www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

কৃষির যান্ত্রিকীকরণ এখন সবচেয়ে জরুরি


 বণিক বার্তা    ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২, বৃহস্পতিবার, ১১:১২   কৃষি অর্থনীতি  বিভাগ


এসিআই অ্যাগ্রোলিংক লিমিটেডের পাশাপাশি এসিআই মোটরস লিমিটেড ও প্রিমিয়াফ্লেক্স প্লাস্টিকস লিমিটেডেরও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) দায়িত্বে রয়েছেন ড. এফএইচ আনসারী। প্রায় ২৭ বছর ধরে এসিআইয়ের সঙ্গে কাজ করছেন তিনি। কৃষিসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোয় কাজের অভিজ্ঞতা প্রায় ৪০ বছরের। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য এবং কৃষি গবেষণা বোর্ডের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি দেশের কৃষি খাতের বিভিন্ন দিক নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শাহাদাত বিপ্লব

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৃষির রূপান্তর হচ্ছে। দেশে কৃষির বর্তমান অবস্থা কেমন? ভবিষ্যতে কেমন হতে পারে?

বাংলাদেশে কৃষি বলতে আমরা যা বুঝি তার মধ্যে রয়েছে মাঠ ফসল, সবজি, ফলমূল, ডেইরি, মাংস, মত্স্য ও পোলট্র্রি। এগুলো নিয়েই আমাদের কৃষি। আমাদের দেশের কৃষিতে প্রচুর মানুষ জড়িত। আগে কৃষিকাজ হতো শুধু উৎপাদনের তাগিদে। তবে ইদানীং উৎপাদনের পাশাপাশি প্রক্রিয়াকরণসহ বিভিন্নভাবে মূল্য সংযোজন করে উন্নয়নের কাজও হচ্ছে। এখন আমাদের দেশে তরুণরা কৃষিতে যুক্ত হচ্ছে। যান্ত্রিকীকরণ হচ্ছে। অর্থাৎ বলা যায় আমরা কৃষির যান্ত্রিকীকরণ ও বাণিজ্যিক কৃষির দিকে এগোচ্ছি। আমাদের দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ গ্রামে বাস করে। যারা গ্রামে বাস করে, তাদের অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষি। আবার করোনার কারণে অনেক তরুণ চাকরি হারিয়েছে। অনেকে বিদেশ থেকে ফেরত এসেছে। তারা কৃষিতে যুক্ত হয়েছে। তারাও যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে কৃষির উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। ভবিষ্যতে যান্ত্রিকীকরণ আরো বাড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী কৃষকদের ব্যাংক হিসাবের গড় সঞ্চয় মাত্র ৫৭৯ টাকা। স্বল্প পুঁজি নিয়ে প্রান্তিক কৃষকরা কি কৃষির যান্ত্রিকীকরণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে?

কৃষকদের বড় একটা অংশ প্রান্তিক। তারা সাধারণত টাকা থাকলেও ব্যাংকে টাকা রাখেন না। বাড়িতে রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অবশ্য কৃষিতে যন্ত্র ব্যবহারের জন্য পুঁজির প্রয়োজন হয় না। বিভিন্ন কোম্পানি মেশিন সুবিধা দেয়, যার খরচ ফসল উৎপাদনের পর কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। আবার সরকারের পক্ষ থেকেও যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সুবিধা দেয়া হয়। এ যান্ত্রিকীকরণ আরো বাড়াতে হবে। বাণিজ্যিক কৃষির বিকল্প নেই। আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছি। যেখানে ভিয়েতনাম বা থাইল্যান্ড প্রতি হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদন করছে গড়ে সাত টনের বেশি, আমরা সেখানে উৎপাদন করছি চার-পাঁচ টন। মাছ-মাংস, সবজি ও বিভিন্ন ফসল এসব দেশ একই জমিতে আমাদের চেয়ে অধিক হারে উৎপাদন করছে। সফলতা পেতে হলে তাদের অনুসরণ করতে হবে।

জমিতে সার-কীটনাশক পরিমিত মাত্রায় প্রয়োগ করা হচ্ছে না। ফলে একদিকে যেমন কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে পরিবেশ ও মাটির স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এ থেকে উত্তরণের উপায় কী?

সারের পরিমাণের বিষয়ে ঠিক করে দেয়া হয়েছে, কোন ফসলের জন্য কী পরিমাণে সার ব্যবহার করতে হবে। ঢালাওভাবে এটা বলা হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন জমিতে কী পরিমাণে সমস্যা রয়েছে তা কিন্তু নির্ধারণ করা যায়নি। এখানে কিছু কাজ করার আছে। স্যাটেলাইটের তথ্য বা বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে যদি আমরা পরিমাণ নির্ধারণ করে দিতে পারি, তাহলে কৃষকদের খরচও কমবে। এতে মাটির উর্বরতা ঠিক থাকার পাশাপাশি কোনো মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হবে না।

কৃষিপণ্য রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থান কেমন?

বাংলাদেশ গত বছর ভালো রফতানি করেছে কৃষি খাতে। আমাদের যে হারে জনসংখ্যা ও ভূমি রয়েছে, তাতে আমাদের আরো অনেক বেশি পরিমাণে রফতানি করা উচিত। সমস্যা হচ্ছে আমরা এখন যা রফতানি করছি, তা মূলত যেসব স্থানে বাঙালি রয়েছে সেখানে। এটিকে মূলধারার বাজারে নিয়ে যেতে হবে। তাহলে আমরা কৃষি থেকে ব্যাপক হারে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারব। সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এ সেক্টরে আরো অনেক বেশি বিনিয়োগ করা দরকার। সরকার যে হারে ভর্তুকি দেয়, তা বাড়িয়ে দিতে হবে; যেন তা দীর্ঘমেয়াদি হয়।

ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে কিসে গুরুত্ব দেয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা খাদ্য সংকট নিয়ে পূর্বাভাস দিচ্ছে। সুতরাং আমাদের আরো মজুদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। খাদ্যপণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রক্রিয়াকরণে উন্নত হতে হবে। আমরা যা উৎপাদন করছি তা যদি প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়া যায়, তাহলে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যেমন দুধ তো সাধারণত দু-একদিনের বেশি রাখা যায় না। কিন্তু দুধ থেকে যদি ঘি বা অন্য কিছু তৈরি করে রাখা যায়, তাহলে কিন্তু তিন থেকে ছয় মাসও ধরে রাখা যাবে। এছাড়া বেসরকারি খাতকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ বাণিজ্যিক কৃষির জন্য বেসরকারি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বেসরকারি খাতের সঙ্গে সরকারকে সমন্বয় করতে হবে। তা না হলে আমরা কোনো সুফল পাব না।

বর্তমানে দেশে কৃষি ও কৃষকের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী?

আমাদের দেশের কৃষি ও কৃষকের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে প্রযুক্তি। বেসরকারি খাতে যে পরিমাণ প্রযুক্তি রয়েছে, তাও কৃষকের কাছে ঠিক সময়ে পৌঁছায় না। আবার প্রযুক্তি পর্যাপ্ত হলেও কৃষকরা এর ব্যবহার জানেন না। হাতে-কলমে শেখানোর জন্য আমাদের যে সম্প্রসারণ সেবা রয়েছে, সেটিকে আরো দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। বেসরকারি খাতে এক লাখের বেশি ও সরকারি খাতে ২৫ হাজারের বেশি সম্প্রসারণ কর্মী রয়েছে। তাদের সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। এতে দুই সেক্টরেই যে উদ্ভাবন হচ্ছে তা প্রান্তিক খামারিদের বা কৃষকের হাতে যাবে। এতে উৎপাদন বাড়বে এবং ‘লস অব প্রডাকশন’ কমে যাবে। দেখা যাবে কৃষি খাত লাভজনক হয়েছে। এখন যে অবস্থায় রয়েছে তার চেয়েও অনেক বেশি লাভজনক হবে।

বাংলাদেশে হুট করেই খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়ে যায়। কিন্তু প্রান্তিক কৃষক সে অনুযায়ী দাম পান না। আবার ভোক্তারা অতিরিক্ত মূল্যে খাদ্যপণ্য কেনেন? এ অসামঞ্জস্যের কারণ কী? আর তা প্রতিকারের উপায় কী?

আমাদের দেশে কৃষিতে ফুড ভ্যালু চেইনের সম্পূরক ভ্যালু চেইন নেই, যার কারণে এ অসামঞ্জস্যতা দেখা যাচ্ছে। ৫০ বছর ধরে সরকারি-বেসরকারি খাত শুধু উৎপাদনে জোর দিয়েছে। এতে উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদনের পর যে প্রক্রিয়াকরণ করা প্রয়োজন, সে সক্ষমতা আমাদের দেশে নেই। প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা সেভাবে তৈরি হয়নি। ফলে কখনো দাম বেড়ে যায় আবার কখনো তা কমে যায়। ভ্যালু চেইন প্রতিষ্ঠা করা গেলে কৃষকও ভালো দাম পাবেন এবং ভোক্তাও পণ্য কিনে সন্তুষ্ট থাকবেন।

এসিআই কৃষি খাতে শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি কিসে জোর দিচ্ছে?

এসিআই নব্বইয়ের দশকের দিকে ব্যবসা বহুমুখীকরণ শুরু করেছে। গত ১৪ বছরে আমরা প্রায় ৩০-৩৫টি ব্যবসা নতুন করে শুরু করেছি। আমাদের এখন ছয়টি খাতে ব্যবসা রয়েছে। এগুলো হলো ফার্মাসিউটিক্যাল, কনজিউমার ব্র্যান্ড, রিটেইল চেইন, এগ্রিবিজনেস, মোবিলিটি বিজনেস এবং প্লাস্টিক বিজনেস। আমাদের বর্তমানে কোম্পানির গ্রোথ প্রায় ১৫ শতাংশ। কৃষিতেও যথেষ্ট ভালো এখন। কৃষির মধ্যে বীজ, বীজের গবেষণা, বীজের উৎপাদন, প্রসেসিং, মার্কেটিং, সার, বিভিন্ন সলিউশন, অ্যানিমেল জেনেটিকসসহ বিভিন্ন কৃষিজাতীয় পণ্য রয়েছে। আমরা ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে আমাদের পণ্য রফতানি করছি। ইদানীং আমরা সার দেয়ার জন্য ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করার চিন্তাভাবনা করছি। অর্থাৎ কীভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যায় সেদিকে আমরা ভাবছি। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। সমুদ্রও অনেক বড়। তাই আমরা নদী ও সমুদ্রের যে সম্পদগুলো আছে, সেগুলো নিয়ে কাজ শুরু করেছি। ভবিষ্যতে আমরা নদী ও সমুদ্রের সম্পদগুলো আহরণের চেষ্টা করব।




  এ বিভাগের অন্যান্য