www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ

পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে পাচার হচ্ছে বন্যপ্রাণী


 এগ্রিবার্তা ডেস্ক    ১৬ নভেম্বর ২০২২, বুধবার, ৭:২৪   প্রাণিসম্পদ বিভাগ


ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলায় কয়েক মাস আগে দুটি ভালুক ছানা আটক করে সেখানকার স্থানীয় পুলিশ। পরে জানা যায়, ভালুক দুটি চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকা থেকে ধরে ভারতে পাচার করা হয়েছিল। বাংলাদেশ ওয়াইল্ড লাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ব্যুরো এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর কুমিল্লায় ‘মহাবিপন্ন’ প্রজাতির একটি উল্লুক উদ্ধার করা হয়। এটিও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চল থেকে ধরে পাচারের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।

সাম্প্রতিক সময়ে এমন অনেক বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছে পুলিশ, যেগুলো পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ধরে পাচার করছিল দুষ্কৃতকারীরা। বিশেষ করে শজারু, উল্লুক, লজ্জাবতী বানরসহ নানা প্রজাতির দুর্লভ প্রাণী উদ্ধার হচ্ছে বেশি। মূলত পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ি বনাঞ্চল থেকে বিপন্ন প্রজাতির এসব বন্যপ্রাণী ও পাখি ধরছে অভিযুক্ত পাচারকারীরা। পরে তা চালান করে দেয়া হচ্ছে চট্টগ্রামের নূপুর মার্কেটসহ ঢাকায়।

পাচারে অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ করে পাওয়া তথ্যের বরাতে পুলিশ জানিয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় কিছু বাসিন্দা এসব বন্যপ্রাণী ধরতে পাচারকারীদের সহায়তা করছে। প্রথমে এসব বন্যপ্রাণী চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেগুলো পাঠিয়ে দেয়া হয় ঢাকাসহ দেশের ভেতর ও বাইরের বিভিন্ন স্থানে।


আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ বিভাগের অভিযানে প্রতিনিয়তই এমন অনেক বন্যপ্রাণী ও পাখি উদ্ধার হচ্ছে। যদিও পরিবেশবাদীদের সন্দেহ, বন্যপ্রাণী পাচার কার্যক্রমের ব্যাপ্তি ও আওতা যতটুকু মনে করা হচ্ছে, তার চেয়েও বড়। এ পাচার কার্যক্রম ঠেকাতে পার্বত্য চট্টগ্রামের বন বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসনের তত্পরতা রয়েছে ঠিকই, তবে তা আরো অনেকখানি বাড়ানো প্রয়োজন।

পুলিশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের (খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান) তিন জেলার গহিন বনাঞ্চল থেকে চট্টগ্রাম হয়ে পাচার হচ্ছে দুর্লভ প্রজাতির বন্যপ্রাণী। বান্দরবানের আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি, রোয়াংছড়ি ও চট্টগ্রামের বাঁশখালীর চুনতির গহিন অরণ্য থেকে বিপন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীগুলো ধরে প্রথমে সাতকানিয়া, লোহাগড়া হয়ে চট্টগ্রামে নিয়ে বিক্রি করে দেয়া হয়। এ চট্টগ্রামই এখন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যপ্রাণী পাচারের বড় একটি কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সেখান থেকে এসব প্রাণী ঢাকা বা অন্যান্য জেলা অথবা প্রতিবেশী ভারতে পাচার করে দেয়া হচ্ছে। চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারের নূপুর মার্কেট, দেওয়ানহাটসহ বিভিন্ন স্থানে এখন এ বন্যপ্রাণী কেনাবেচাকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।

বন্যপ্রাণীগুলো পাচারের সময় প্রায়ই তা পুলিশ ও বন্যপ্রাণী অধিদপ্তরের অভিযানে ধরা পড়ছে। ১০ নভেম্বর ঢাকায় পাচারের সময় একটি শজারু, দুটি লজ্জাবতী বানরসহ একজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। প্রাণীগুলো চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকার বিভিন্ন বাজারে পাচার করার কথা ছিল। ৮ অক্টোবর চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা থেকে বিরল প্রজাতির উল্লুকসহ দুজনকে গ্রেফতার করা হয়।

গত ২৭ অক্টোবর চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থেকে বিপন্ন প্রজাতির চিতা বিড়াল, তিনটি মেছো বিড়াল ও একটি মথুয়া বাবন মোরগসহ দুজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বান্দরবানের আলীকদম এলাকা থেকে বিপন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীগুলো সংগ্রহ করে চট্টগ্রামের নূপুর মার্কেটে বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এ ঘটনায় আটক হওয়া দুজন ভ্রাম্যমাণ আদালতে তাদের অপরাধ স্বীকার করায় আইন অনুযায়ী তাদের প্রত্যেককে ছয় মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেয়া হয়। অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরো এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। পরে বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণীগুলো ডুলাহাজরা সাফারি পার্কে পাঠানোর জন্য চুনতি অভয়ারণ্যে পাঠানো হয়।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, মূলত পাচারকারীরা এ এলাকার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে বন্যপ্রাণী সংগ্রহ করে চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজার ও ঢাকায় পাচার করে। পরে এসব বন্যপ্রাণী ঢাকা থেকে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। বন্যপ্রাণীগুলো বাসায় লালন-পালনের সুযোগ নেই। এসব বন্যপ্রাণী নানা হাত ঘুরে প্রতিবেশী ভারতসহ অন্যান্য দেশে পাচার করা হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে পুলিশ প্রশাসনের আরো তত্পরতা প্রয়োজন। তাছাড়া চট্টগ্রামে যেসব পাচারকারী আছে তাদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা অতীব জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া দিয়েই পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন গহিন এলাকা থেকে দুর্লভ বন্যপ্রাণীগুলো চট্টগ্রাম দিয়ে অন্য জায়গায় পাচার করছে পাচারকারীরা। মূলত যাদের আমরা প্রথমে গ্রেফতার বা আটক করছি, তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক পাচারকারীদের কোনো সংযোগ খুঁজে পাইনি। এমনও হতে পারে এসব প্রাণী ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হলে সেগুলো হয়তো সেখানে বড় পাচারকারী চক্র থাকলেও থাকতে পারে। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের বড় একটি চক্র এ পাচারকারীদের সহায়তা করছে। তাদের বিষয়ে সেখানে যোগাযোগ করে নেটওয়ার্কটিকে শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে।

এদিকে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তথ্যমতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪০টি অভিযান পরিচালনা করে ৩৭১টি বন্যপ্রাণী ও পাখি উদ্ধার করা হয়। এ সময় বিভিন্ন এলাকায় আরো প্রায় ৫০টির বেশি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে তারা। এছাড়া চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ১৪টি অভিযানে ১৫৬টি এবং ১০টি জায়গা থেকে আরো ৩৪টি প্রাণী উদ্ধার করা হয়। অভিযান ও উদ্ধারের মধ্যে রয়েছে—তক্ষক, বনরুই, মায়া হরিণ, বানর, বন্য শূকর, বেজি, অজগর সাপ, শঙ্খিনী সাপ, পদ্ম গোখরা, গুইসাপ, দুধরাজ সাপ, হগ ব্যাজার, মেছো বিড়াল, বন বিড়াল, গন্ধগোকুল, ভালুক, লজ্জাবতী বানর, বন্য শূকর, উল্লুক, মুনিয়া, বুলবুলি, বানর, ঘুঘু, শালিক, পেঁচা, টিয়া, কালিম, চিল, কাছিম ইত্যাদি। উদ্ধারের সময় জড়িতদের জরিমানা ও শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, মূলত চট্টগ্রামে যেসব বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে, সেগুলো মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন গহিন এলাকা থেকে এসেছে। পাচারকারীরা চট্টগ্রামকে এখন রুট বানিয়ে পাচার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারের নূপুর মার্কেট ও দেওয়ানহাটসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করে বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও জরিমানাসহ অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন অভিযান পরিচালনার জন্য আমরা র্যাব ও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারাও আমাদের সহায়তা করবে বলে জানিয়েছে।

তিনি আরো জানান, আমাদের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগসহ বন বিভাগে লোকবল সংকট রয়েছে। তাই বিশাল বন এলাকা আমাদের পাহারা দেয়া সম্ভব হয় না। এর পরও বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করে পাচারকারীদের গ্রেফতার করা হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিচালক মো. ছানাউল্যা পাটওয়ারী বলেন, চট্টগ্রাম থেকে বেশ কয়েকটি বন্যপ্রাণী উদ্ধারের ঘটনা ঘটলেও চট্টগ্রামকে সরাসরি রুট বলা যাবে না। বন্যপ্রাণী পাচারের বড় একটি ট্রানজিট এখন বাংলাদেশ। সে হিসেবে মিয়ানমার বা ভারত হয়েও বাংলাদেশে প্রাণীগুলো আসতে পারে। বাংলাদেশ থেকে মূলত সাতক্ষীরা হয়ে বিদেশে বন্যপ্রাণী পাচার হচ্ছে। তাই যেখানে বন্যপ্রাণী ধরা পড়েছে, সেটিই রুট হবে এমন না-ও হতে পারে। আমরা আন্তর্জাতিকভাবে ইন্টারপোলের কাছে যারা এ পাচারকার্যের সঙ্গে জড়িত, তাদের ধরার জন্য কাজ করছি। এ পাচারকারীরা নিজেদের একটি বলয় তৈরি করেছে।

তিনি আরো বলেন, আমাদের বন বিভাগের সীমিত লোকবলের জন্য আমাদের কাজের ব্যাঘাত ঘটছে। তার পরও আমাদের যারা কাজ করছেন তারা সর্বোচ্চ দিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। এ কারণেই আমরা বন্যপ্রাণী পাচার রোধ বা বনের নিরাপত্তায় কাজ করে যেতে পারছি।




  এ বিভাগের অন্যান্য