এক সময় দেশের মানুষ আঙুর গাছ কেমন দেখতে তাও জানত না। নব্বইয়ের দশকে যখন গাজীপুরে আঙুর চাষের দৃশ্য টেলিভিশনে দেখানো হয়, তখন অনেকেই চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন—এটা নিশ্চয়ই বাংলাদেশের নয়! কারণ তখন যে আঙুর ফলত, তা ছিল টক, আর তেমনটি কেউ খেতে চাইত না।
কিন্তু সময় বদলেছে। কৃষির উন্নতি, প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং সাহসী উদ্যোক্তাদের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের মাটিতেই এখন ঝুলছে থোকা থোকা রসালো, মিষ্টি আঙুর। আর সেই স্বপ্ন বাস্তব করছেন চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের তরুণ কৃষক আশরাফুল ইসলাম।
হাসাদহ গ্রামের আশরাফুল ছিলেন এক সময়ের চাকরিজীবী ও উদ্যোক্তা। কিন্তু এক বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকতায় হারিয়েছিলেন সবকিছু। দিশেহারা আশরাফুল একদিন বাবা-মাকে বলেছিলেন—তিনি কৃষি করতে চান। প্রথমে বাবা রাজি না হলেও আজ তিনি গর্ব করেন ছেলেকে নিয়ে। ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে আশরাফুল চাষ করছেন ড্রাগন, মাল্টা, পেয়ারা, লেবুসহ নানা ফল। সম্প্রতি তিন বিঘা জমিতে শুরু করেছেন বাণিজ্যিক আঙুর চাষ। চলতি বছরই আঙুর ফলন দেখে অবাক সবাই।
এই বাগানে রয়েছে প্রায় ৭৫০টি গাছ। আশরাফুলের আশা, প্রতিটি গাছ থেকে ১৫ কেজির মতো আঙুর পাবেন। তিন বিঘার বাগানে এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ১০ লাখ টাকা, বিক্রির সম্ভাব্য আয় ২০ লাখ টাকা। স্বপ্ন তাঁর আরও বড়—পরের বছর ১০ বিঘা জমিতে আঙুর চাষের পরিকল্পনা করছেন।
বাংলাদেশে প্রতি বছর বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ আঙুর আমদানি করতে হয়। এই চাষ যদি দেশব্যাপী ছড়িয়ে যায়, তাহলে আমদানি নির্ভরতা কমবে, তৈরি হবে কর্মসংস্থান, বাড়বে কৃষি পর্যটনের সুযোগ। আশরাফুলের বাগানে প্রতিদিনই ভিড় করছেন শত শত মানুষ। অনেকেই উৎসাহী হয়ে শুরু করছেন নিজের বাগান। তিনি নিজেও পর্যটকদের জন্য আঙুর নিজ হাতে তোলার সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা করছেন।
কিন্তু এই সাফল্যের পথ সহজ ছিল না। ইউটিউবে দেখে শিখেছেন চাষের কৌশল, কাধে কাধ মিলিয়ে কাজ করেছেন শ্রমিকদের সঙ্গে। সরকারি কোনো সহায়তা পাননি। কৃষির জন্য দরকার ছিল প্রশিক্ষণ, বাজার ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ সহায়তা—যা তাঁর মতো কৃষকের পাশে থাকলে বাংলাদেশের কৃষি বদলে যেত আরও দ্রুত।
আশরাফুল এখন শুধু একজন সফল কৃষক নন, তিনি এলাকার মানুষের অনুপ্রেরণাও। আঙুর এখন তাঁর জীবনের প্রতীক—লাল রসে ভরা সাফল্যের গল্প, যা বলছে: ইচ্ছে থাকলে সবই সম্ভব।
