www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

মধুপুরে বিষমুক্ত আনারস চাষে ঝুঁকছেন চাষীরা


 এগ্রিবার্তা ডেস্ক    ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, শুক্রবার, ৭:৪৬   সমকালীন কৃষি  বিভাগ


টাঙ্গাইলের মধুপুরে আনারসচাষীর সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে দেশব্যাপী আনারসের চাহিদা। তবে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক কেমিক্যাল ব্যবহারে টাঙ্গাইলের মধুপুরের আনারসের ঐতিহ্য দিন দিন হারাতে বসেছে। অতিরিক্ত রাসায়নিক প্রয়োগের মাধ্যমে আকারে বড় এবং আকর্ষণীয় রঙ তৈরি হলেও নষ্ট হচ্ছে আনারসের স্বাদ-গন্ধ ও গুণাগুণ।

তবে এখন কিছুটা পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। অতিরিক্ত রাসায়নিক দিয়ে চাষের পাশাপাশি মধুপুরে বিষমুক্ত আনারসও চাষ হচ্ছে। মধুপুরের আনারসের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে ছানোয়ার হোসেন ও শাহাজান মিয়া নামের দুই কৃষক রাসায়নিক মুক্ত আনারস চাষ করছেন।

মধুপুর গড়ের মধুপুর, মুক্তাগাছা, ফুলবাড়িয়া ও ঘাটাইল উপজেলায় প্রায় ২১ হাজার একর জমিতে আনারস চাষ হয়। তবে সিংহভাগই চাষ হয় মধুপুর উপজেলায়। এ উপজেলার অরুণখোলা, ষোলাকুড়ি, কাইলাকুড়ি, আউশনাড়া ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি আনারস চাষ হয়। এসব এলাকায় চাষ হওয়া আনারসের মধ্যে জনপ্রিয় আনারস হলো হানিকুইন, জলডুগি, ঘোড়াশাল, ক্যালেন্ডার জাতের আনারস। এছাড়া বর্তমান সময়ে জায়ান্টকিউ ও ফিলিপাইনের এমডিটু জাতের আনারস চাষেও ঝুঁকছেন এলাকার চাষীরা।

মধুপুরের মহিষমারা গ্রামের আনারসচাষী ছানোয়ার হোসেন বলেন, আমি ২০১৪ সালে প্রায় ২০০ শতাংশ জমিতে রাসায়নিকমুক্ত আনারস আবাদ শুরু করি। আনারস আকারে বড় এবং পেকে হলুদ রঙ না হওয়ায় বাজারে চাহিদা কিছুটা কম হয়। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে না পারায় প্রথম অবস্থায় লোসসান গুনতে হয়। তবু আমি রাসায়নিক প্রয়োগের মাধ্যমে আনারস বড় ও পাকানোর বিপক্ষে ছিলাম। এবারো আমি দুই বিঘা জমিতে ফিলিপাইন এমডিটু জাতের বিষমুক্ত আনারস চাষ করছি এবং ক্যালেন্ডার জাতের আনারস চাষ করছি ছয় বিঘা জমিতে।

মধুপুর উপজেলার কালিয়াকুড়ি ইউনিয়নের হাগুড়াকুড়ি গ্রামের বাসিন্দা শাহাজান মিয়া (৬০) ১ একর ৪০ শতাংশ জমিতে আনারস চাষ করছেন। আনারস চাষে লাভবান না হওয়ায় চাষাবাদের পাশাপাশি এখন তিনি ভ্যানগাড়ি চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন।

আনারসচাষী শাহাজান মিয়া বলেন, ২০১৫ সাল থেকে আবার আমি আনারস চাষ করছি। বাগানে চারা রোপণ করার পর থেকে ফল পরিপক্ব হতে সময় লাগে ১৮-২০ মাস। এর আগেই বাজারে চলে আসে। যার কারণে আমি সময়মতো ফল বিক্রি করতে পারি না। এ ফল সময়মতো বিক্রি না হওয়ায় আমি লোকসানে পড়ি। আবার আমাকে বাগান নিয়মিত পাহারা দিতে হয়। কারণ বানর, শিয়াল আনারস নষ্ট করে ফেলে। কারণ আমি কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করি না। আমি শুধু জৈব সার ব্যবহার করি। ফলে আমার বাগানে ফল ছোট হয়, রঙ আসে না আবার একসঙ্গে পাকে না। ফলে আমার খেতের আনারস কোনো পাইকার নিতে চান না। এ আনারসের মূল্য অনেক কম হয়। ২৫-৩০ টাকা পর্যন্ত বেচতে পারি। আমি আশপাশের মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছে আনারস বিক্রি করি। তারা হাটবাজারে বিক্রি করেন।

এ বিষয়ে আরো কথা হয় মধুপুরের বিভিন্ন এলাকার বেশ কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে। তারা জানান, তাদের প্রায় সবাই রাসায়নিকমুক্ত আনারস আবাদ করতে চান। কিন্তু আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় তারা সেটা করতে পারছেন না। ভোক্তাদের রাসায়নিকমুক্ত আনারস কিনতে উদ্বুদ্ধ করতে পারলে ও স্বল্পমেয়াদি বা দীর্ঘমেয়াদি আনারস সংরক্ষণে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে হিমাগার এবং বাজারজাত নিশ্চিতকরণ করতে পারলেই রাসায়নিকমুক্ত আনারস আবাদ বাড়বে।

মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আল মামুন রাসেল বণিক বার্তাকে বলেন, বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহার থেকে কৃষকরা সরে আসছেন। আমাদের পক্ষে থেকে নিয়মিত চাষীদের সচেতন করা হচ্ছে। অনেক চাষীই এখন বিষমুক্ত আনারস চাষ করছেন। এরই মধ্যে সরকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যা প্রক্রিয়াধীন। আশা করি আনারস, কাঁঠাল, কলা এ-জাতীয় সেসব ফল রয়েছে, সেগুলোকে প্রক্রিয়াজাত, বাজারজাত নিশ্চিতকরণে এগিয়ে আসতে পারব। এছাড়া নিরাপদ আনারস উৎপাদনে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও উদ্যোক্তারাও এগিয়ে আসছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রাজশাহী ইনস্টিটিউট অব বায়োসায়েন্সেসের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহাবুদ্দীন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক মিশ্রিত ফল খেলে মানব দেহে দীর্ঘমেয়াদি নানা রোগ হতে পারে। এমনকি লিভার ও কিডনি নষ্ট হওয়াসহ ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের সৃষ্টি হতে পারে। কেমিক্যাল মুক্ত আনারস চাষ করতে চাষীদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ভোক্তাদের রাসায়নিকমুক্ত আনারস কিনতে উদ্বুদ্ধ এবং স্থায়ীভাবে প্রক্রিয়াজাত, বিশ্ববাজারে বাজারজাত নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে চাষীরা এ পথ থেকে সরে আসবেন।

তিনি আরো বলেন, বিশ্ববাজারে আনারসের ব্যাপক চাহিদা। বিশ্বজুড়ে আনারস ফল হিসেবে ও আনারসজাত পণ্য রফতানিতে প্রথম সারিতে রয়েছে থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইন। আন্তর্জাতিক বাজারে আনারসজাত পণ্য অধিক জনপ্রিয়। সুতরাং আমাদের দেশে আনারস থেকে ভ্যালু এডিশনের মাধ্যমে খাদ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বমানের খাদ্যপণ্য উৎপাদন করা সম্ভব। বেভারেজ উৎপাদনে বিশেষ করে জুস তৈরির কাঁচামাল হিসেবে পাল্পের চাহিদা বিশ্বজুড়ে। দেশের অভ্যন্তরীণ কিছু বেভারেজ কোম্পানি আনারসের জুস বিদেশে রফতানি করছে এবং এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে।




  এ বিভাগের অন্যান্য