইরাস রোগের সংক্রমণ বৃদ্ধি পায়। উচ্চ তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিহীন পরিবেশে পেঁপে ও লেবু গাছে ছাতরা পোকা, লেবু গাছে সুড়ঙ্গ পোকা, নারিকেল গাছে সাদা মাছি এবং পাট গাছে মাকড়ের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এরই মধ্যে এসব কীট বাংলাদেশের কৃষিতে মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।

প্রখর তাপে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ফসলি উদ্ভিদের শরীরতাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটায় এবং গাছ দুর্বল করে। গাছের প্রতিরোধী ক্ষমতা হ্রাসের কারণে সহজেই পোকা-মাকড়ের সংক্রমণ বাড়ে। ধান গাছে মাজরা পোকার আক্রমণ ত্বরান্বিত হয়। খরার ধকলজনিত দুর্বল গাছে গৌণ আপদগুলোও সহজে আক্রমণ করতে পারে এবং তারা দ্রুত বংশ বৃদ্ধি করে মুখ্য আপদে পরিণত হয়। প্রলম্বিত উচ্চ তাপমাত্রায় কাটুই পোকার ক্ষতির মাত্রা মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে। তীক্ষ সূর্য তাপ স্বল্পকালীন বিদ্যমান থাকলেও মাকড় ও ছাতরা পোকার সংক্রমণ ব্যাপকতা লাভ করে। অতি উষ্ণ আবহাওয়া ধান ও ধান জাতীয় ফসলের জন্য ক্ষতিকর পোকা ঘাসফড়িংয়ের দ্রুত বংশবিস্তার ঘটায়। উচ্চ তাপমাত্রায় কুমড়াজাতীয় ফসলের মারাত্মক আপদ হিসেবে পরিগণিত ফলের মাছি পোকার ব্যাপক প্রাদুর্ভাব ও সংক্রমণ ঘটে। প্রতি ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়ে এবং সে সঙ্গে ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হ্রাস পেলে ভুট্টার ফলন শতকরা ৩৬ ভাগ কমে যায়। উচ্চ তাপমাত্রায় ফসলের ছত্রাকজনিত রোগ বেড়ে যায়।

প্রয়োজনীয় তাপমাত্রার চেয়ে প্রতি ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে পরজীবী বোলতা পোকার বংশ বৃদ্ধি ৯০ শতাংশ হ্রাস পায়। তীব্র খরা অবস্থায় পরভোজী পোকা যেমন—লেডি বিটল, লেস উইং, মেন্টিড প্রভৃতির বিচরণ ও প্রজননক্ষমতা হ্রাস পায়। ফলে প্রাকৃতিক শত্রুর সংখ্যা কমে যাওয়ায় তুলনামূলক কম অনিষ্টকারী পোকা মুখ্য আপদ রূপে আবির্ভূত হয়ে ফসলকে ঝুঁকিতে ফেলে। বিভিন্ন প্রজাতির পতঙ্গ ৭০ ভাগ কৃষি ফসল প্রজাতির পরাগায়নে মুখ্য ভূমিকা রাখে। কুমড়াজাতীয় ফসল, ঢেঁড়স, কলা, ড্রাগন, পেঁপে, ডালিম, বরবটি, মুলা ও লেবু জাতীয় ফসলের পরাগায়ন মূলত পতঙ্গনির্ভর। তীব্র খরতাপে ফসলের প্রাকৃতিক পরিবর্তন ঘটানোর ফলে ফসল ও পরাগী পতঙ্গের পরাগায়ন ব্যাহত হয়, সে সঙ্গে পরাগী পতঙ্গের প্রজনন ও বংশ বৃদ্ধি কমে যায়। প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ফসলের জমিতে পরাগী প্রজাপতির পরিভ্রমণ ১৪ শতাংশ হ্রাস পায়। সার্বিকভাবে পরভোজী ও পরাগী পোকার সংখ্যা হ্রাসের কারণে ব্যাপক ফসলহানি ঘটে।

এ বছরের বর্ষাকালে প্রখর রৌদ্রতাপ এবং বৃষ্টিহীনতার কারণে পাট, আউশ ও আমন ধানচাষীরা অকল্পনীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। খাল, ডোবা, নালায় পানি না থাকায় পাট জাগ দেয়া ও পাটের আঁশ ছাড়াতে কষ্ট হয়েছে। পাট গাছ জমিতে থেকে তিলা রোগে আক্রান্ত এবং আউশ ধান জমিতে শুকিয়ে মরে যাওয়ার খবর মিলছে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষক আমন ধানের বীজতলা তৈরি করতে পারেননি। সার্বিকভাবে কৃষিতে একটি মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে।

খরাজনিত প্রতিকূল অবস্থা থেকে উত্তরণ ও কৃষকদের আর্থিক এবং প্রযুক্তিগত সহায়তাদানের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন রক্ষা করা দরকার। এজন্য সরকার, কৃষি সম্প্রসারণকর্মী এবং কৃষককে এগিয়ে আসতে হবে। সর্বাগ্রে প্রয়োজন কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীদের আউশ ধানের জমি, আমন ধানের বীজতলা এবং শাকসবজির জমি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে ফসল ও অঞ্চলভেদে সেচের পানির প্রয়োজনীয়তা ও পরিমাপ নির্ধারণ করা। সেচের পানির প্রয়োজনীয়তা পরিমাপক যন্ত্রের মাধ্যমে মাটির আর্দ্রতা যথাযথ পরিমাপ করা। সেচের পানির সঠিক প্রয়োজনীয়তা ও পরিমাপ নির্ধারণ করে এবং দেশে বিদ্যমান সেচ ব্যবস্থার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করে শ্রম ও জ্বালানির সাশ্রয় সম্ভব। মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধির মাধ্যমে আর্দ্রতা সংরক্ষণ করা যেতে পারে। গাছের গোড়ায় চারপাশে খড়কুটা দিয়ে ঢেকে বা মালচিং পদ্ধতির মাধ্যমে মাটির রস ধরে রাখা এবং শাকসবজির জমিতে যথাযথ সারি থেকে সারি এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব বজায় রেখে সেচের পানির অপচয় রোধ সম্ভব। পাট জাগ দেয়ার জন্য ডোবা, পুকুর বা খালে গভীর নলকূপের সাহায্যে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা দরকার। এ সংকটময় অবস্থায় বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার কৃষককে পর্যাপ্ত আর্থিক প্রণোদনার মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করে কৃষির অগ্রসরমাণ সাফল্য বিকশিত করবে—এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

  • ড. মো. রুহুল আমীন: অধ্যাপক, কীটতত্ত্ব বিভাগ
  • বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর



  এ বিভাগের অন্যান্য