www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

কৃষিতে নতুন প্রজন্মের অনীহা বাড়ছে

কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা ধরে রাখা কঠিন


 এগ্রিবার্তা ডেস্ক    ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, শুক্রবার, ৭:২৫   কৃষি অর্থনীতি  বিভাগ


দেশে কৃষির প্রতি নতুন প্রজন্মের অনীহা বাড়ছে। বুধবার বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যান্ত্রিকীকরণ ও উচ্চফলনশীল জাতের আবির্ভাবে কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। এর ভেতর দিয়ে একটি পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে, কৃষি থেকে কৃষক পরিবারগুলো সরে আসছে। ভূমির মালিকানা প্রভাবশালীদের হাতে চলে যাচ্ছে। আবার জমি ইজারা নিয়ে পারিবারিক শ্রমে আবাদকারী প্রান্তিক চাষীরা কোনোমতে জীবনধারণ করতে পারছেন। তেমন লাভ করতে পারছেন না তারা। এ অবস্থাটি তরুণ প্রজন্মকে কৃষিবিমুখ করে তুলছে, যা টেকসই কৃষির স্থায়িত্বশীলতার জন্য সহায়ক নয়। সেবা ও শিল্প খাতের বিকাশে কৃষিতে নিয়োজিত জনসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমে আসবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তা এবং শ্রমশক্তির প্রায় ৪০ শতাংশের কর্মনিয়োজনের জন্য আমাদের এখনো কৃষি গুরুত্বপূর্ণ। তাই কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ব্যবহার বাড়িয়ে খাদ্য উৎপাদন অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি কৃষকদের নানাভাবে প্রণোদনা দেয়াও প্রয়োজন।

আগে কৃষিজমির মালিকরা বর্গাচাষীদের হাতে চাষাবাদের ভার ছেড়ে দিতেন। তা সত্ত্বেও চাষাবাদের সঙ্গে তাদের কিছুমাত্রায় সম্পৃক্ততা থাকত। কিন্তু গত কয়েক বছরে দেশের কৃষিতে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। এখন নির্ধারিত মূল্যে কৃষিজমি ঠিকাদারদের কাছে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। চাষের সঙ্গে জমির মালিকের সম্পর্কই থাকছে না। তারা কৃষিকাজের পরিবর্তে বাণিজ্যিক অনেক কর্মকাণ্ড সেখানে পরিচালনা করছে। এতে তারা লাভবান হলেও আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষক। কৃষকদের আগ্রহ ধরে রাখতে তাই সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কিছু উদ্যোগ জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন। বিশেষ করে, তাদের ঋণ সুবিধা, কৃষি আবাদে প্রযুক্তিগত পরামর্শ প্রদান এবং কৃষির টেকসই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা দেয়া। কৃষিতে বিনিয়োগ কখনো দ্রুত লাভের মুখ দেখালেও অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাজারের মন্দা পরিস্থিতি, রোগ-বালাইয়ের আক্রমণ ইত্যাদি কারণে সবসময়ই লোকসানের ঝুঁকি থেকে যায়। এ বিষয়গুলো মোকাবেলা করার জন্য তাদের সবর্তো সহায়তা জোগাতে হবে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। কৃষির মূলত তিনটি পর্ব—প্রচলিত কৃষি, বেসিক কৃষি ও হাইটেক কৃষি। প্রচলিত কৃষির কাজ হচ্ছে, নিজে কৃষিতে কাজ করা। পরিবারের জন্য খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আমাদের অধিকাংশ কৃষক প্রচলিত কৃষিকাজ করেন। বেসিক কৃষিতে কৃষির সঙ্গে আয়ের বিষয় সম্পর্কিত। আর হাইটেক কৃষি বাজারনির্ভর ও মূল্যসংযোজন। দেশব্যাপী গড়ে তোলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হাইটেক কৃষির প্রসারে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

সময়ান্তরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে কৃষিজমি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খণ্ডে বিভক্ত। এসব ছোট জমিতে উন্নত কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। গত এক দশকে কৃষি শ্রমিকের মজুরি দুই থেকে তিন গুণ বাড়লেও সে হিসেবে বাড়েনি কৃষিপণ্যের দাম। তাই বর্তমানে কৃষি হয়ে উঠেছে একটি অলাভজনক পেশা। শস্য আবাদের মোট খরচের এক-তৃতীয়াংশের বেশি হয় মজুরিতে। সে মজুরি কয়েক বছরের ব্যবধানে দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে বেড়ে যাচ্ছে কৃষকের উৎপাদন খরচ। লাভ না হওয়ায় অধিক শস্য আবাদে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষক। হেক্টরপ্রতি উৎপাদনশীলতা কমার কারণে বিভিন্ন শস্যের মোট উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি অনেকটাই গতিহীন। বেশকিছু শস্যে প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক পর্যায়ে চলে এসেছে। এছাড়া কৃষিশ্রমিক ও উপকরণের অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধি, স্বল্প সুদে কৃষিঋণ না পাওয়া, কৃষিপণ্য সংরক্ষণের সুব্যবস্থার অভাব, দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনা, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের অপ্রতুলতা এবং রফতানিতে নানা রকম প্রতিবন্ধকতাও কৃষির প্রতি অনাগ্রহী করে কৃষককে। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

কৃষিকে কীভাবে লাভজনক করা যায়, তার উদাহরণ হতে পারে জাপান। দেশটির কৃষকদের একসময় প্রচণ্ড দারিদ্র্য আর অনটনে দিন কাটাতে হয়েছে। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালেও অভাব-অনটন আর দারিদ্র্য ছিল জাপানে কৃষকের নিত্যসঙ্গী। দেশটির কৃষিজমির পুরোটাই কুক্ষিগত ছিল গোটাকতক জমিদার ও সামন্ত ভূস্বামীর হাতে। তাদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে নানা সময়ে বিদ্রোহ করেছেন দেশটির কৃষক। আজ জাপানের কৃষি বিশ্বের কাছে অনুকরণীয়। দেশটির বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী কৃষিতে নিয়োজিত। এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ। লাঙল থেকে শুরু করে কৃষির প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার রয়েছে সেখানে। অথচ তাদের সঙ্গে আমাদের প্রযুক্তির পার্থক্য বিপুল। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে কৃষিকে লাভজনক করা কঠিন হবে না। আর এতে তরুণ প্রজন্মও কৃষিতে এগিয়ে আসবে। কাজেই এদিকে সরকারের আরো জোরালো প্রচেষ্টা নিতে হবে।

দেশে কৃষি উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য গত ১০ বছরে এ দেশে প্রণীত হয়েছে অনেক নীতিমালা। এর মধ্যে জাতীয় কৃষিনীতি, কৃষি সম্প্রসারণ নীতি, কৃষি উপকরণ নীতি, পোলট্রি নীতি, পশুসম্পদ উন্নয়ন নীতি ও মত্স্য নীতি অন্যতম। এগুলোর কলেবর বিশাল। এতে সংযুক্ত করা হয়েছে অনেক বিষয়। এর মধ্যে প্রধান হাতিয়ার তিনটি। এগুলো হচ্ছে কৃষি ভর্তুকি, পণ্যের নিম্নমূল্য নির্ধারণ এবং বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা আরোপ। এগুলোর মিথস্ক্রিয়ার ফল বরাবরই ছিল ইতিবাচক। কৃষি ভর্তুকির ক্ষেত্রে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয়, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নে তিন ধরনের প্রক্রিয়া চালু আছে। এর মধ্যে আছে কর হ্রাস, বাজারমূল্যের চেয়ে কম মূল্যে উপকরণ প্রদান এবং সরাসরি নগদ ভর্তুকি। বাংলাদেশে প্রথম দুটি প্রক্রিয়া চালু আছে দীর্ঘদিন। শেষোক্ত প্রক্রিয়াটি চালু হয়েছিল বর্তমান মহাজোট সরকার ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে ক্ষমতা গ্রহণের পর। এর জন্য ১০ টাকা জমার বিনিময়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল কৃষকের জন্য। তার সংখ্যা ছিল প্রায় এক কোটি। ওই সময় কৃষককে নগদ সহায়তা প্রদানও করা হয়েছিল একবার। পরে অবশ্য তার আর পুনরাবৃত্তি হয়নি। কৃষি খাতে নগদ ভর্তুকি প্রদানের বিষয়টি খুবই স্বচ্ছ এবং উৎপাদন সহায়ক। কোনো ফসলের উৎপাদন বাড়াতে অথবা কোনো ফসলের উৎপাদন কমাতে এ ভর্তুকি খুবই কার্যকর। এ নীতির স্থায়ী প্রত্যাবর্তন দরকার।

জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশ্বে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। তেমনটা হলে বহির্বিশ্ব থেকে আমাদের খাদ্য আমদানি কঠিন হবে। তাই খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থে আমাদের কৃষিকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর ক্রমবিবর্তনশীল বিশ্বকে মাথায় রেখে কৃষিকে আধুনিকভাবে সাজাতে হবে। কৃষির জন্য ব্যাপকভাবে পরিকল্পনা ও গবেষণা প্রয়োজন। উন্নত দেশে কৃষকদের নানাভাবে সুরক্ষা প্রদান করে রাষ্ট্র। অনেক দেশে বিভিন্ন ধরনের কৃষিবীমা রয়েছে। সেই বীমার প্রিমিয়াম সরকার প্রদান করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে স্বল্পমূল্যে পণ্য বিক্রি হলে তার ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হয়। ভারতে কৃষিপণ্যের দাম নির্ধারণে জাতীয় মূল্য কমিশন রয়েছে। দেশটির রাজ্য কেরালায় ৬০ বছরের বেশি বয়স্ক কৃষককে পেনশন দেয়া হয়। আমাদেরও এ ধরনের প্রণোদনামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের প্রসারসহ রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় নীতি সমর্থন ও প্রণোদনার মাধ্যমে দেশে কৃষির অগ্রযাত্রা বজায় থাকবে, এটাই প্রত্যাশা।




  এ বিভাগের অন্যান্য