গত বছরের বাম্পার ফলন, তুলনামূলক কম খরচে বেশি লাভ এবং বাজারে দাম বাড়তি থাকায় উত্তরাঞ্চলে তিস্তাসহ বড় নদ-নদীর বিস্তীর্ণ চরে কুমড়া চাষে ঝুঁকেছে কৃষক। ফলে রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলায় রেকর্ড পরিমাণ কুমড়া চাষ হয়েছে প্রায় চার হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে।
সরেজমিনে বিভিন্ন চরাঞ্চলে গিয়ে দেখা যায়, সেসব এলাকায় এখন সবুজ কুমড়া লতার সমারোহ। বালুর মাঠে দৃষ্টিনন্দন এই দৃশ্য কৃষকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, প্রতিবছর বন্যা ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বর্ষা চলে গেলে তিস্তায় জেগে ওঠা বালুচরই হয়ে ওঠে তাদের জীবিকার নতুন ভরসা। তারা জানান, তিস্তা তীরবর্তী চরাঞ্চলের বালুময় জমিতে চাষাবাদ সব সময়ই চ্যালেঞ্জ। তবুও কম খরচে বেশি ফলন হওয়ায় বছরের পর বছর ধরে শাক-সবজি, বাদাম, ভুট্টা ও বিশেষ করে মিষ্টি কুমড়া এখানকার প্রধান অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়েছে।
গঙ্গাচড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার দপ্তর জানায়, চলতি মৌসুমে গঙ্গাচড়ায় ১৬০ হেক্টর জমিতে কুমড়া চাষের লক্ষ্য নেওয়া হলেও ইতিমধ্যে ৯৫ হেক্টরে আবাদ সম্পন্ন হয়েছে।
একই এলাকার চাষি নজরুল ইসলাম (৫২) জানান, একেকটি গাছে প্রায় ১০টি কুমড়া পাওয়া যায়। ওজন তিন থেকে চার কেজি। ক্ষেতেই প্রতিটি কুমড়া ৪০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চরের কৃষকদের জন্য এটি খুব লাভজনক।
লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের চর মহিপুরের কৃষক রফিকুল ইসলাম (৫০) বলেন, ‘কম খরচে বেশি লাভ চাইলে চরের বালু জমিতে কুমড়ার বিকল্প নেই।’
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লা আল হাদী বলেন, ‘বর্ষার তিস্তায় চরাঞ্চল প্লাবিত হয়, জমি-বসতভিটা নদীতে তলিয়ে যায়। কিন্তু হেমন্তে জেগে ওঠা এই চরগুলোই কৃষকের কাছে আশীর্বাদ হয়ে আসে। এখানকার কুমড়া এখন অর্থনীতির বড় ভরসা।’
গঙ্গাচড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ শাহিনুর ইসলাম বলেন, ‘চাষিদের বীজ ও সারসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত প্রযুক্তিগত পরামর্শও সরবরাহ করা হচ্ছে, যাতে তারা ভালো ফলন পায়। রংপুর অঞ্চলে প্রায় চার হাজার হেক্টরে কুমড়া চাষ করা হয়েছে।’
রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলায়-লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, নীলফামারী ও গাইবান্ধায় বছর মোট তিন হাজার ৭৩৯ হেক্টর জমিতে কুমড়া চাষ হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২০২৫ সালে কুমড়া চাষ হয়েছিল প্রায় চার হাজার হেক্টরে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এ বছর পুরো অঞ্চলে কুমড়া চাষ হয়েছে তিন হাজার ৭৩৯ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে রংপুর জেলায় চাষ হয়েছে এক হাজার ৬৪০ হেক্টর জমিতে। গাইবান্ধায় ৭০৭ হেক্টর, লালমনিরহাটে ৭৩৮ হেক্টর, নীলফামারীতে ৫১৮ হেক্টর এবং কুড়িগ্রামে ১৩৬ হেক্টর জমিতে কুমড়া আবাদ করা হয়েছে। নদ-নদীর পলি জমে তৈরি উর্বর চরাঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় অনেক কম পড়ে; তাতেই বছরের পর বছর কুমড়া চাষে কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে।
এ পাঁচ জেলায় চাষ হওয়া কুমড়ার ৯০ শতাংশই চরাঞ্চলে। প্রায় ৫০ হাজার কৃষক সরাসরি এই আবাদের সঙ্গে যুক্ত। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাত লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, গত বছর কুমড়ায় বাম্পার ফলন হওয়ায় এবার চাষ বেড়েছে। কৃষকরা নিশ্চিন্ত মনে কুমড়া চাষে ঝুঁকে পড়ছেন। এখন কুমড়ার বাজারে চাহিদা বেশি তাই বিক্রি নিয়েও তাদের আর দুশ্চিন্তা করতে হয় না।
অতিরিক্ত পরিচালক আরো বলেন, ‘আগাম বীজ রোপণ এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর রোগবালাইও তুলনামূলক কম। তিস্তাসহ বড় নদীর শুকনো চরে পলি জমে যে উর্বরতা তৈরি হয়, তা কুমড়া গাছের দ্রুত বৃদ্ধি নিশ্চিত করে। তাই এ অঞ্চলে কুমড়া চাষ ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক রূপ নিচ্ছে।’ ভবিষ্যতে সংরক্ষণাগার ও পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত হলে রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
- কালেরকণ্ঠ
