www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

জীবিকা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা


 নবীন কুণ্ডু    ১৩ অক্টোবর ২০২২, বৃহস্পতিবার, ৭:৩৬   সম্পাদকীয় বিভাগ


মহামারী চলাকালে কঠোর লকডাউনে সীমিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দেশে শহুরে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন চলছে, এতে মৌলিক চাহিদা পূরণ ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গিয়েছে। দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির কারণে দ্রুত নগরায়ণ হচ্ছে এবং শহরে ভাসমান মানুষের বসতির ফলে বস্তি গড়ে উঠছে। মনে রাখা দরকার, সামষ্টিক অর্থনীতিতে দারিদ্র্য ও বেকারত্বের মধ্যে ধনাত্মক সম্পর্ক দেখায়। অর্থাৎ সামষ্টিক অর্থনীতিতে বেকারত্ব কমলে একটি দেশের দারিদ্র্য কমবে এবং বিপরীতভাবে বেকারত্ব বাড়লে একটি দেশের দারিদ্র্য বাড়বে। ইউএন-হ্যাবিট্যাট (২০১৮) অনুসারে, শহরে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বস্তি এলাকায় অনানুষ্ঠানিক বসতি গড়ে উঠছে। প্রায় এক বিলিয়ন দরিদ্র মানুষ রয়েছে যারা বস্তিতে বসবাস করছে। যদিও দ্রুত নগরায়ণে জীবনযাত্রার প্রক্রিয়া এরই মধ্যে দারিদ্র্য ও বেকারত্বের মতো বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের (২০১৯) তথ্যমতে, এ বসতিগুলোয় দারিদ্র্যের হার বাংলাদেশের গড় দারিদ্র্যের চেয়ে তিন গুণ বেশি। বাংলাদেশে গত দুই দশকে দারিদ্র্য হ্রাসের হার রেকর্ড অর্ধেক হলেও মহামারীর ফলে দারিদ্র্য উল্লেখ্যযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) গবেষণায় দেখা যায়, কভিড-১৯-এর প্রভাবে দেশে ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচের স্তরে যুক্ত হয়েছে। শহুরে শ্রমিকের আয় কমেছে ৮০ শতাংশ এবং গ্রামীণ শ্রমিকের আয় কমেছে ১০ শতাংশ। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুরক্ষিত নয় এবং তারা কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের সময় দারিদ্র্যসীমার নিচের স্তরে চলে গিয়েছে।

মহামারীর বিস্তার নিঃসন্দেহে শহরে বসবাসকারী অনানুষ্ঠানিক বসতিগুলোর জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্যকে বাড়িয়ে তুলছে। অস্বাস্থ্যকর আবাসন ও স্যানিটেশন, বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাব, শিক্ষার সুযোগ ও চিকিৎসা সুবিধা বস্তিতে বসবাসকারীদের জীবনযাত্রার মানকে ব্যাহত করে। সানেমের নিজস্ব গবেষণায় দেখা যায়, করোনার প্রভাবে ২০২০ সালে দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার যেখানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ৩ শতাংশ, সেখানে জিইডি-সানেমের জরিপে দেখা যায়, ২০১৮ সালে দেশে এ হার ছিল ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, কয়েক মিলিয়ন নতুন লোক দারিদ্র্যের মধ্যে পড়বে, যা দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাধাগ্রস্ত করবে। বাংলাদেশে দুটি বৃহত্তম শহর ঢাকা ও চট্টগ্রামের বস্তিগুলো ঘনবসতিপূর্ণ স্থানগুলোর মধ্যে একটি, যেখানে লাখ লাখ দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দারিদ্র্যের দিকে ধাবিত করছে। বাংলাদেশে দুটি শহুরে বস্তিতে পারিবারিক জীবিকা নিরাপত্তা (এইচএলএস) সূচকগুলোর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক, খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং ক্ষমতায়ন। এইচএলএস ডোমেইনগুলো স্পষ্টতই আন্তঃসংযুক্ত। বিবিএসের (২০১৪) বস্তিশুমারি প্রতিবেদন অনুসারে, সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বস্তি রয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা সিটি করপোরেশনে। যেখানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে ১৫ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং খুলনা সিটি করপোরেশনে ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ বস্তি রয়েছে। ইউএন-হ্যাবিট্যাট (২০১৮) অনুসারে, বস্তিবাসীরা নগরায়ণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত, যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাধাগ্রস্ত করছে।

বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ, যেখানে গড় জনসংখ্যার ঘনত্ব চীনের তুলনায় ৭ দশমিক ৫ গুণ। কভিড-১৯ ক্রমবর্ধমান বোঝা সত্ত্বেও প্রশাসন লকডাউনকে পরোক্ষভাবে এবং তারপর আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করার অনুমতি দিয়েছে। আমাদের দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাথাপিছু আয় নিম্ন হওয়ায় মহামারী চলাকালীন কঠোর লকডাউন আরোপে শিথিলতা দেখা দেয়, ফলে প্রয়োজনীয় লকডাউন সীমিত পরিসরে বজায় থাকে। মহামারীর বিস্তার রোধে সীমিত লকডাউন এবং সামাজিক দূরত্ব সুনিশ্চিত না হওয়ার অন্যতম কারণ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, ফলে পূর্বাভাসের চেয়ে কম সফল হয়েছে। করোনাকালে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার জন্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত হওয়ায় দারিদ্র্য বাড়তে থাকে। অন্যদিকে মহামারীতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নিম্ন আয় হওয়ায় শহুরে বস্তিতে অপরাধপ্রবণতা বাড়তে থাকে। যদি নিরাপত্তা সতর্কতার সঙ্গে অবলম্বন করা না হয় তবে বস্তিতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

মহামারীর ফলে জীবন ও জীবিকা যেমন ব্যাহত হয়েছে, তেমন ক্ষতি হয়েছে মানুষের স্বাস্থ্য, মৃত্যু হয়েছে কয়েক মিলিয়ন মানুষের, এমনকি এ মৃত্যুর ধারা অব্যাহত রয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মহিলাদের তুলনায় পুরুষদের সামগ্রিক সংক্রমণের হার এবং মৃত্যুহার বেশি। মহামারী চলাকালে কঠোর লকডাউনে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে শিল্পে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষ। যদিও বাংলাদেশ সরকার বিশেষ ফান্ড হিসেবে রফতানিমুখী উৎপাদন শিল্পের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখে, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ১৭৮ শতাংশ। এমনকি লকডাউন আরোপে শিল্প-কলকারখানায় লেইডঅফ (অবৈতনিক অবস্থায় চাকরি) ঘোষণা করে, যা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে মহিলা শ্রমজীবীদের জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করে। যেখানে মহিলাদের তুলনামূলকভাবে উচ্চ অংশগ্রহণের ফলে পুরুষদের তুলনায় মহিলারা বেশি চাকরি হারায়। একইভাবে মহামারীর কারণে বৈতনিক ও অবৈতনিক শ্রমজীবীদের লিঙ্গসমতাকে আর্থসামাজিকভাবে বৈষম্য তৈরি করে। তবে মহামারী চলাকালে শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতিকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে হয়, যা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে শ্রমজীবী নারী পুরুষ দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে প্রভাবিত করে।

বাংলাদেশে ভাসমান জনসংখ্যা আর্থসামাজিক ও মানসিক দৃঢ়তার ওপর ভিত্তি করে মোকাবেলা এবং অভিযোজন করে থাকে। যদিও তাদের জীবনযাত্রা সামাজিকভাবে কিছুটা টেকসই হলেও তাদের জীবিকার ধরন অর্থনৈতিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে ও পরিবেশগতভাবে টেকসই নয়। জীবনযাত্রা ও জীবিকার ধরন টেকসই না হওয়ার কারণ প্রতিটি বাসস্থানে জনসংখ্যার উচ্চ ঘনত্ব। ভাসমান মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবিকার পরিণতি অবশ্যই ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন প্রচেষ্টার জন্য একটি পাঠ হিসেবে কাজ করবে। যদি মহামারী বর্ধিত সময়ের জন্য অব্যাহত থাকে, তাহলে শহুরে এলাকায় কম মজুরিতে বসবাসকারীরা খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন হবে। জেনে রাখা ভালো, একমাত্র কভিড-১৯-এর ফলে পরিবেশ ছাড়া শিক্ষা এবং পরিবারসহ সব খাতে নেতিবাচকভাবে প্রভাব ফেলে। ফলে কভিড-১৯ মহামারী অনানুষ্ঠানিক বন্দোবস্ত এবং পরিকল্পনা ও নীতিগত ঘাটতির দিকে সবার মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেছে।

বিশ্বব্যাপী দরিদ্র মানুষ মজুরি হারিয়েছে, তারা খাদ্যের নিরাপত্তা ও মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ফলে তারা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে নিমজ্জিত হয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তার জন্য খাদ্য ক্যালরির ব্যবধানের নির্ধারক তিনটি স্তম্ভের মাধ্যমে নির্ণয় করা হয়—খাদ্যের প্রাপ্যতা, অ্যাকসেস ও ব্যবহার। ফলে কভিড-১৯ মহামারী মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ও আচরণগত মনোভাবকে আরো সংকটাপন্ন করে তুলেছে। কভিড-১৯ মহামারীতে, মানসিক স্বাস্থ্যের চাপ হিসেবে যেমন আর্থিক অসুবিধা, দৈনিক ব্যয় হ্রাস এবং খাদ্য সংকট সবই পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। ইউএন-হ্যাবিট্যাট ও ডব্লিউএফপির (২০২০) তথ্যমতে, এ মহামারী বাংলাদেশসহ অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় অনেক মানুষের স্বাস্থ্য, খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ নেতিবাচক প্রভাব কমাতে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক সুবিধা অব্যাহত রাখতে হবে। দারিদ্র্য শহুরে জনসংখ্যার সম্প্রসারণকে বাড়িয়েছে এবং বাংলাদেশে গ্রামীণ ও শহুরে দারিদ্র্য সূচকের মধ্যে যথেষ্ট বৈষম্য তৈরি করেছে, যেখানে দরিদ্র জনগোষ্ঠী এখনো মৌলিক প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে চায়। সর্বোপরি, কভিড-১৯ মহামারীর প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য, অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, এবং আর্থসামাজিক সংকট তৈরি করেছে।

গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্রমে বেড়ে এখন ৭ শতাংশের ওপরে। যেখানে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা খাতের সম্প্রসারণ, কৃষি খাতের অসামান্য অবদানে বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, কিন্তু মৌলিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে গোটা দেশ দিশেহারা। অস্বীকার করার উপায় নেই, জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে সরকারের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সার্বিক ব্যবস্থাপনা সন্তোষজনক না হওয়ায় মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। যার বাস্তবিক উদাহরণ কভিড-১৯ মহামারীর সময়কালে স্বাস্থ্যসেবার চিত্র। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের পাশাপাশি সার্বিক ব্যবস্থাপনা সন্তোষজনক করতে এরিয়াভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা কার্ড করতে হবে, যাতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা সর্বজনীন হয়ে ওঠে।

  • নবীন কুণ্ডু: সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়; রিসার্চ ফেলো, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট



  এ বিভাগের অন্যান্য