www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

রেশম শিল্পের বিকাশ


 এগ্রিবার্তা ডেস্ক    ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২, বৃহস্পতিবার, ১১:১৮   কৃষি গবেষণা বিভাগ


রেশম এক ধরনের প্রাকৃতিক প্রোটিন তন্তু যার কয়েকটি ধরন বস্ত্র শিল্প বয়নের কাজে ব্যবহার করা হয়। রেশমের সর্বাধিক পরিচিত ধরন বম্বিকস মোরি নামের রেশম পোকার লার্ভার গুটি থেকে সংগ্রহ করা হয়। রেশম পোকার গুটি থেকে এক ধরনের সুতা পাওয়া যায়। বিশেষ ব্যবস্থায় রেশম পোকা চাষের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে এ সুতা প্রস্তুত করা হয়। রেশম পোকার গুটি চাষের পদ্ধতিকে সেরিকালচার বলা হয়।

বাংলায় দীর্ঘদিন ধরে চার ধরনের রেশম তৈরি হয়ে আসছে: মালবেরি, এন্ডি, মুগা ও তসর। প্রথমটি তৈরি হয় বম্বিকস বর্গের রেশম পোকার গুটি থেকে, যে পোকা মালবেরি বা তুঁত গাছের পাতা খায়; দ্বিতীয়টি তৈরি হয় ফিলোসেমিয়া বর্গের রেশম গুটি থেকে যারা ক্যাস্টর গাছের পাতা খায়; তৃতীয়টি অ্যান্থেরিয়া আসমেনসিন বর্গের রেশম গুটি থেকে, যারা কুল, তেজপাতা ও কর্পুরের পাতা খায় এবং চতুর্থটি অ্যানথেরি বর্গভুক্ত রেশম গুটি থেকে যারা ওক গাছের পাতা খায়। সচরাচর মালবেরি রেশম সবচেয়ে মূল্যবান হিসেবে বিবেচিত।

বাংলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ শিল্প এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান উপকরণ হিসেবে রেশম তৈরি প্রক্রিয়ার ইতিহাস শুরু হয়েছিল বহু শতক আগেই। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে সুদূর ইতালিতে এ রেশম গাঙ্গেয় সিল্ক নামে পরিচিত ছিল। বাংলায় রেশম উৎপাদনের দীর্ঘ ইতিহাস থেকে দেখা যায়, গ্রামের গৃহস্থরা রেশম উৎপাদনের প্রথম তিনটি পর্যায় সম্পন্ন করেন: মালবেরি বা তুঁত চাষ, রেশম গুটি লালন-পালন ও সুতা কাটা। এরপর সেই সুতা নিকটবর্তী গ্রাম বা শহরের দক্ষ তাঁতিদের কাছে বিক্রি করা হয় বিভিন্ন রেশম বস্ত্র তৈরির জন্য।

বাংলায় এত বেশি রেশম উৎপাদিত হতো যে তা স্থানীয় চাহিদা পূরণের পর প্রচুর পরিমাণে বাইরে রফতানি হতো। এ সিল্কের বাজারই প্রথম ইউরোপীয় বণিকদের বাংলায় আসতে আকৃষ্ট করে। ছোট আকারে বাণিজ্যকুঠি স্থাপনের মধ্য দিয়ে যাত্রা করে পরিণতিতে ইউরোপীয় বণিক কোম্পানিগুলো বাংলার বস্ত্র শিল্পের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে। ক্রমে তারা বাংলার তৈরি পোশাক শিল্পকে প্রভাবান্বিত করে এবং বস্ত্র রফতানির পরিবর্তে প্রসারণশীল বিশ্ববাজারের চাহিদা অনুযায়ী বস্ত্র তৈরির কাঁচামাল রফতানি শুরু করে।

১৮৩৫ সালের মধ্যে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তৎপরতা এ অঞ্চলের ১০০টি রেশম নিষ্কাশন কেন্দ্র নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। এর পর থেকে প্রাইভেট কোম্পানিগুলো রেশমের কাঁচামাল বাণিজ্যকে ব্যাপক আকারে সম্প্রসারণ করে এবং রেশমের রফতানি বাণিজ্য বেশ কিছুকাল জমজমাট থাকে। কিন্তু ১৮৭০-এর দশকে মহামারী আকারে রেশম কীটের রোগবিস্তার এবং কারিগরি দিক থেকে অচলাবস্থা সৃষ্টির দরুন বাংলার রেশম শিল্প বিদেশের বাজার হারায়।

বিশ শতকের প্রথম দিকে দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে বাংলার রেশম বস্ত্রের কদর কমে গিয়ে সেখানে কাশ্মীর ও মহীশূর সিল্কের চাহিদা তৈরি হয়। ১৯৩০ সালের মধ্যে চীন ও জাপানের সিল্ক বাংলার রেশমের স্থান দখল করে, এমনকি বাংলায়ও এসব সিল্ক আসতে শুরু করে। ফলে বাংলায় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে চরম বিপর্যয় দেখা দেয়। সিল্ক উৎপাদনের ক্ষেত্রে এ বিপর্যয় বাংলার তত্কালীন সরকারকে উদ্বিগ্ন করে তোলে।

রেশম উৎপাদনে পাকিস্তান সরকারের তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না। রেশম শিল্পকে ব্যক্তিমালিকানায় গড়ে তোলার সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোক্তা এগিয়ে আসেননি। আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রেও কোনো সংরক্ষণমূলক শুল্কনীতি ছিল না। সরকার রেশম উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানির ব্যাপারে অবাধ সুযোগ দেয়। অবশ্য পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষ রেশম শিল্পের উন্নয়নের জন্য বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ফলে ১৯৬২ সালের মধ্যে সরকারি অর্থায়নে রাজশাহী সিল্ক ফ্যাক্টরি চালু হয়।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর রেশম শিল্পের উন্নয়নের জন্য অধিকতর সুসংবদ্ধ নীতি গ্রহণ করা হয়। এছাড়া এ শিল্প বৈদেশিক সাহায্য এবং কারিগরি সহায়তা লাভ করে। ১৯৭৭ সালে সিল্ক খাতের কার্যক্রম সমন্বয়ের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সেরিকালচার বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরই মধ্যে কতিপয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রেশম উৎপাদনে এগিয়ে আসে। স্থানীয়ভাবে কিছু সাফল্য অর্জিত হলেও অধিকাংশ উদ্যোগই নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়। সে সময় বাংলাদেশের রেশম উৎপাদনের পরিমাণ ভারতের সিল্ক উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক ছিল।

রেশম থেকে প্রথমে হ্যান্ডলুম কিংবা পাওয়ার লুমে থান কাপড় প্রস্তুত করা হয়। রেশম থেকে প্রস্তুত পোশাকের মধ্যে শাড়ি, কামিজ, থ্রি-পিস, লেহেঙ্গা, ওড়না, শার্ট, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, স্কার্ফ, রুমাল, টাই, বেবিওয়্যার ইত্যাদি অন্যতম। শাড়ি ও অন্যান্য তৈরি পোশাকে বৈচিত্র্য আনার জন্য বিভিন্ন ধরনের নকশা করা হয়। এসব নকশায় রঙ, রঙিন সুতা, জরি, পুঁতি, কাচ, প্লাস্টিক নানা উপকরণ ব্যবহার হয়ে থাকে।

রেশমের ঐতিহ্যবাহী এবং অতি জনপ্রিয় শাড়ির নাম গরদ। রাজশাহী অঞ্চলে বুনানো এ শাড়ি রেশমের স্বাভাবিক রঙের জমিনের বিপরীতে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লাল বা সবুজ এবং কখনো সোনালি জরির কাজ করা পাড় থাকে। পাড়ে রেখা, ত্রিভুজ ও জ্যামিতিক আকার সমৃদ্ধ সূক্ষ্ম নকশা থাকে। স্বাভাবিক রঙের রেশমি কাপড়ের নাম কোরা, ক্ষারি বা ধোয়া হলে তার নাম হয় গরদ। গরদের শাড়ির পাড়ের রঙ যা-ই হোক না কেন, শাড়ির জমিন উজ্জ্বল বা হাতির দাঁতের বর্ণ হয়ে থাকে।

রেশমের তৈরি অন্য একটি জনপ্রিয় শাড়ির নাম ঢাকার কাতান। ভারতের উত্তর প্রদেশের বেনারস থেকে আগত মোহাজেররা ঢাকা শহরের মালিটোলা, বেচারাম দেউড়ী, দক্ষিণ মৌসুণ্ডি এবং লালমোহন সাহা স্ট্রিটে বেনারসি কাতান বয়ন আরম্ভ করে। পরে এরা মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে বসতি স্থাপন করে। কাতান বয়নে গর্ত তাঁত ব্যবহার করা হয়। এ তাঁতে শাড়ির নকশা তোলার কাজে জ্যাকার্ড ব্যবহার করা হয়। রেশমি সুতা ও বুটির জন্য জরি ব্যবহার হয়। পাকান রেশমি সুতার নাম কাতান। বেনারসি শাড়িতে পাকান সুতা ব্যবহার হয় বলে এর অন্য নাম কাতান শাড়ি।

রেশম উৎপাদন একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। রেশম গুটি থেকে রেশম তৈরি করা হয়। রেশমগুটি আসলে রেশম মথের শুঁয়োপোকা; এদের একমাত্র খাদ্য তুঁতপাতা। রেশম কীট ডিম থেকে জন্মায় এবং গুটিতে রূপান্তরিত হওয়ার পর্যায় শেষ করে তারা রেশম মথ হিসেবে আবির্ভূত হয়। স্ত্রী মথ তখন কালচক্র পুনরায় শুরু করার জন্য ডিম পাড়ে। গুটিবদ্ধ অবস্থায় রেশম পিউপা বা কীটগুলোকে মেরে ফেলে সেগুলোকে সিদ্ধ করে সুতা ছাড়ানো হয় এবং পরে তা গোটানো হয়। এ সুতা বিভিন্ন ধরনের বস্ত্র তৈরির জন্য নানাভাবে প্রস্তুত করা হয়।

বাংলাদেশে প্রায় সব ধরনের রেশম গুটিই গ্রামের হাটগুলোয় বাঁশের ট্রেতে করে প্রতিপালন করা হয়। রেশম গুটি পালন খুবই পরিশ্রমসাপেক্ষ, বিশেষ করে মৌসুমের শেষে যখন হাজার হাজার রেশম পোকা গোগ্রাসে পাতা খায় তখন তাদের পালনের জন্য পর্যাপ্ত শ্রমের প্রয়োজন হয়। রেশম রং করা, বোনা ও ছাপা প্রভৃতি কাজ গ্রামের ছোট কারখানা এবং শহরের উন্নত ফ্যাক্টরিতে সম্পন্ন হয়। বাংলায় যারা সিল্ক তৈরি করেন তাদের মধ্যে রেশমের ভিন্ন ধরনের নাম প্রচলিত আছে। যেমন রেশম গুটি পালনকারীকে বলা হয় বোসনি, রেশম গুটিকে পোলু, গুটির সুপ্তাবস্থাকে চোঞ্চ বা বিজন গুটি, গুটি মেলার বাঁশের চালনকে বলে চন্দ্রোকি, রেশম কীটের মহামারী রোগকে কোটা রোগ এবং জীবাণু সংক্রামক মাছিকে বলা হয় উজি।

রেশম গুটি বা কোকুন দেখতে অনেকটা কবুতরের ডিমের ন্যায়। কোকুনের সুতা অবিন্যস্ত, কিন্তু ভেতরে ৫০০ মিটারেরও বেশি লম্বা একটি মাত্র সুতা সমকেন্দ্রীয়ভাবে বিন্যস্ত থাকে। কোকুন তৈরি হতে তিনদিন সময় লাগে। কোকুনের আকৃতি ও রঙে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। আটদিনের মধ্যে গুটির ভেতর শুককীট পিউপায় পরিণত হয়। পিউপায় পরিণত হওয়ার আগেই কোকুন গরম পানিতে সিদ্ধ করে ভেতরের পোকাটি মেরে ফেলতে হয়। এ কোকুন থেকেই রেশম সুতা সংগ্রহ করা হয়। পূর্ণাঙ্গ পিউপা মথে পরিণত হয়ে গুটির প্রান্ত ফুটো করে যদি বের হয়ে আসে তবে সুতার ধারাবাহিকতা ছিন্ন হয় এবং রেশম সুতার গুণগত মান হ্রাস পায়। দুই থেকে ছয়টি গুটির ভেতরের সুতা একত্র করে একটি রিল তৈরি করা হয়। বাইরের পরিত্যক্ত সুতাগুলো পাকিয়ে স্প্যান সিল্ক প্রস্তুত করা হয় যা দিয়ে তৈরি হয় মটকা জাতীয় সিল্ক।

বাংলাদেশের রেশম বাজার পুরোপুরি স্থানীয়। কখনো কখনো স্থানীয় সরবরাহের বাইরেও রেশমের চাহিদা দেখা যায় এবং বৈধ ও অবৈধ উপায়ে প্রধানত ভারত থেকে রেশমবস্ত্র আমদানি হয়ে থাকে। বাংলাদেশের উচ্চবিত্ত শ্রেণীর জীবনে রেশমের একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। একখানি রেশম শাড়ির আভিজাত্য একটি দামি সুন্দর পোশাকের চেয়ে অনেক বেশি। রেশম শাড়ি বিত্ত, সভ্যতা, বাঙালি রমণীর ঐতিহ্যগত সৌন্দর্য এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের প্রতীক। সিল্কের বিভিন্ন নমুনা ও ডিজাইনের জন্য বাংলা ভাষায় বিশেষ বিশেষ নাম প্রচলিত, যেমন গরদ, মটকা, বেনারসি প্রভৃতি।

  • ক্যারিয়ার অ্যান্ড প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস বিভাগ
  • মো. আরাফাত রহমান: গবেষক
  • সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়



  এ বিভাগের অন্যান্য